ইসরায়েল-বাহরাইন সম্পর্কে সৌদির হস্তক্ষেপ

আন্তর্জাতিক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: আরব আমিরাতের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্থাপনের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দূত হয়ে মধ্যপ্রাচ্য সফরে গিয়েছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও। সফরের উদ্দেশ্য ছিল, আমিরাতের মতো অন্য দেশগুলোকেও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে উৎসাহিত করা। তবে বাহরাইনের বাদশাহ পম্পেওকে সাফ বলে দেন, তারা ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তাই ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা সম্ভব নয়। পম্পেও ব্যর্থমনোরথ হয়ে ফিরে যান। কিন্তু তার মাত্র কয়েকদিন পরেই বাইরাইন সবাইকে চমকে দিয়ে জানিয়ে দিল, তারা ইহুদি রাষ্ট্রটির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে রাজি। গত সপ্তাহে ওই ঘোষণার মধ্য দিয়ে এখন তারা ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক বিনির্মাণে এগিয়ে যাওয়া সর্বশেষ দেশ। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাস, আরো দেশ এগিয়ে আসবে তাদের পথ ধরে।

২৬ বছর আগে বাহরাইন একটি ইসরায়েলি প্রতিনিধি দলকে স্বাগত জানিয়েছিল। এরপর দীর্ঘ নীরবতার পর গত সপ্তাহে তারা ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কস্থাপনকারী শেষতম দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল। পম্পেওর সঙ্গে বৈঠকে বাহরাইন যতই ‘না’ ‘না’ করুক, শেষ পর্যন্ত যে ব্যাপারটা ঘটবে, তা নিয়ে জল্পনা কল্পনা চলছিল বিশ্লেষকদের মধ্যে। লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স-এর প্রফেসর ইয়ান ব্ল্যাক বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়গুলোতে যুক্তরাষ্ট্র নেভির আঞ্চলিক সদর দপ্তর ও সৌদি আরবের সঙ্গে সীমান্তসংযুক্ত দেশ বাহরাইন ইসরায়েলের ব্যাপারে আগের সে অনড় মনোভাব থেকে অনেকটা সরে এসেছিল।

২০১৭ সালে বাহরাইনের বাদশাহ হামাদ বিন ইসা আল খলিফা যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। বৈঠকে ইসরায়েলকে আরব দেশগুলোর বয়কটের কার্যক্রমে নিজেদের অসম্মতির কথা জানিয়েছিলেন তিনি। এর এক বছর পরে ট্রাম্প যখন জেরুসালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকার করে নিয়ে তেল আবিব থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস স্থানান্তরের ঘোষণা দেন, তার অব্যবহিত পরেই সরকারসমর্থিত বাহরাইন আন্তঃসংযোগ বিভাগ ইসরায়েল সফরে যায়, তখন ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষের সৃষ্টি হয়।

স্বাভাবিকভাবেই বাহরাইনের এই ঘোষণায় প্রবল হতাশায় নিমজ্জিত হয় ফিলিস্তিনিরা। তারা এই চুক্তিকে তাদের সঙ্গে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে অভিহিত করে। এর দ্বারা ট্রাম্প বিজয়ী হন এবং ইরানকে দৃশ্যত একা করে ফেলে। ইয়ান ব্ল্যাক বলেন, শুক্রবারের ওই চুক্তিকে ফিলিস্তিনিরা বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে নেয়। তারা প্রচণ্ড বিক্ষুব্ধ হয় এবং আরব দেশগুলোর কাছে তাদের গুরুত্ব যে আর আগের মতো নেই, এটা বুঝতে পেরে বিচলিত হয়ে পড়ে।

ফিলিস্তিনি নেতারা চায়, ১৯৬৭ সালের আগের মতো চারদিকে কার্যকর সীমান্তসহ নিজেদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। কিন্তু ৬৭-এর যুদ্ধে ইসরায়েল পশ্চিম তীর দখল করে নেয় এবং পূর্ব জেরুসালেমের দিকে নিজেদের অধিকার বাড়াতে শুরু করে। আরব দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলকে অধিকৃত এলাকা ছেড়ে দিতে আহ্বান জানায়। কিন্তু ইসরায়েল তাতে পাত্তা না দিয়ে উল্টো অধিকৃত ভূমিতে নিজেদের বসতি নির্মাণ শুরু করে।

ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠায় নিজেদের অঙ্গীকারবদ্ধ বলে দাবি করার মাত্র দিনকয়েক পরেই ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের পেছনে বাহরাইনের জন্য মূল কারণ সৌদি প্রভাব। আঞ্চলিকভাবে প্রভাববিস্তারে আগ্রহী ও ইরানের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরব বলেছে, তারা ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে প্রস্তুত নয়, তবে বিশ্লেষকরা এমনটা বলেছেন যে, সৌদি আরবের কাছ থেকে উৎসাহ পাওয়া ছাড়া বাহরাইনের পক্ষে এধরনের পদক্ষেপ নেয়া একক বিবেচনায় সম্ভব ছিল না। ফিলিস্তিনের পলিসি নেটওয়ার্ক আল শাবাকার সদস্য মারওয়া ফাতাফতার মতে, এই সিদ্ধান্ত সৌদি আরব থেকেই এসেছে। ২০১৮ সালে ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য পরিকল্পনায় কুয়েত, আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের সম্মতিতে বাহরাইনের অর্থনীতিকে গতিশীল করার লক্ষ্যে ১০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক সহাযতা প্রস্তাব অনুমোদিত হয়।

২০১১ সালে আরব বসন্তের অভ্যুত্থানের সূচনাকালে সৌদি আরব বাহরাইনে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে সেনা পাঠিয়েছিল। বাহরাইনি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে যারা সমাবেশ করেছিলেন, তাদের অনেকেই ছিলেন দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়া জনগোষ্ঠীর, যারা দীর্ঘকাল দমন-পীড়নের অভিযোগ করে আসছেন।

বাহরাইনের বাদশাহদের আসলে নিজেদের জনগণের প্রতি কোনো আস্থা নেই। তাই শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত চাপ ও সৌদি আরবের নির্দেশনায় তারা ইসরায়েলকে দৃশ্যত কাছে টানতে বাধ্য হয়েছে। সূত্র : আল জাজিরা।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *