আওয়ামী লীগের ভরাডুবির ৫ কারণ

জাতীয় লিড লিড ১ সারাবাংলা

বিশেষ প্রতিনিধি

আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ঐতিহ্যবাহী ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলা। এই উপজেলায় গত ১১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনে নৌকার ব্যাপক ভরাডুবি হয়েছে। চেয়ারম্যান পদে ১৩টির মধ্যে ৯টিতেই ধরাশায়ী হয়েছে নৌকা। ৪টিতে নৌকা, ৪টি স্বতন্ত্র ( আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী) ৪টিতে বিএনপিপন্থি প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। একটি ইউনিয়নের ফলাফল স্থগিত রাখা হয়েছে। দলের তৃণমূল নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ এ ভরাডুবির পেছনে পাঁচ কারণের কথা উল্লেখ করেছেন। তারা জানিয়েছেন, মনোনয়ন বাণিজ্য, প্রার্থী নির্বাচনে স্বজনপ্রীতি, ত্যাগী ও নিবেদিত নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন না করা এবং দুর্নীতিবাজদের মনোনয়ন দেয়া এর অন্যতম কারণ। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই ফুলবাড়িয়ায় আওয়ামী লীগের রাজনীতি পুরোপুরি পরিবার কেন্দ্রিক। যার ফলে দলের ত্যাগী, নিবেদিতপ্রাণ ও প্রভাবশালী নেতারাও গা ছাড়াভাবে দল করছেন। তাদের বক্তব্য, দল করে আমাদের লাভ কি? বিশেষ করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমপি অথবা তার পরিবারের লোকজনই সামনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাবেন। হয় বর্তমান এমপি না হয় তার ছেলে মেয়েদের কেউ। উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে এমপি পরিবারের তোষণকারীদেরই মনোনয়ন দেয়া হয়। এমন কি থানা, পৌর, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি সাধারণ সম্পাদক হতে হলে এমপি পরিবারের আশীর্বাদপুষ্ট হতে হয়। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই ফুলবাড়িয়ার আওয়ামী রাজনীতিটা হয়ে গেছে ওয়ান ম্যান শো। সহজে এটা থেকে বেরিয়ে আসাও সম্ভব নয়। দীর্ঘ অর্ধশতাব্দীতেও এমপি পরিবারের বাইরে বিকল্প কোনো নেতৃত্ব তৈরি হতে পারেনি বা তৈরি হতে দেয়া হয়নি। নতুন নেতৃত্ব তৈরি হতে গেলেই কৌশলে বারবার তাদের ছেঁটে ফেলা হয়। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ ফুলবাড়িয়া ইউনিয়নের প্রয়াত চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মোজাফফর আলী, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক, থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জব্বার, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আব্দুল কুদ্দুস, জেলা আওয়ামী লীগের উপপ্রচার সম্পাদক অ্যাডভোকেট মফিজ উদ্দিন মণ্ডল, থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আবুল হোসেন, মজিবুর রহমান খান, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক কামরুজ্জামান (ভিপি জামান) পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা এবং সর্বশেষ জেলা পরিষদ সদস্য ও থানা যুবলীগের সাবেক সভাপতি রুহুল আমিন। এদেরকে বিভিন্ন সময়ে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হলেও কৌশলে নির্বাচনে হারিয়ে দেয়া হয়েছে। ব্যাপক জনপ্রিয়তা থাকার পরও তাদের কাউকে কাউকে দলীয় মনোনয়নই দেয়া হয়নি। কারণ এরা নির্বাচিত হলে বিকল্প নেতৃত্ব তৈরি হবে। বিকল্প নেতৃত্ব তৈরি হলে ফুলবাড়িয়ার রাজনীতিতে ওয়ান ম্যান শো থাকবে না। সদ্য অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনে পরাজিত কয়কজন চেয়ারম্যান প্রার্থী এবং থানা, পৌর ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানান, ফুলবাড়িয়ার আওয়ামী রাজনীতিকে এমপি পরিবারের কব্জা থেকে বের করে আনতে হবে। না হলে, সদ্য সমাপ্ত ফুলবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মতোই ভবিষ্যতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ অন্যান্য নির্বাচনেও আরো ভয়াবহ ভরাডুবির ঘটনা ঘটবে। এদিকে, উপজেলার ৩ নম্বর কুশমাইল ইউনিয়নের নিউগী কেন্দ্রে পরিকল্পিতভাবে নির্বাচন বানচালের অপচেষ্টা চালানো হয়। ওইদিন সকালে এমপি পরিবারের একজন প্রভাবশালী সদস্য নিউগী কেন্দ্রে গিয়ে সাধারণ ভোটারদের শুধু মেম্বার প্রার্থীদের ভোট দিতে বলেন। দুপুরে নৌকার প্রার্থী শামসুল হক দলবল নিয়ে ব্যালট ছিনতাই ও পুলিশের উপর হামলা চালান। পুলিশ আত্মরক্ষার্থে ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এই ঘটনায় প্রায় দেড় ঘণ্টা ভোট গ্রহণ বন্ধ রাখা হয়। রহস্যজনক কারণে মামলা করেনি পুলিশ। পরে নির্বাচনী কাজে নিয়োজিত সশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ভোট গণনাও শুরু করে দেন। সন্ধ্যার দিকে অদৃশ্য ফোন পেয়ে কর্তৃপক্ষ কেন্দ্রের ফলাফল স্থগিত রাখেন। পরবর্তীতে পুরো ইউনিয়নেরই ফলাফল স্থগিত রাখা হয়। এই ইউনিয়নে মোট ৯টি কেন্দ্র রয়েছে। ৮টি কেন্দ্রের প্রাপ্ত ফলাফলে ১৮শ ৪৫ ভোট বেশি পেয়ে এগিয়ে আছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী (স্বতন্ত্র) আব্দুল বাতিন পুলু। কড়ইতলা কেন্দ্রে নৌকার পক্ষে জোরপূর্বক দেড় হাজার ব্যালটে সিল মারারও অভিযোগ রয়েছে। নিউগী কেন্দ্রের মোট ভোটার ৩ হাজার ৮১২টি। এই ইউনিয়নে ২০১৬ ও ২০১১ সালেও একই কায়দায় একই কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত রাখা হয়। পরবর্তীতে উপনির্বাচনে পেশি শক্তি ব্যবহার করে জয়ী হন শামসুল হক। এলাকাবাসীর অভিযোগ, আবারো একই ঘটনার পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পাঁয়তারা করছেন সংশ্লিষ্ট প্রার্থী।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *