একের পর এক ধর্ষণ

মতামত

টেলিভিশন খবরের প্রথম পনের মিনিট, সংবাদপত্রের প্রথম ভাঁজের পুরোটা, অনলাইন পোর্টালগুলোর দৃশ্যমান পেজের সবটুকুতে কেবলই ধর্ষণের খবর। গত কয়েকদিন এমনটাই অবস্থা। এর বাইরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের যত মতামত তার বেশিরভাগই এই এক বিষয়। অনেকেই প্রশ্ন করছেন, ‘আর কি কিছু ঘটছে না দেশে’? ঘটছে, কিন্তু যারা এমন প্রশ্ন করেন, তারা কি কখনও ভেবে দেখেছেন ধর্ষণের চেয়ে কদর্য ঘটনা আর কোনটি?

সিলেটে স্বামীর সাথে সন্ধ্যায় বেড়াতে বের হয়ে এমসি কলেজের হোস্টেলে ও পাহাড়ি এলাকা খাগড়াছড়িতে এক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কিশোরীকন্যা সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ঘটনা দুটি এমন এক সময়ে ঘটেছে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাবেক সহ-সভাপতি (ভিপি) নুরুল হক নুরের বিরুদ্ধে এক তরুণীকে অপহরণ, ধর্ষণ, ধর্ষণে সহযোগিতা করার একটি অভিযোগ বড় খবর হয়ে উঠছিল কেবল।

খাগড়াছড়ির ঘটনায় মৃদু আলোচনা শুরু না হতেই, সিলেট এমসি কলেজের ঘটনা, সেই ঘটনায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীর নাম চলে আসায় নুরুদের আলোচনাটা বলতে গেলে সাইডলাইনে চলে যায়। কিন্তু ধর্ষণকাণ্ড থেমে থাকে না। এই লেখা যখন লিখছি তখন জানলাম রাজশাহীর তানোরে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে গির্জার ফাদারকে।

টেলিভিশন টকশোতে কড়াকড়া আলাপ যখন হয়, কিছু মানুষ যখন ধর্ষণের শিকার নারীর পোশাক-আশাক, স্বভাব-চরিত্র, অসময়ে পথে নামার দুঃসাহস নিয়ে কটাক্ষ করেন, যখন একটি অংশ বলতে শুরু করে কেন ছাত্রলীগ করলেই এত হৈ চৈ হয়, কিংবা ধর্ষকের কোনো দল বা পদবি আছে বা নেই নিয়ে সামাজিক মাধ্যম গরম হয়ে ওঠে, তখন ধর্ষণের শিকার নারীদের মর্যাদা ও সম্মান আরও বেশি করে ভূলুণ্ঠিতই হতে থাকে, প্রতিকার হয় না।

খুন, ডাকাতি, অপহরণ যেমন বাড়ছে, তেমনি বেড়ে চলেছে ধর্ষণের ঘটনা। এটি বড় ভাবনার বিষয়। প্রশাসনে, রাজনীতিতে, ব্যবসা-বাণিজ্যে নারীর যোগদানের ক্ষেত্র বাড়ছে, অর্থনীতিও উন্মুক্ত বাজারে নারীর যোগ্যতা ও দক্ষতার মর্যাদা দিতে এগিয়ে আসছে। সেই সময়টায় নারীর ওপর এমন পীড়ন কেন বাড়ল সে নিয়ে আলোচনা হলে যাদের গাত্রদাহ হয়, যারা সবকিছুতে রাজনীতি দেখেন, কিংবা যারা নারীর চালচলন ও পোশাকের দোষ খোঁজেন তারা বুঝে না বুঝে প্রকারান্তরে ধর্ষকের সহযোগী হয়ে উঠছেন।

ধর্ষণ কেবলই যৌনইচ্ছা পরিপূরণের উদ্দেশে করা হয় না। সিলেট এমসি কলেজের ঘটনায় জড়িত ছেলেরা ক্ষমতাশালী, তারা বন্ধ ক্যাম্পাসে, বন্ধ হোস্টেলে অবস্থান করতে পারে, কারণ তারা ক্ষমতাশালী। আসলে তারা একটা বার্তা দিতে চেয়েছিল যে তারা কত ক্ষমতা রাখে। তাই তারা ধর্ষণ করেও হোস্টেলে অবস্থান করছিল, হুমকি ও ভয়ভীতি দিয়ে যাচ্ছিল, তাদের পক্ষ নিয়ে কেউ কেউ আপস-রফার চেষ্টা করছিল। এটাই ক্ষমতা বা ক্ষমতার কেন্দ্রের সাথে যোগসাজশ থাকার দুর্বীনিত প্রকাশ। পুরুষতন্ত্র, রাজনৈতিক আধিপত্যের সব নকশা বজায় রাখবার একটি উপায় হলো নারীকে ধর্ষণ করা।

যতদিন এই আর্থ-সামাজিক সমীকরণটি না বুঝব আমরা ততদিন ধর্ষণ, যৌন নির্যাতনসহ নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংসতা বন্ধ করার জন্য কঠোর আইন করেও কিছু হবে না। আইন আছে, কিন্তু নেই সেই আইনের যথাযথ প্রয়োগ। ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের যত ঘটনা আমরা জানতে পারি, সেই তুলনায়, এসব অপরাধের দায়ে অপরাধীদের শাস্তির দৃষ্টান্ত পাই কম। অপরাধের শাস্তি যদি অপরাধের আনন্দের চেয়ে কম হয়, তবে সেই অপরাধ বন্ধ হবে কী করে? এই বাস্তবতা দেখেই অপরাধীরা অপরাধকর্মে লিপ্ত হয়। আগেও বলেছি, আবারও বলছি ধর্ষণ শুধু নারী নির্যাতন নয়, বরং বলতে হবে বৃহত্তর সামাজিক অন্যায়ের এক প্রকাশ যার বেশিরভাগ ঘটে ক্ষমতা প্রদর্শনের দুঃসাহস থেকে।

ধর্ষণের ঘটনাগুলোকে গুরুত্ব দেয়া এবং তার প্রতিকার করা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত জরুরি। ধর্ষণসহ নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংস অপরাধের রাশ টেনে ধরার জন্য প্রথম কর্তব্য এসব অপরাধের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগে গতি সঞ্চার করা। অপরাধ সংঘটনের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধীদের গ্রেফতার করতে হবে, যেটা সিলেট ও খাগড়াছড়ির ক্ষেত্রে হয়েছে। কিন্তু শুধু গ্রেফতার করলেই হবে না। একের পর এক ধর্ষণের খবরের পাশাপাশি যদি একের পর এক শাস্তির খবরও আসত, তাহলে ধর্ষণপ্রবণতা হ্রাস পেত বলে মনে করি। প্রতিটি ঘটনার তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেফতার ও দ্রুতবিচারের উদ্যোগ নেয়াই বড় পদক্ষেপ।

অভিযোগের তদন্ত করে অভিযোগ গঠন এবং আদালতে নিষ্পত্তি- এই দুটি জায়গা যদি ত্বরান্বিত না হয় তাহলে বিষয়টি সবসময় উদ্বেগজনক থেকে যাবে। দ্রুত ও যৌক্তিক আইন প্রয়োগই পারে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে। সেটি না হলে অপরাধীরা অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ খোঁজে রাজনীতির সাথে তার যোগসাজশকে কাজে লাগিয়ে। সুশাসন তথা আইনের শাসন দুর্বল হয় সেখানেই।

এ্রর বাইরে সামাজিক শক্তির বড় জাগরণও প্রয়োজন। নারী-পুরুষ, ধনী-দরিদ্র, ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষে নারীর মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে ধর্ষণ কমানো সম্ভব না। আর এটা শুধু রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সম্ভব নয়। ধর্ষণের ঘটনায় অপরাধ ধর্ষকের, দোষ, পাপ, অন্যায়, ধর্ষকের- এ কথাগুলো সোচ্চার হয়ে বলতে হবে সবাইকে- রাজনৈতিক বিভাজন যে স্তরে যতটাই থাকুক না কেন।

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা, প্রধান সম্পাদক, জিটিভি

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *