অভিনেতা থেকে জাতীয় নেতা

বিনোদন

কেউ কেউ রাজনীতির মাঠ থেকে পা রেখেছেন ঝলমলে দুনিয়ায়। আবার কেউ কেউ রুপালি পর্দা থেকে রাজনীতির মঞ্চে দাঁড়িয়েছেন। যারা দুই অঙ্গনেই সফল। বিশ্বের অন্যান্য ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে এমন সফল ব্যক্তির সংখ্যা বেশি হলেও বাংলাদেশে তুলনামূলক কম। ঢাকাই চলচ্চিত্রে বেশ কজন তারকা অভিনয়শিল্পী রয়েছেন, যারা অভিনেতা থেকে নেতা হয়েছেন। তাদের নিয়ে সাজানো হয়েছে এই প্রতিবেদন।

আসাদুজ্জামান নূর

১৯৪৬ সালের ৩১ অক্টোবর নীলফামারীতে জন্মগ্রহণ করেন আসাদুজ্জামান নূর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন তিনি। ১৯৭২ সালে সাপ্তাহিক চিত্রালীতে কাজের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৭৩ সালে একটি বিজ্ঞাপন সংস্থার অধীনে ছাপাখানায় ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৪ সালে সোভিয়েত দূতাবাসের প্রেস রিলেশন অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠায় অক্লান্ত পরিশ্রম করেন আসাদুজ্জামান নূর। নব্বই দশকে নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ রচিত ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকে ‘বাকের ভাই’ চরিত্রে অভিনয় করে দেশব্যাপী তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করেন এ অভিনেতা।

১৯৬৩ সালে ছাত্র ইউনিয়নে যোগদানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে নাম লেখান আসাদুজ্জামান নূর। ১৯৬৫ সালে নীলফামারী কলেজের ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন তিনি। দেশ স্বাধীনের পর কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন। দীর্ঘদিন প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে নিজেকে দূরে রেখে সংস্কৃতিকর্মী হিসেবে নানা সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারেরর দাবিতে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের সঙ্গে আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৯৮ সালের মাঝামাঝি পর্যায়ে পুনরায় প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে যুক্ত হন। অর্থাৎ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ২০০২ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদকের দায়িত্ব পান নূর।

নীলফামারী-২ আসন থেকে ২০০১, ২০০৮ ও ২০১৪ সালে সাংসদ নির্বাচিত হন। নবম জাতীয় সংসদের বিভিন্ন সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮ সালে একাদশ নির্বাচনে একই আসন থেকে পুনরায় সাংসদ নির্বাচিত হন এই বরেণ্য অভিনেতা।

সোহেল রানা

১৯৪৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন চিত্রনায়ক মাসুদ পারভেজ। জন্ম ঢাকায় হলেও তার পৈতৃক নিবাস বরিশালে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন তিনি। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ঢাকাই চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত হন প্রযোজক ও পরিচালক হিসেবে। অভিনয়ে নাম লিখিয়ে নাম পরিবর্তন করে রাখেন সোহেল রানা। প্রযোজক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন পারভেজ ফিল্মস। এই প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে চাষী নজরুল ইসলাম নির্মাণ করেন বাংলাদেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ওরা ১১ জন’। এটি মুক্তি পায় ১৯৭২ সালে। তিনি অভিনেতা ও পরিচালক হিসেবে যাত্রা শুরু করেন ১৯৭৩ সালে।

ছাত্রজীবনে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন সোহেল রানা। ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের তুখোড় নেতা ছিলেন তিনি। ২০০৯ সালে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্যপদ গ্রহণ করে জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। জাতীয় পার্টির প্রাক্তন চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের নির্বাচন বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পান তিনি।

নায়ক ফারুক

চিত্রনায়ক ফারুকের জন্ম পুরান ঢাকায়। তার বেড়ে ওঠা সেখানেই। পৈত্রিক নিবাস গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জে। ছাত্রজীবনে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হন ফারুক। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। মিছিলে গিয়েছিলেন অনেকবার। এজন্য তার নামে মামলা হয়েছিল। হুলিয়া মাথায় নিয়েই মিছিলে গিয়েছিলেন। সেই সময়ে তার বিরুদ্ধে ৩৭টি মামলা হয়েছিল। ফারুক ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।

ছাত্রজীবনে অনেক সাহসী ছিলেন ফারুক। ছিলেন ডানপিটে স্বভাবের। পুরান ঢাকায় তখন নাটক ও যাত্রাপালা হতো। বন্ধুদের নিয়ে মঞ্চ নাটক দেখতে গিয়ে বেশ কয়েকবার নাটক বানচাল করে দিয়েছেন। অথচ তাকেই কিনা অভিনয়ে আসতে হয়। ‘জলছবি’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় পা রাখেন ফারুক।

তারপর অভিনয় করেন বিখ্যাত পরিচালক খান আতার ‘আবার তোরা মানুষ হ’ সিনেমায়। এভাবেই সফলতার সিঁড়িতে নাম লিখিয়েছেন তিনি, যা তাকে ঢাকাই সিনেমায় দিয়েছে এক অনন্য আসন। জীবনের অনেকগুলো বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর ঢাকা-১৭ আসনের সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। এখন সিনেমা থেকে দূরে। তবে রাজনীতি থেকে দূরে নেই ‘মিয়া ভাই’।

সারাহ বেগম কবরী

চিত্রনায়িকা সারাহ বেগম কবরী। ১৯৫০ সালের ১৯ জুলাই চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায় তার জন্ম। কিন্তু শৈশব ও কৈশোর কেটেছে চট্টগ্রাম নগরীতে। তার আসল নাম মিনা পাল। ১৯৬৩ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে নৃত্যশিল্পী হিসেবে মঞ্চে আবির্ভাব কবরীর। ১৯৬৪ সালে সুভাষ দত্তের পরিচালনায় ‘সুতরাং’ সিনেমার নায়িকা হিসেবে অভিনয় জীবন শুরু করেন। এরপর ধীরে ধীরে টেলিভিশন এবং সিনেমা জগতে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন তিনি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি চলে যান কবরী। সেখান থেকে ভারতে পাড়ি জমান।  কলকাতায় গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করতে বিভিন্ন সভা-সমিতি ও অনুষ্ঠানে বক্তৃতা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন তিনি। ২০০৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ প্রতীকে সাংসদ নির্বাচিত হন এই অভিনেত্রী।

সুবর্ণা মুস্তাফা

বরেণ্য অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফা। ১৯৫৯ সালের ২ ডিসেম্বর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার পৈত্রিক নিবাস ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার দপদপিয়া ইউনিয়নে। তার বাবা গোলাম মুস্তাফা ছিলেন প্রখ্যাত অভিনেতা ও আবৃত্তিশিল্পী। তার মা হোসনে আরা পাকিস্তান রেডিওতে প্রযোজনার দায়িত্বে ছিলেন। ৫/৬ বছর বয়েসে মায়ের হাত ধরে বেতার নাটকে কাজ শুরু করেন সুবর্ণা মুস্তাফা। নবম শ্রেণিতে পড়াকালীন প্রথম টেলিভিশন নাটকে অভিনয় করেন। ১৯৭১ সালের পূর্ব পর্যন্ত শিশুশিল্পী হিসেবে নিয়মিত টেলিভিশনে কাজ করেছেন এই অভিনেত্রী।

সত্তরের দশকে ঢাকা থিয়েটারে নাট্যকার সেলিম আল দীনের ‘জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন’ নাটকে অভিনয় করেন সুবর্ণা মুস্তাফা। ১৯৮০ সালে সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকী পরিচালিত ‘ঘুড্ডি’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্র জগতে পা রাখেন। ১৯৮৩ সালে ‘নতুন বউ’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রী বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। ‘নয়নের আলো’ সিনেমায় অভিনয় করে সব শ্রেণির দর্শককে নাড়া দেন সুবর্ণা মুস্তাফা।

বরেণ্য এই অভিনেত্রী রাজনীতিতে নাম লিখিয়েছেন। ২০১৯ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সংরক্ষিত মহিলা আসন-৪ (৩০৪), ঢাকা-২২ থেকে সুবর্ণা মুস্তাফাকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।

তারানা হালিম

১৯৬৬ সালের ১৬ আগস্ট টাংগাইলে জন্মগ্রহণ করেন অভিনেত্রী তারানা হালিম। তার পৈতৃক ভিটা টাংগাইলের নাগরপুরের ধুবরিয়া গ্রামে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে এলএলবি ও এলএলএম সম্পন্ন করেন তিনি। ৫ বছর বয়েসে ‘ঘুঘু ও শিকারী’ নামে একটি নাটকে ‘পিঁপড়া’ চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে অভিনয়ের হাতেখড়ি তার। কলেজে পড়াকালীন ‘ঢাকায় থাকি’ নামে টিভি নাটকে অভিনয় করেন তিনি। চিত্রনায়ক ফারুকের ছোট বোনের চরিত্রে ‘সাহেব’ সিনেমায় অভিনয় করে অলোচনায় আসেন তিনি। তার পরের গল্প সবারই জানা।

কৈশোর বয়স থেকেই রাজনীতির প্রতি ঝোঁক ছিল তারানা হালিমের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নকালে যুবলীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পান। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০০৯ ও ২০১৪ সালে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে সাংসদ নির্বাচিত হন তারানা হালিম। ২০১৫ সালে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান এই অভিনেত্রী।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *