শেখ হাসিনার ৭৪তম জন্মদিন আজ

জাতীয়

১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন শেখ হাসিনা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জ্যেষ্ঠ সন্তান তিনি।

গত এক দশক ধরে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্রেই জন্মদিন কাটাতে হচ্ছিল শেখ হাসিনাকে।

এবার করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে দেশেই অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। ফলে নেতা-কর্মীরা এবার দেশেই পাচ্ছেন তাদের নেত্রীকে।

ঘটা করে জন্মদিন পালন না করতে নেতাকর্মীদের প্রতি নির্দেশনা দিলেও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কিছু কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া রোববার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দলীয় সভাপতির জন্মদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে আজ বিকাল বিকাল সাড়ে ৩টায় আওয়ামী লীগের উদ্যোগে ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সীমিত সংখ্যক নেতার অংশগ্রহণে বিশেষ দোয়া ও মিলাদ মাহফিল।

এছাড়া কেন্দ্রীয়ভাবে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে বাদ জোহর এবং দেশের সকল মসজিদে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল হবে।

সকাল ৯টায় আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহার (মেরুল বাড্ডা), ১০টায় খ্রিস্টান এসোসিয়েশন বাংলাদেশ (সিএবি) মিরপুর ব্যাপ্টিস চার্চ (২৯ সেনপাড়া, পর্বতা, মিরপুর-১০), ৬টায় তেজগাঁও জপমালা রানির গির্জা এবং সকাল ১১টায় ঢাকেশ্বরী মন্দিরে বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে। এসব কর্মসূচিতে দলের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত থাকবেন।

একইদিনে ঢাকাসহ সারাদেশে সকল সহযোগী সংগঠন আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল, বিশেষ প্রার্থনা ও আলোকচিত্র প্রদর্শনী হবে। এসব কর্মসূচি যথাযথ স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিধি মেনে করতে বলা হয়েছে।

আওয়ামী লীগের সব জেলা, মহানগর, উপজেলা, পৌর, ইউনিয়ন, ওয়ার্ডসহ সমস্ত শাখার নেতাদের কেন্দ্রীয় কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সংগ্রামের মধ্যদিয়ে জীবনের ৭৩ বছর পার করে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ দেশের উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন।

তার জীবনগাথা তুলে ধরে রোববার এক অনুষ্ঠানে তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেন, “শেখ হাসিনার জন্মের সময় পিতা (কাছে) ছিলেন না। বেড়ে ওঠার সময় পিতা বেশিরভাগ সময় অনুপস্থিত ছিলেন। পিতা তো বেশিরভাগ সময় জেলখানাতে থাকতেন। বিয়ের সময়ও বাবা জেলখানায়। তার পুরো জীবনটা সংগ্রামের জীবন, আজও তিনি সংগ্রামের মধ্যেই।

“অনেকে মনে করেন তিনি প্রধানমন্ত্রী, কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কোনো ব্যক্তিগত জীবন নেই। সারাক্ষণ দেশ, দল এগুলো নিয়ে ভাবতে হয়, কাজ করতে হয় এবং সারাক্ষণ নানা সমস্যা সামাল দিতে হয়। এখনও তিনি সংগ্রামের মধ্যে প্রতিনিয়ত।”

শেখ হাসিনার শৈশব-কৈশোর কেটেছে মধুমতি নদীর তীরবর্তী টুঙ্গিপাড়ায়। সেখানে এক পাঠশালায় তার শিক্ষাজীবনের শুরু। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে পরিবারকে ঢাকায় নিয়ে আসেন।

ঢাকায় শেখ হাসিনার শিক্ষাজীবন শুরু হয় টিকাটুলির নারী শিক্ষা মন্দিরে, যা এখন শেরেবাংলা গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ নামে পরিচিত। এরপর ১৯৬৫ সালে আজিমপুর বালিকা বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাস করেন তিনি। পরে ইডেন কলেজে ভর্তি হয়ে

১৯৬৬-৬৭ সালে ছাত্রলীগ থেকে কলেজ ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি।

এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে পড়ার সময় রোকেয়া হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শেখ হাসিনা। ছাত্রলীগের নেত্রী হিসেবে তিনি আইয়ুববিরোধী আন্দোলন এবং ৬ দফা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।

বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করলে তার জীবন ও পরিবারের উপর নেমে আসে গভীর বিপদাশঙ্কা। ওই ঝড়ো দিনেই বঙ্গবন্ধুর আগ্রহে ১৯৬৮ সালে পরমাণু বিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে শেখ হাসিনার বিয়ে হয়।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানি বাহিনী গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়ার পর গোটা পরিবার ঢাকায় গৃহবন্দি ছিলেন। অবরুদ্ধ বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের ২৭ জুলাই শেখ হাসিনা প্রথম মা হন। সজীব ওয়াজেদ জয়ের জন্মের দুই বছর পর ১৯৭২ সালের ৯ ডিসেম্বর মেয়ে সায়মা হোসেন পুতুলের জন্ম হয়।

১৯৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার আগে ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে শেখ হাসিনা জার্মানিতে স্বামীর কাছে গিয়েছিলেন। সেখানে অবস্থানকালে তিনি পরিবারের সবাইকে হারানোর খবর পান।

তাত্ক্ষণিকভাবে দেশে ফেরার কোনো পরিবেশ না থাকায় শেখ হাসিনা ইউরোপ ছেড়ে স্বামী-সন্তানসহ ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন।

১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের সম্মেলনে শেখ হাসিনাকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। আর ওই বছরেরই ১৭ মে প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে মাতৃভূমিতে ফেরেন তিনি।

জিয়াউর রহমানের শাসনকালে ওই সময়ের অবস্থার কথা বর্ণনা করে শেখ হাসিনা নিজেই বলেন, তখন তাকে বঙ্গবন্ধু ভবনে ঢুকতে দেওয়া হয়নি, পরিবারের জন্য মিলাদ পড়াতে পারেননি তিনি। বঙ্গবন্ধুর নাম নেওয়াও তখন সরকারিভাবে এক রকম নিষিদ্ধ ছিল।

১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিরোধীদলের নেতা নির্বাচিত হন শেখ হাসিনা। সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন তিনি। সেই আন্দোলনে ১৯৯০ সালে এইচ এম এরশাদের পতন ঘটে। ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত হন তিনি।

১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়ে সরকার গঠন করে এবং সে বছরের ২৩ জুন দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন শেখ হাসিনা। তার সরকারের আমলেই ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি, সম্পাদিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি।

২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়। দলটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, ষড়যন্ত্র ও কারচুপির মাধ্যমে তাদের হারানো হয়েছে।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড নিক্ষেপ করে শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়। তিনি বেঁচে গেলেও ওই হামলায় ২৪ জন নিহত এবং কয়েকশ নেতা-কর্মী আহত হন।

এরপর ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনে অগণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব নিয়ে শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করে। তাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও চালানো হয়।

সেসব ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা। তারপর টানা তৃতীয় মেয়াদে এখন সরকার প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদের ভাষায়, “শেখ হাসিনা ঝড়, বৃষ্টি, আঁধার রাতে সমস্ত ঝঞ্জা, সঙ্কটে, সংগ্রামে বাঙালি জাতির পাশে ও সাথে থেকেছেন। তাকে ১৯ বার হত্যা করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে।

“তিনি বার বার মৃত্যু উপত্যকা থেকে ফিরে এসে কখনও বিচলিত ও দ্বিধান্বিত হননি; আরও প্রত্যয়ী হয়ে বাংলাদেশে মানুষের সংগ্রামের কাফেলাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন এবং দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে মানুষের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন।”

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ঘোষণা দিয়ে ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণকারী শেখ হাসিনা তার লক্ষ্য ঠিক করেছেন ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত দেশের কাতারে নেবেন, পূরণ করবেন জাতির পিতার স্বপ্ন।

তার নেতৃত্বে বাংলাদেশের উন্নয়ন এখন গোটা বিশ্বেই প্রশংসিত।

তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেন, “আজকে বাংলাদেশ বদলে গেছে। এখন কিন্তু গ্রামে শহরের অনেক সুবিধা পাওয়া যায়। গ্রামে এখন আর কুঁড়েঘর নেই, বাংলাদেশে এখন আর খালি পায়ে মানুষ দেখা যায় না, ছেঁড়া কাপড় পরা মানুষ দেখা যায় না। আকাশ থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহর চেনা যায় না। ১০-১২ বছর আগে যে বিদেশে গেছে, সে এসে দেশ, শহর, গ্রাম চিনতে পারে না।

“এটিই বদলে যাওয়া বাংলাদেশ, এখানেই শেখ হাসিনার সাফল্য।”

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *