আদিতমারী : কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ॥ ফসল বৃদ্ধির সম্ভাবনা ঘুরে দাঁড়াবে কৃষক

সারাবাংলা

লালমনিরহাট প্রতিনিধি
দেশ এখন আধুনিক কৃষির উপর নির্ভরশীল। বাড়ছে মানুষ, কমছে কৃষি জমি। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যের চাহিদা মেটাতে নির্ভরতা বাড়ছে কৃষির ওপর। কিন্তু নির্ভরতা বাড়লেও বাড়ছে না ফসলি জমি। আর তাই তো কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও উৎপাদন ব্যয় কমাতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ও আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারে নানা উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার। সরকারের গৃহীত উদ্যোগ বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছে কৃষি বিভাগ। লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার নির্দেশনায় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা আধুনিক কৃষিযন্ত্র প্রদর্শন ও ব্যবহার করে প্রদর্শনী ক্ষেতে ফসল উৎপাদন করে কৃষকদের অনুপ্রাণিত করছেন। সেই সঙ্গে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও উৎপাদন ব্যয় কমাতে বিভিন্ন প্রকল্প ও ভর্তুকির আওতায় উপজেলার কৃষকদের দেওয়া হচ্ছে আধুনিক কৃষিযন্ত্র।
আদিতমারী উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য মতে, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে রংপুর বিভাগ কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় উপজেলার বিভিন্ন কৃষক পক্ষের মধ্যে ১০টি রাইস ট্রান্সপ্লান্টার, ১২টি রিপার, ৫১টি পাওয়ার থ্রেসার এবং একই প্রকল্পের আওতায় ফুটপাম্প, উইডার, হ্যান্ড স্প্রেয়ার, উইনোয়ার বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে। কৃষিতে শ্রমিক নিভর্রতা কমাতে কৃষি ভর্তুকির আওতায় ৯ ধরনের কৃষি যন্ত্র দেওয়া হচ্ছে। সরেজমিন ঘুরে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের সঙ্গে কথা হলে বোরো মৌসুমে ধান কাটার কথা উল্লেখ করে তারা জানায়, একসঙ্গে অনেকের জমির ধান পাকায় শ্রমিক নিয়ে অনেকটা টানাটানি অবস্থা ছিল। তা ছাড়া ধান কাটা, ক্ষেত থেকে ধান আনা এবং মাড়াই করার জন্য পৃথক শ্রমিকের পিছু ছুটতে হত। কৃষি অফিসের পরামর্শে কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার দিয়ে আমরা স্বল্প খরচ ও সময়ে সরাসরি ক্ষেত থেকে একেবারে বস্তাবন্দি প্রায় বাজারজাত করার উপযোগী ধান ঘরে তুলেছি। এতে ফসল উৎপাদনে খরচ কমার পাশাপাশি চাষাবাদে শ্রমিক নির্ভরতা কমেছে। চলতি রোপ আমন মৌসুমে চারা রোপণের জন্য সনাতন পদ্ধতির ব্যবহার না করে রাইস ট্রান্সপ্লান্টারের মাধ্যমে চারা রোপণ করছেন উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের কৃষক। এসময় ধান চাষিদের সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, শ্রমিক দিয়ে চারা রোপণের অর্ধেক খরচে রাইস ট্রান্সপ্লান্টার যন্ত্রের মাধ্যমে জমিতে ধানের চারা রোপণ করেছি। যন্ত্রের মাধ্যমে কম চারা দিয়ে সঠিক দূরত্বে জমিতে রোপণ করা সম্ভব হয়েছে। সমানভাবে সঠিক দূরত্বে চারা রোপণের ফলে ক্ষেতের পরিচর্যা করা সহজ হবে। রাইস ট্রান্সপ্লান্টার দিয়ে লাগানো ধানের চারা গাছগুলো সবুজ সতেজতায় দ্রুত বেড়ে ওঠছে। আমরা আশা করি যান্ত্রিক পদ্ধতি ব্যবহার করে কম খরচে এবারে আমরা বেশি ফলন পাবো।
সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এসিআই মটরস এর লালমনিরহাট টেরিটরি ম্যানেজার হামিদুর ইসলাম জানায়, যেখানে ১ একর জমিতে প্রচলিত পদ্ধতিতে ধানের চারা রোপন করতে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা খরচ হতো আর সময় লাগতো সারা দিন। কিন্তু আধুনিক ইয়ানমার রাইস ট্রান্সপ্লান্টার ব্যবহারে ২ ঘণ্টায় ১ একর জমিতে ধানের চারা রোপণ করা যায়। একর প্রতি জ্বালানি খরচ ২ থেকে আড়াই লিটার। ইয়ানমার রাইস ট্রান্সপ্লান্টার ব্যবহারে চারা রোপণ করলে লাইন সোজা হয়। চারা থেকে চারার দূরুত্ব নির্দিষ্ট থাকে ফলে পরবর্তীতে আগাছা নিংড়ানো, সার ও কীটনাশক ছিটানো ও এমনকি ধান কাটা সহজ হয়। কুশির সংখ্যাও অনেক বেশি হয়। ফলে অধিক খড় পাওয়া যায়।
আদিতমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলীনুর রহমান জানায়, প্রথমবারের মত যান্ত্রিকভাবে রাইস ট্রান্সপ্লান্ট যন্ত্রের সাহায্যে চলতি রোপা আমন মৌসুমে আমন ধানের চারা রোপণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এতে খরচ ও সময় কম লাগায় স্থানীয় কৃষকরা এ যন্ত্রের সাহায্যে চারা লাগানোয় আগ্রহ বাড়ছে। যান্ত্রিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করার জন্য আমরা কৃষকদের বিভিন্ন প্রকল্প ও ভর্তুকির আওতায় কৃষি যন্ত্র দিচ্ছি। কৃষিতে শ্রমিক নিভর্রতা কমিয়ে যান্ত্রিক পদ্ধতি ব্যবহার করে কম খরচে ফসল উৎপাদনে সাফল্য পেয়েছেন এখানকার কৃষকরা। আদিতমারীতে কৃষিতে সমৃদ্ধি এখন আর কোনো কল্পকথা নয়। বাস্তবতায় অনুপ্রাণিত হয়ে এখানকার কৃষকরা এখন আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদে আগ্রহী হয়েছেন। আশা করি সমৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত রেখে ক্ষুধামুক্ত, খাদ্যে স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণে এ অঞ্চলের কৃষকরাও ভূমিকা রাখবে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *