অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

জাতীয়

আব্দুল্লাহ আল মামুন
অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণে প্রতিনিয়ত স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। দেশে বছরে ২ লাখ ৭৭ হাজার মানুষ হৃদরোগে মারা যায়, যার অন্যতম কারণ হচ্ছে ট্রান্সফ্যাট। সাধারণত ভাজা পোড়া ও বেকারি খাবারে শিল্পোৎপাদিত ট্রান্সফ্যাট থাকে। জাঙ্ক ফুড এবং বেকারি পণ্যের ওপর মানুষের অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা ট্রান্সফ্যাটের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে। এই ধরনের অসম্পৃক্ত চর্বি সাধারণত প্রক্রিয়াজাত খাবার, ফাস্ট ফুড, স্ন্যাক্স, তেলে ভাজা খাবার, পিৎজা, পেস্ট্রি, কুকি, মার্জারিন ও স্প্রেডস বা মাখিয়ে খাওয়ার মিশ্রণে পাওয়া যায়। খাবারে ট্রান্সফ্যাটের অনিয়ন্ত্রিত মাত্রা, মোড়কে ট্রান্সফ্যাটের পরিমাণ উল্লেখ এবং চিহ্নিতকরণের বাধ্যবাধকতা না থাকায় সার্বিক পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিল্পোৎপাদিত ট্রান্সফ্যাট একটি নীরব ঘাতক। এর মূল উৎস পারশিয়ালি হাইড্রোজেনেটেড অয়েল (পিএইচও) যা সাধারণত ডালডা বা বনস্পতি ঘি নামে পরিচিত। ট্রান্সফ্যাটযুক্ত খাবার রক্তের এলডিএল বা খারাপ কোলেস্টেরল বাড়ায়, অপরদিকে এইচডিএল বা ভালো কোলেস্টেরল এর মাত্রা কমিয়ে দেয়। অতিরিক্ত ট্রান্সফ্যাট গ্রহণে খারাপ কোলেস্টেরল রক্তবাহী ধমনিতে জমা হয়ে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে, যা অকাল মৃত্যুর অন্যতম কারণ।
এ ব্যাপারে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক কাজল কুমার কর্মকার বলেন, কার্বোহাইড্রেট, চর্বি ও কোলেস্টেরল বাড়ায় এমন খাবার পরিহার করতে হবে। প্রচুর সবুজ শাক-সবজি ও প্রোটিন জাতীয় খাবার খেতে হবে। পাশাপাশি শরীর সুস্থ রাখার জন্য নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। এসময় নিয়মিত খাদ্য তালিকায় পরিবর্তন আনা যাবে না। তবে এক্ষেত্রে ট্রান্সফ্যাটযুক্ত খাদ্য পরিহারে নীতিমালা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশে প্রতিবছর ২ লাখ ৭৭ হাজার মানুষ হৃদরোগজনিত কারণে মারা যায়। ২০১০ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে অন্তত আট হাজার মানুষের মৃত্যুর কারণ হিসেবে উচ্চ মাত্রার ট্রান্সফ্যাট গ্রহণ দায়ী। ট্রান্সফ্যাটের স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে সব মানুষকে সুরক্ষার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২৩ সালের মধ্যে শিল্পোৎপাদিত ট্রান্সফ্যাটমুক্ত বিশ্ব অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্য অর্জনে সংস্থাটি ২০১৮ সালে একটি অ্যাকশন প্যাকেজ ঘোষণা করে যেখানে খাদ্যে ট্রান্সফ্যাট নির্মূলে সরকার কীভাবে কাজ করবে তার নির্দেশনা রয়েছে। ইতোমধ্যে ভারত, থাইল্যান্ড, ব্রাজিল, তুরস্কসহ পৃথিবীর ৩০টিরও বেশি দেশ খাদ্যে ট্রান্সফ্যাট নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক পদক্ষেপ নিলেও বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) খাবারে ট্রান্সফ্যাটের সর্বোচ্চ মাত্রা ২ শতাংশে নামিয়ে আনার বিষয়ে গত জানুয়ারি মাসে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। এ বিষয়ে গঠিত ১০ সদস্যের একটি টেকনিক্যাল কমিটি কাজ শুরু করলেও করোনাভাইরাসের প্রকোপে পিছিয়ে পড়েছে নীতিমালা চূড়ান্তকরণ প্রক্রিয়া।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক আবু আহমেদ শামীম বলেন, এটি নিয়ে আমাদের কাজ অনেক দূর এগোলেও করোনার কারণে নীতিমালা আটকে রয়েছে। করোনার মাঝখানে আমাদের কোনো সভা হয়নি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এটি হচ্ছে না বলে মনে করি। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে খুব দ্রুত এটি হয়ে যাবে।
জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস আজ মঙ্গলবার। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য, টেকসই উন্নয়ন- সমৃদ্ধ দেশ: নিরাপদ খাদ্যের বাংলাদেশ। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)-এর কার্যক্রম সর্বসাধারণকে অবহিতকরণ এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম বিষয়ে সর্বস্তরে জনসচেতনতা বৃদ্ধিই এ দিবসের প্রধান লক্ষ্য। নিরাপদ খাদ্যের অন্যতম প্রধান শর্ত ট্রান্সফ্যাট মুক্ত খাবার এবং এ লক্ষ্যে সংস্থাটি সব ধরনের ফ্যাট, তেল এবং খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্সফ্যাটের সর্বোচ্চ সীমা মোট ফ্যাটের ২ শতাংশ নির্ধারণ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যা জনস্বাস্থ্যের নিরিখে অত্যন্ত সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
ট্রান্স ফ্যাটি এসিড (টিএফএ) বা ট্রান্সফ্যাট একটি পুষ্টিগুণ বিবর্জিত খাদ্য উপাদান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এর তথ্যমতে ট্রান্সফ্যাট ঘটিত হৃদরোগে মৃত্যুর সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ ১৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ডব্লিউএইচও’র ২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী, খাদ্যে ট্রান্সফ্যাট গ্রহণের কারণে বাংলাদেশে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বছরে ৫,৭৭৬ জন মানুষ মারা যায়। খাদ্যে ট্রান্সফ্যাটের প্রধান উৎস পারশিয়ালি হাইড্রোজেনেটেড অয়েল বা পিএইচও, যা ডালডা বা বনস্পতি ঘি নামে সুপরিচিত। পিএইচও বা ডালডা সাধারণত বেকারি পণ্য, প্রক্রিয়াজাতকৃত ও ভাজা পোড়া স্ন্যাক্স এবং হোটেল-রেস্তোরাঁ ও সড়কসংলগ্ন দোকানে খাবার তৈরিতে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
সম্প্রতি এক গবেষণায় ঢাকার পিএইচও নমুনার ৯২ শতাংশে ডব্লিউএইচও সুপারিশকৃত ২ শতাংশ মাত্রার চেয়ে বেশি ট্রান্স ফ্যাট (ট্রান্স ফ্যাটি এসিড) পাওয়া গেছে। প্রতি ১০০ গ্রাম পিএইচও নমুনায় সর্বোচ্চ ২০.৯ গ্রাম পর্যন্ত ট্রান্স ফ্যাট এর উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে, যা ডব্লিউএইচও’র সুপারিশকৃত মাত্রার তুলনায় ১০ গুণেরও বেশি। তেল ও সব ধরনের খাদ্যদ্রব্যে মাত্রাতিরিক্ত ক্ষতিকর ট্রান্সফ্যাট নিয়ন্ত্রণে দ্রুত আইন প্রণয়ন করে তা যথাযথ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *