আওয়ামী লীগের শত্রু-মিত্র

মতামত

শুধু বাংলাদেশ নয়, এ উপমহাদেশেরই অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। ভারতের কংগ্রেস, পাকিস্তানের মুসলিম লীগ আর বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ। এই তিনটি দলকে ঘিরেই বিকশিত হয়েছে দেশ তিনটি। একদিন আগে-পরে স্বাধীন হওয়া দুটি দেশে আজ আকাশ-পাতাল ফারাক। ধর্মনিরপেক্ষ ভারত আজ বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতি। ধর্মের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা, জঙ্গিবাদের উর্বরভূমি পাকিস্তান প্রায় ব্যর্থ রাষ্ট্র। ২৩ বছরের মুক্তিসংগ্রাম, নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ আর ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে ধর্মরাষ্ট্র পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হয়েছিল বাংলাদেশ। স্বাধীন হয়েছিল বলেই বাংলাদেশ আজ উদীয়মান অর্থনীতির রোল মডেল। ৩০ লাখ শহীদ স্বাধীনতা এনে না দিলে আমাদেরও এখন ব্যর্থ রাষ্ট্রের কলঙ্ক গায়ে মাখতে হতো। কী ভয়ঙ্কর হতো বিষয়টি। ৫০ বছরে বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের মধ্যে সামর্থ্যে-সক্ষমতায়-ইমেজে এখন আকাশ-পাতাল ফারাক। গড় মাথাপিছু আয়ে ছাড়িয়ে যাচ্ছে শক্তিশালী ভারতকেও। এই বিজয়ের মাসে আমার তাই গলা ছেড়ে গাইতে মন চায়- আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি…।

বলছিলাম আওয়ামী লীগের কথা। ধর্মরাষ্ট্র পাকিস্তান গঠনের দু্ই বছরের মাথায় তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের আশাভঙ্গ ঘটে। তারা বুঝে যান ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়’। পশ্চিম পাকিস্তানিরা আমাদের স্বদেশী না হয়ে প্রভু হয়ে যায়। ধর্ম তাদের দানব হয়ে ওঠা ঠেকাতে পারেনি। তাই তো পাকিস্তান গঠনের দুই বছরের মাথায় গড়ে ওঠে আওয়ামী মুসলিম লীগ। ক্ষমতায় তখন মুসলিম লীগ। বিরোধী দল জনগণের মানে আওয়ামের মুসলিম লীগ। তবে গঠনের মাত্র ছয় বছরের মাথায় ১৯৫৫ সালে সংগঠনের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে সব মানুষের সংগঠনে পরিণত হয় আওয়ামী লীগ। তারপর শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের হাত ধরে গড়ে ওঠে অসাম্প্রদায়িক একটি দেশের ধারণা। ’৭০-এর নির্বাচনে যে ধারণার পক্ষে গণরায় পায় আওয়ামী লীগ। একাত্তর সালে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত বাংলাদেশের মূল চেতনাও ছিল অসাম্প্রদায়িকতা, বাংলাদেশ হবে সব মানুষের দেশ।

বিভিন্ন সময়ে কখনো আদর্শিক কারণে কখনো কৌশলগত কারণেই রাজনৈতিক শত্রু-মিত্র বদলায়। কিন্তু আওয়ামী লীগের কিছু সহজাত বন্ধু যেমন আছে, কিছু সহজাত শত্রুও তেমন আছে। বরাবরই রাজনীতিতে, নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে কাবু করতে ধর্মকে টেনে আনা হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধর্মহীনতা বলে বারবার ভুল ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। উদার, অসাম্প্রদায়িক, ধার্মিক মানুষদেরও নাস্তিক-মুরতাদ বলে আক্রমণ চালানো হয়েছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে মসজিদে আজানের বদলে উলুধ্বনি হবে, এমন উদ্ভট প্রচারণাও হয়েছে এই দেশে। তাই আওয়ামী লীগও নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে বা ক্ষমতায় টিকে থাকতে ধর্মকেই বাহন করে। কখনো খেলাফতে মজলিসের সাথে চুক্তি করে, কখনো হেফাজতে ইসলামের সাথে সমঝোতা করে। ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ নিজেদের আরো বেশি করে মুসলমান প্রমাণ করতে উঠে পরে লাগে। কৌশল হিসেবে মন্দ নয়। কিন্তু সমস্যা হলো, আওয়ামী লীগ যখন হেফাজতের দাবি মেনে একের পর এক পাঠ্যপুস্তক বদলে ফেলে, হাইকোর্টের সামনে থেকে ভাস্কর্য সরিয়ে ফেলে তখন। আওয়ামী লীগ জমিজমা দিয়ে হেফাজতকে পোষ মানিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখুক। কিন্তু হেফাজত যখন আওয়ামী লীগকে নিয়ন্ত্রণ করে তখনই সমস্যা। আওয়ামী লীগ যতই আপস করুক, সমঝোতা করুক, কৌশল করুক; এখনও বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূলধারার নেতৃত্ব তাদের হাতেই। আওয়ামী লীগকে নমনীয় দেখলে এ অংশটি হতাশ হয়, কষ্ট পায়, অভিমান করে। আহমদ ছফা অনেক আগেই বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ জিতলে একাই জেতে, কিন্তু আওয়ামী লীগ হারলে বাংলাদেশ হারে।

এবার ভাস্কর্য ইস্যুতে দুইপক্ষের প্রতিক্রিয়া নিয়ে আওয়ামী লীগের নতুন করে ভাবা উচিত। লাই পেয়ে পেয়ে হেফাজত যখন বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের ওপর আঘাত হানলো, তখন যেমন প্রতিক্রিয়া হওয়ার কথা ছিল, তেমন হয়নি। বলা ভালো, এক মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলকে বাদ দিলে আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়া জানাতে দুই সপ্তাহ লেগেছে। সে প্রতিক্রিয়া্ও ছিল খুবই নমনীয় ও আপসকামী। ওবায়দুল কাদের সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে বলেছিলেন। আওয়ামী লীগের যেটা নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভাবা উচিত, তাহলো্ তাদের সহজাত বন্ধুদের প্রতিক্রিয়া। বঙ্গবন্ধু এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার ওপর আঘাত আসার পরও বাম-প্রগতিশীল অংশটি একদম নিশ্চুপ ছিল। ভাবটা এমন বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য রক্ষার দায়িত্ব শুধু আওয়ামী লীগের। বিষয়টা এভাবেও ভাবা যেতে পারত, মৌলবাদীদের হুমকি শুধু ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুর ওপর নয়; জাতির পিতা, রাষ্ট্রের সংবিধান এবং রাষ্ট্রের মৌলিক চেতনার ওপর আঘাত। আওয়ামী লীগের ওপর রাগ করে, মৌলবাদীদের মাঠ ছেড়ে দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগেরও ভাবা উচিত, সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে কৌশল তাদের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত সহজাত বন্ধুদের যেন দূরে ঠেলে না দেয়। আওয়ামী লীগ যতই সমঝোতা করুক, সাম্প্রদায়িক শক্তি কখনোই তাদের ভোট দেবে না। উদার-অসাম্প্রদায়িক অংশটি যতই রাগ করুক, অভিমান করুক; বিপদের সময় তাদের পাশেই থাকবে।

আওয়ামী লীগের অতি সতর্ক ও দায়িত্বশীল প্রতিক্রিয়া অসাম্প্রদায়িক মানুষদের শঙ্কিত করেছিল। তারা ভেবেছিল, বঙ্গবন্ধুর ওপর আঘাত আসার পরও কি আওয়ামী লীগ মৌলবাদীদের সাথে আপস করবে। কিন্তু নেতারা যতই দ্বিধায় থাকুন, দলের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব সজীব ওয়াজেদ জয় দলের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। যে অবস্থান বঙ্গবন্ধুর, যে অবস্থান বাংলাদেশের। জয়ের কণ্ঠে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি, ‘বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে তারা এই সাহস পায় কী করে! ভাস্কর্য যারা ভেঙেছে, তারা রাজাকার। ’৭১-এ ছিল জামায়াত। এখন হয়েছে হেফাজত। তারা বাংলাদেশকে আফগানিস্তান বানাতে চায়। আমরা সেটা হতে দেব না। মৌলবাদীদের শক্তিকে দেশ থেকে মুছে ফেলা হবে।’

আমার এই দেশ সব মানুষের- এটাই বাংলাদেশের মূল সুর। এখানে সব ধর্মের মানুষ নির্বিঘ্নে নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে। ধর্মের উৎসবের অংশটা পালন করবে সবাই। এটাই আবহমান বাংলার রূপ। এই বাংলাদেশকেই আমরা ভালোবাসি। এই বাংলাদেশকে আমাদের রক্ষা করতে হবে।

লেখক: প্রভাষ আমিন, হেড অব নিউজ, এটিএননিউজ

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *