আরামদায়ক রেলভ্রমণে বাড়ছে আতঙ্ক

জাতীয় সারাবাংলা

ডেস্ক রিপোর্ট: নিরাপদ ও আরামদায়ক যাতায়াতে দেশে ট্রেনের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। নেই আগের মতো শিডিউল বিপর্যয়। কোচগুলোও পরিচ্ছন্ন-আরামদায়ক। ট্রেনে দুর্ঘটনা অপেক্ষাকৃত কম। যাত্রাও পরিবেশবান্ধব। দূরযাত্রায় তাই পছন্দের শীর্ষে থাকে ট্রেন। তবে সবকিছুর পরও আতঙ্ক হিসেবে নেমে এসেছে পাথর নিক্ষেপের খড়গ। পাথরের আঘাতে জানালার কাচ ভেঙে আহত হচ্ছেন অনেক যাত্রী। কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। যাত্রীদের অভিযোগ, প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো অঞ্চলে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটছে। এই পাথর নিক্ষেপ এখন মূর্তিমান আতঙ্ক। অথচ রেলওয়ে আইনে পাথর নিক্ষেপের সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন কারাদ-সহ ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।

রেলওয়ের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ট্রেনকে যাত্রীবান্ধব করতে রেলওয়ের আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই। এখন চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ বন্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগসহ জনসচেতনতা বাড়াতে কাজ করছে রেলওয়ে। পাথর নিক্ষেপে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিয়মিত রেল-পুলিশের টহল বাড়ানোসহ স্কুলশিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, মসজিদ-মন্দিরের ইমাম-পুরোহিতদের সহযোগিতায় জনসচেতনতা তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়া কেউ পাথর নিক্ষেপকারীকে ধরিয়ে দিলে তাকে ১০ হাজার টাকা পুরস্কারের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া রাজশাহীগামী বনলতা এক্সপ্রেস ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় স্বামী-স্ত্রী আহত হয়েছেন। গত সোমবার বিকেল ৫টার দিকে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় চলন্ত বনলতা এক্সপ্রেস ট্রেনে এ ঘটনা ঘটে। আহতরা হলেন- রেবিনা আক্তার সুমি (২২) ও তার স্বামী আব্দুল করিম সোহেল (৩০)। তারা রাজশাহী মহানগরীর চারখুটা নতুন হড়গ্রাম এলাকার বাসিন্দা। ভুক্তভোগী আব্দুল করিম সোহেল বলেন, স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে বনলতা ট্রেনে চড়ে রাজশাহী আসছিলাম।

বিকেল ৫টার দিকে সিরাজগঞ্জ রেলস্টেশন পার হওয়ার পর হঠাৎ করেই ট্রেন লক্ষ্য করে কয়েকজন পাথর নিক্ষেপ করতে থাকে। জানালার পাশে বসে থাকায় আমার স্ত্রীর নাকে পাথর লেগে ফেটে রক্তাক্ত হয়। তাকে বাঁচাতে গিয়ে আমারও হাতে-কপালে পাথরের আঘাত লাগে। তিনি বলেন, আমাদের চিৎকারে অন্য যাত্রী ও ট্রেনে ডিউটিরত পুলিশ এগিয়ে আসে। তবে ওই সময় গার্ডকে খবর দেওয়া হলেও প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য কোনো ওষুধ বা সরঞ্জামাদি পাইনি। তিনি আরো বলেন, ট্রেনটি পরের স্টেশনে দাঁড়ালে বাইরের দোকান থেকে কোনোরকম প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়া হয়। রাজশাহী পৌঁছালে আমরা দ্রুত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে যাই।

এ বিষয়ে রাজশাহী স্টেশন ম্যানেজার আব্দুল করিম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ওই ট্রেনে জিমি নামের গার্ড কর্মরত ছিলেন। তিনি আরো বলেন, আমরা পরের স্টেশনে গিয়েছিলাম তাদের সাহায্যের জন্য। কিন্তু তাদের খুঁজে পাইনি। হয়তো তারা চিকিৎসার জন্য স্টেশন ত্যাগ করেছেন। এর আগে গত ১৫ আগস্ট নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলায় চলন্ত ট্রেনে নিক্ষেপ করা পাথরের আঘাতে আজমির ইসলাম নামের পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুর একটি চোখ নষ্ট হয়ে যায়। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এমন ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে নানা কর্মসূচি পালন করেন নাগরিক প্রতিনিধিরা। পরে ৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর রেলভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে পাথর নিক্ষেপ বন্ধে জনসচেতনতা বাড়াতে রেলওয়ের কর্মসূচি বা উদ্যোগের কথা জানান রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন।

ওই সংবাদ সম্মেলনে রেলমন্ত্রী বলেন, উপমহাদেশে ১৮৫৩ সালে ট্রেন চালুর পর থেকেই পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটছে। উন্নত দেশেও এই অপকর্মটি হচ্ছে। কিন্তু বর্তমানে সমস্যাটি ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ট্রেনের গার্ড, কর্মচারী, যাত্রীও আহত হচ্ছেন। অনেকে চোখ হারিয়েছেন। মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে পাথর নিক্ষেপ বন্ধে সচেতনতা তৈরির জন্য আমরা বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। রেলমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের ১৩ দিন পর ১৫ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের ভৈরবে আবারও চলন্ত ট্রেনে দুর্বৃত্তদের পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। পাথরের আঘাতে মমতাজ মারোয়া (৫০) নামে এক যাত্রী গুরুতর আহত হন। এছাড়া গত ২ অক্টোবর ঢাকা থেকে সিলেটগামী আন্তঃনগর উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনে পাথর ছুদদড়ে মারা হয়। এতে ট্রেনটির অন্তত চার যাত্রী আহত হন। গত ৬ অক্টোবর বিশেষ ট্রেনে করে পাথর নিক্ষেপ বন্ধে জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করে লালমনিরহাট বিভাগীয় রেলওয়ে দপ্তর।

এই দপ্তরের ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) শাহ সুফী নুর মোহাম্মদ স্থানীয় সাংবাদিকদের জানান, লালমনিরহাট বিভাগীয় রেলওয়ে দপ্তরের আওতাধীন এলাকায় গত ৯ মাসে চলন্ত ট্রেনে ১৫টি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে লালমনিরহাট থেকে সান্তাহার রেলরুটে ঘটেছে নয়টি ঘটনা। এসব ঘটনায় রেলওয়ের দুজন কর্মী, যাত্রীসহ মোট চারজন গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। গত ১০ অক্টোবর কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে গাজীপুরের টঙ্গী স্টেশন পর্যন্ত পাথর নিক্ষেপের বিরুদ্ধে সচেতনতা কার্যক্রম চালায় জিআরপি ও রেলওয়ের ঢাকা বিভাগ। এর আগে ও পরে দেশের অন্য জেলায়ও একই কর্মসূচি পালন করা হয়। এসব কর্মসূচিতে চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের কুফল, শাস্তির বিধান সম্বলিত প্রচারণা, লিফলেট ও পোস্টার বিতরণ করা হয়। বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি তথ্য ও অনুসন্ধানমূলক ফেসবুক গ্রুপ ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে ইউনিভার্সাল ফ্যান্স ফোরাম’। গত ১৭ অক্টোবর এই গ্রুপে ঢাকা-ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেস ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের একটি পোস্ট দেন সিফাত হোসেন নামে এক যাত্রী। সঙ্গে এক টুকরো পাথরের ছবিও তিনি দিয়েছেন। পোস্টে সিফাত হোসেন লেখেন, ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেস ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ করলো দুর্বৃত্তরা। তবে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। শুধু জানালার কাচ ভেঙেছে। গত ২০ অক্টোবর রাজধানীর বিমানবন্দর রেলস্টেশনে কমলাপুর থেকে ছেড়ে আসা পঞ্চগড়গামী একতা এক্সপ্রেস ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এসময় হাতেনাতে তিন তরুণকে আটক করে রেলওয়ে পুলিশ। আটকরা হলেন- আকাশ রহমান (১৮) রিফাত ইসলাম (১৯) ও মো. হাসান (১৯)। তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে রেল পুলিশ।

রেলওয়ে আইনের ১২৭ ধারা অনুযায়ী, ট্রেনে পাথর ছোড়া হলে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদ-সহ ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান আছে। ৩০২ ধারা অনুযায়ী, পাথর নিক্ষেপে কারও মৃত্যু হলে মৃত্যুদ-ের বিধান রয়েছে। যদিও এসব আইনে কাউকে শাস্তির নজির নেই। এছাড়া কেউ যেন রেললাইনের ধারের কাছে না আসতে পারে, আইনে ১৪৪ ধারা জারি করা আছে। আইনে পাথর নিক্ষেপের সাজা যাবজ্জীবন কারাদ- ও মৃত্যুদ-ের বিধান থাকলেও এখন পর্যন্ত কাউকে এই সাজা দেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে রেলওয়ে পুলিশ সদরদফতরের পুলিশ সুপার (ক্রাইম ও অপারেশন) তোফায়েল আহমেদ বলেন, এখন পর্যন্ত পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় যাদের ধরা হয়েছে তাদের প্রায় সবাই শিশু-কিশোর। তারা খেলার ছলে বা দুষ্টুমি করে ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ করে কাচ ভেঙেছে। শিশু-কিশোরদের মধ্যে যাদের আটক করা সম্ভব হয়, তাদের পাথর নিক্ষেপের নেতিবাচক বিষয়গুলো বোঝানো হয়। পরে তাদের অভিভাবকের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়। আর কেউ হত্যার উদ্দেশ্যে ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ করলে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত ঠিক কতজনকে এই আইনে সাজা দেওয়া হয়েছে, তা জানা সম্ভব হয়নি। যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, রেল যাতায়াত নিরাপদ করা রেলওয়ের দায়িত্ব। তবে সংস্থাটি এখনো চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ বন্ধ করতে পারেনি। রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও রেল পুলিশকে আরো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, বাংলাদেশ রেলওয়ে সরকারি মালিকানাধীন ও সরকার পরিচালিত দেশের একটি মুখ্য পরিবহন সংস্থা। বর্তমানে দেশে সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটারের বেশি রেলপথ রয়েছে। দেশের ৪৪টি জেলার সঙ্গে এই রেললাইন নেটওয়ার্ক সংযুক্ত। রেলপথে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে ১১৬টি। এতে ৩৪ জন আহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় ১০৯টি ট্রেনের জানালা ভেঙেছে। এর মধ্যে দেশের ১৫টি এলাকায় পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে সবচেয়ে বেশি। এসব বিষয়ে রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন বলেন, চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ বন্ধে রেলওয়ের জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চলমান। যেসব এলাকায় পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বেশি ঘটছে, সেখানে রেল-পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদরাসায় জনসচেতনতা তৈরিতে রেলওয়ে কাজ করে যাচ্ছে। এ ধরনের নেতিবাচক কাজ ধীরে ধীরে কমে আসবে বলে জানান রেলমন্ত্রী।

 

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *