আলুর দামে চাঙ্গা কৃষক

সারাবাংলা

ইসমাইল খন্দকার, সিরাজদিখান থেকে
মুন্সীগঞ্জ তথা বিক্রামপুরে বিগত বছরগুলোর থেকে এবছর সবচেয়ে চড়া মূল্যে আলু বিক্রি করতে পাড়ায় মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে আলু চাষিরা এখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ছে। টানা কয়েক বছর লোকসান ও দাম কম পাওয়ায় ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়েছিল কৃষকরা। এ বছর দামে বিগত দিনের লোকসান কিছুটা হলেও মোচন হবে। তবে এ বছর আলুর ন্যায্য দাম না পেলে অনেক কৃষক নিঃস্ব হয়ে যেত। অন্যদিকে হিমাগার মালিকদের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল ও ৫০ কেজি বস্তা করার কারণে প্রতিবছর লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছে। এমনটাই হিমাগার সূত্রে জানা গেছে। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, এ উপজেলায় ২০১৮ সালে ৯ হাজার ৫০০শ হেক্টর ও ২০১৯ সালে ৯ হাজার দুইশ হেক্টর জমিতে আলু আবাদ হয়েছিল। ২০২০ সালে ৯ হাজার ৫০০ হেক্টর এর বেশি আলু আবাদ হবে বলে কৃষি অফিস ধারণা করছে। ২০১৯ সালে এ উপজেলায় ১৬ হাজার একশ টন আলু বীজ লেগেছিল। এ বছর ২০২০ সালে ১৬ হাজার ৩০০ টন আলু বীজের চাহিদা রয়েছে।
কোল্ড স্টোরেজ সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ১০টি কোল্ড স্টোরেজে ধারন ক্ষমতা ৭৪ হাজার ৯৬০ টন। এর মধ্যে এ বছর ১০টি কোল্ড স্টোরেজে ৬১ হাজার ২২০ টন আলু রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ৯ হাজার ৫০ টন বীজ রয়েছে এবং ২৮ হাজার ২২০ টন খাবার আলু বিক্রি হয়েছে। বাকি ২৩ হাজার ৯৫০ টন আলু বিক্রি করতে হবে ২ মাসের মধ্যে। তা না হলে বাজারে নতুন আলু চলে আসবে। জানা যায়, প্রতিদিন ১০টি হিমাগার থেকে ২২৩ টন আলু বিক্রি করা হয়, যা দেশের বিভিন্ন পাইকারী আড়ৎ বা বাজারে বিক্রি করা হয়। ডায়মন্ট বা এসটেরিক্স আলুর ৫০ কেজির বস্তা ১৫শ থেকে ১৭শ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। গত বছর এ আলুর ৫০ কেজির বস্তার দাম ছিলো ৬শ থেকে ৭শ টাকা। তবে খুচরা বাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকা কেজি দরে।
বীজ ব্যবসাইদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ উপজেলায় মোট আলু বীজের প্রয়োজন ১৮ হাজার টন। কোন্ড স্টোরেজে রয়েছে ৯ হাজার ৫০ টন। বিএডিসি ও প্রাইভেট কোম্পানি গুলো সব মিলিয়ে ৪ হাজার টন। বিদেশ থেকে আশা বাক্স ১ হাজার টন বীজের চাহিদা পূরণ করবে। সর্বমোট ১৪ হাজার ৫০ টন বীজের চাহিদা পূরণ হবে। কৃষি অফিসের তথ্য মতে ২ হাজার ২৫০ টন ও ব্যবসাইদের তথ্য মতে প্রায় ৪ হাজার টন বীজ আলুর ঘাটতি রয়েছে।
শাহাজালাল কোল্ড স্টোরেজের ম্যানেজার আবুল বাসার বলেন, ১৫ বছর আগে যে ভাড়া ছিল এখনও তা আছে। ভাড়া তো বাড়েনি। কিন্তু বিদ্যুৎ বিল তো বেড়েছে। এজন্য কোল্ড স্টোরেজ চালানো এখন লোকসান। ৫ থেকে ৭ বছর যাবৎ আমাদের কোল্ড স্টোরেজে লোকসান দিয়ে আসছে। তবে ৫০ কেজি বস্তা করায় লস এর আরও বেড়ে গেছে। ৮০ কেজির একশ বস্তা যে জায়গাটাতে রাখতাম ৫০ কেজির বস্তা একি জায়গায় সংকলন হয় না। বস্তার পরিমাণ বেশি হওয়ায় জায়গা বেশি প্রয়োজন হয়। কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন ২২০ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করলেও ৫০ কেজির বস্তা ১৪০ টাকা থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া রাখছে অনেক হিমাগার মালিকরা। একটি বস্তাপ্রতি বিদ্যুৎ বিল ৮ মাসে খরচ হয় ১০০ টাকা। লেবারের প্রত্যেক বস্তা স্টোর থেকে ভেতরে ও বাইরে বের করতে ২৪ টাকা খরচ হয় এবং এ বস্তা কয়েকবারে উল্টে দিতে হয়। সেখানে আমাদের খরচ হয় ১ টাকা ৬০ পয়সা। এর মধ্যে কর্মচারীদের বেতন, গ্যাসসহ অন্যান্য খরচ তো আছেই।
উপজেলার রামানন্দ গ্রামের কৃষক জাকির মুন্সি বলেন, ২০০৯ সাল থেকে আমাদের আলুতে লোকসান হচ্ছে। তবে এ বছর আলুর দাম না পেলে আমার মত অনেক চাষি নিঃস্ব হয়ে যেত। এবারের মত আলুর চড়া মূল্য বিগত কোন বছরই পাইনি। তিনি আরও বলেন, গত বছর ৬৮ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছি। এ বছর কোল্ড স্টোরেজে ৬০ কেজি ওজনের ৬ হাজার বস্তা আলু রেখেছি। আমি ১২শ থেকে ১৭ টাকা পর্যন্ত বস্তা বিক্রি করেছি। এর মধ্যে বস্তাপ্রতি হিমাগার ভাড়া ২০০ টাকা নিয়েছি। আর দুই মাস পরই আবার শুরু হবে আলু রোপণের মৌসুম। সামনের মৌসুমে ২০০ বিঘা আলু চাষ করবো।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাফীয়ার রহমান বলেন, এ বছর আলুর দাম ভালো হওয়ায় জমির পরিধি বাড়বে। আর এ কারনে সার ও বীজ আলুর চাহিদা বেড়েছে। এ উপজেলায় সার ও বীজের অতিরিক্ত চাহিদা যথাযথ কর্তৃপক্ষ বরাবর পাঠানো হয়েছে। প্রসঙ্গত, করোনা, বর্ষার জল ও বৃষ্টির কারণে নিত্যদিনের পণ্যের দাম বেড়েই চলছে। আর এ কারণে আলুর উপর ভরসা রাখছিল নিম্ন আয়ের মানুষ। এখন সেই আলুর দামও আকাশচুম্বী। গত ১১ বছর পর আলুর চড়া মূল পেল কৃষক। তবে এবারের আলুর দাম বিগত বছরগুলোকেও ছাড়িয়ে গেছে। তবে এ বছর আলুর ন্যায্য দাম না পেলে অনেক কৃষক নিঃস্ব হয়ে যেত।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *