এখনও দখলমুক্ত হয়নি তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড

জাতীয়

এসএম দেলোয়ার হোসেন: 
রাজধানীর তেজগাঁও সাতরাস্তা-রেলক্রসিংয়ের বিস্তির্ণ এলাকা ফের দখল হয়ে গেছে। বিভিন্ন এজেন্সি ও ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির ট্রাক-কাভার্ডভ্যানের অবৈধ পার্কিয়ের ফলে বেদখলে রূপ নিয়েছে এ সড়কটি। এখনো দখলমুক্ত হয়নি জনগুরুত্বপূর্ণ ব্যস্ততম এই সড়কটি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখের সামনেই প্রতিদিনই সড়কের দুই পাশে যত্রতত্র পার্কিং করা এবং ইঞ্জিন মেরামত করায় এলাকার পরিবেশ নষ্টসহ অন্যান্য যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে ট্রাক-কাভার্ডভ্যান সিন্ডিকেট।

ভুক্তভোগীরা জানান, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের উদ্যোগে সড়কটি ট্রাক-কাভার্ডভ্যান দখলমুক্ত করা হলেও প্রশাসনের নিস্ক্রিয়তায় ফের দখল হয়ে গেছে। এতে প্রতিনিয়ত চরম দুর্ভোগে পড়ছেন এই সড়কে চলাচলকারী পথচারী ও সাধারণ মানুষসহ বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রীরা। আজ রোববার (২১ নভেম্বর) ভুক্তভোগীসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তদানীন্তন মেয়র আনিসুল হক তেজগাঁও সড়কটি ট্রাকের দখলমুক্ত করতে গিয়ে ট্রাক শ্রমিকদের তোপের মুখে পড়েন। কিন্তু তিনি অনড় থাকায় ৬৭ বছর ধরে বেদখলে থাকা ট্রাকস্ট্যান্ড সংলগ্ন সড়কটি দখলমুক্ত করা হয় মাত্র দু’দিনে। এরপর ২০১৭ সালে সাতরাস্তা থেকে রেলক্রসিং পর্যন্ত সড়কের উন্নয়ন করে সড়ক বিভাজকে লাগানো হয় গাছ। সড়কটি দখলমুক্ত হওয়ায় এর সুফলও পেতে শুরু করে নগরবাসী। তবে ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর ডিএনসিসি’র মেয়র আনিসুল হকের মৃত্যু হলে কর্তৃপক্ষের শিথিলতার সুযোগ নিয়ে আবারও তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড সংলগ্ন সড়কগুলোর বিশাল অংশ দখল করে নিয়েছে ট্রাক-কাভার্ডভ্যান ট্রাক মালিক ও শ্রমিকরা।

গত বুধবার বিকেলে প্রায় ঘণ্টাখানেক তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড সংলগ্ন সড়কগুলোতে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড এলাকার মূল সড়কে ট্রাক, কাভার্ডভ্যান পার্কিং করে রাখলেও তা সংখ্যায় কম নয়। ট্রাকস্ট্যান্ড ও তেজগাঁওয়ের অলিগলিতে ট্রাক, কাভার্ডভ্যান রাখা হয়েছে। এতে দিনের বেলা গলিগুলোতে রিকশা পর্যন্ত ঢুকতে বেগ পোহাতে হয়। পথচারীরাও ঠিকমতো হাঁটতে পারছে না। শাহ ফাতেহ আলী, একতা, নিরালা, সোনার বাংলা, মহানগর, বিনিময়, নিরালা সুপার পরিবহনসহ দূরপাল্লার বাসগুলো দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। এর সঙ্গে ট্রাক, বিভিন্ন পরিবহন এজেন্সি ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কাভার্ডভ্যানও রয়েছে। বেশিরভাগ গাড়ির মালিক বিভিন্ন ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির। এছাড়া ব্যক্তিমালিকাধীন ট্রাক-কাভার্ডভ্যান ও পিকআপ রয়েছে। এসব এজেন্সির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- মেসার্স নজরুল ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি, মে আই কে এন্টারপ্রাইজ, তিতাস ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি।

তেজগাঁও রেলগেট থেকে সাতরাস্তা পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশেই সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে ট্রাক-পিকআপ ও কাভার্ডভ্যান। শ্রমিকেরা মূল সড়কে রেখে কয়েকটি ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মেরামতের কাজও করছেন। কোথাও কোথাও একটি ট্রাক কিংবা কাভার্ডভ্যানের পাশাপাশি আরেকটি গাড়ি রাখায় রাস্তা অনেকটা সরু হয়ে গেছে। এতে ওই সড়ক দিয়ে চলাচলকারী যানবাহনের গতিও কমে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ট্রাক-কাভার্ডভ্যান গাড়িগুলো একে একে ধরিগতিতে ঘোরানোর সময়ে লেগে যাচ্ছে তীব্র যানজট। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েন ওই সড়কে নিয়মিত চলাচলকারী যাত্রী-পথচারীসহ স্থানীয়রা।

বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিক ফেডারেশনের হিসাবে, এই ট্রাকস্ট্যান্ড থেকে প্রতিদিন পাঁচ হাজারের বেশি পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল করে। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজারের মতো গাড়ি স্ট্যান্ডের ভেতরে রাখার ব্যবস্থা আছে। বাকিগুলো এই সড়কসহ তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার অন্য সড়কগুলোয় রাখা হয়। প্রায় ১শ ফুট প্রশস্ত রেলগেট-সাতরাস্তা সড়ক ধরে ফার্মগেট ও কারওয়ান বাজার এলাকা থেকে তেজগাঁও মহাখালী ও বনানীর দিকে যাওয়া যায়। গুলশান-নিকেতনে যাওয়ার সহজ রাস্তাও এটি। এই রাস্তা ব্যবহার করে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার ৩টি বিশ্ববিদ্যালয়, একটি মেডিকেল কলেজ, জাতীয় নাক-কান-গলা ইনস্টিটিউট ও কয়েকটি গণমাধ্যমের প্রধান কার্যালয়সহ বহু সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যাওয়া-আসা করেন।

এছাড়া সড়কটি ফার্মগেট ও তেজগাঁও এলাকার অন্তত ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের প্রধান পথ। প্রায় ৭ বছর আগেও এই সড়কটি যাত্রীদের কাছে ছিল বিভীষিকার মতো। অবৈধ পার্কিং ও যানজটের কারণে প্রায় এক কিলোমিটার সড়কটি পার হতে কখনো কখনো কয়েক ঘণ্টা পেরিয়ে দিনও পার হয়ে যেত। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে ডিএনসিসির প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের উদ্যোগে দু’দিনের চেষ্টায় সড়কটি ট্রাক-কাভার্ডভ্যানের দখল থেকে মুক্ত করা হয়। তখন শ্রমিকদের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। উচ্ছেদে সফল হওয়ার পর ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ সড়কটি যান চলাচলের উপযোগী করে তোলে। সড়ক বিভাজক দিয়ে লাগানো হয় গাছ। ফুটপাত সংস্কার করে হাঁটার উপযোগী করা হয়।

কিন্তু এখন ট্রাক রাখার কারণে ফুটপাত ঢাকা পড়ে গেছে। এর বেশির ভাগ জায়গা দিয়ে চলাচলের উপায় নেই। বেগুনবাড়ির বাসিন্দা মোশাররফ হোসেন ঢাকা প্রতিদিনকে বলেন, প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের মৃত্যুও পর থেকেই এই রাস্তায় আবার ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মিনি ট্রাক রাখতে দেখছি। কিন্তু এবার মনে হচ্ছে এগুলো থেকেই যাবে। এরকম মনে হওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মেয়র আনিসুল হক বেঁচে থাকাকালে এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ ছিল। এখন মনে হচ্ছে, সেই নিয়ন্ত্রণটুকু ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) কর্তৃপক্ষের নেই। ডিএনসিসিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিস্ক্রিয়তার কারনে ফের এ সড়কটি ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক-শ্রমিকদের দখলে চলে যাচ্ছে। এতে যাত্রী-পথচারীসহ সাধারণ মানুষের চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে। একই কথা জানালেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রাজীব হাসান।

তিনি বলেন, প্রতিদিন তিনি এই পথ ধরে ফার্মগেট থেকে কর্মস্থলে যাতায়াত করেন। কিন্তু ট্রাক-কাভার্ডভ্যানের যত্রতত্র পাকিংয়ের কারনে প্রতিদিনই তাকেসহ অন্যান্যদের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। তিনি বলেন, জনদুর্ভোগ এড়াতে ডিএনসিসিসহ পুলিশ প্রশাসনকে এখন থেকেই এ ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে এই সড়কটি আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। রিকশাচালক মাহি উদ্দীন ও মনিরুল ইসলাম বলেন, তারা বড় গাড়ি চালায়। কিছু বলাও যায় না। বললে ধমক দেয়, এমনকি মারধরও করে। পথচারী আশিকুর রহমান বলেন, গলির ভেতরে তারা ট্রাক রাখছে। ঠিকমতো হাঁটাই যায় না। তার উপর রাস্তায় ধুলাবালি বাড়ছে। অসুখ-বিসুখও বাড়ছে। এর একটা প্রতিকার হওয়া উচিত। জনস্বার্থে এ ট্রাকস্ট্যান্ড দখলমুক্ত করতে ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ প্রশাসনের দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিৎ, তা না হলে এই সড়ক দিয়ে যানবাহন চলাচল ও জনদুর্ভোগ আরো বেড়ে যাবে বলে জানান ভুক্তভোগীরা।

বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক ফেডারেশনের এক নেতা বলেন, সড়কটি আমরা আর কখনোই দখল হতে দেব না। তাহলে সড়কের ওপর আবার ট্রাক কেন রাখা হলো? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আসলে এই অবস্থা করোনাকালে সাধারণ ছুটি শুরু হওয়ার কারনে হয়েছিল। তবে তা স্থায়ী নয়। আমরা সবাইকে বলেছি সড়কের ওপর যেন কোনো ট্রাক না রাখা হয়। কেউ শুনছে। কেউ শুনছে না। এজন্য আমরা কয়েকবার জরুরি বৈঠকও করেছি। তিনি বলেন, দুই বছর আগেও সারা দেশে মালবাহী যানবাহনের সংখ্যা ছিল দেড় লাখের মতো। এখন তা ৩-৪ লাখের ওপরে পৌঁছেছে। এ অবস্থায় সবকিছু ঠিকঠাক রাখাটা অনেক সময় কঠিন হয়ে যায়। এরপরও এই সড়কটি যানবাহন ও সাধারণ মানুষের চলাচল স্বাভাবিক রাখতে আমরা চেষ্টা করছি, যাতে কেউ দুর্ভোগে না পড়ে।

এদিকে ডিএনসিসির সাবেক প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, ডিএনসিসির যেহেতু নিয়মিত ফোর্স নেই তাই সব সময় এটি নজরদারিতে রাখা সম্ভব হয়ে ওঠে না। অন্যদিকে ট্রাক মালিক ফেডারেশনের নেতারা কথা দিলেও সব সময় তারা সেটা রাখতে পারছেন না। এছাড়া সড়কটি দখলমুক্ত রাখতে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের একটা বড় ভূমিকা রয়েছে। তারা সেই ভূমিকা কতটুকু পালন করতে পারছেন সেটাও একটা প্রশ্ন।

এ বিষয়ে ডিএনসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা (যুগ্ম সচিব) মো. মোজাম্মেল হক ঢাকা প্রতিদিনকে বলেন, আপাতত এই ট্রাক স্ট্যান্ডটি সরানো বা উচ্ছেদের কোন পরিকল্পনা আমাদের নেই। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, নির্ধারিত ট্রাক স্ট্যান্ডের জন্য জমি খোঁজা হচ্ছে। সেই জমি না পাওয়া এবং নতুন ট্রাক স্ট্যান্ড না বানানো পর্যন্ত এই স্ট্যান্ডটি এখানেই থাকবে। এটা রাজনৈতিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ছাড়াও গ্যাস-বিদ্যুৎ, ওয়াসা-বিটিআরসিসহ সেবা সংস্থার সংশ্লিষ্টতার বিষয় জড়িত রয়েছে। তাই এ নিয়ে ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ এখন কিছু ভাবছে না। শুধু এই এলাকা নয়, জনদুর্ভোগ এড়াতে ডিএনসিসির সবগুলো সড়ক দখলমুক্ত রাখতে ডিএনসিসির সংশ্লিষ্টরা মনিটরিংয়ের মাধ্যমে কাজ করছে বলেও জানান প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা (যুগ্ম সচিব) মো. মোজাম্মেল হক।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *