ওদের এত স্পর্ধা কেন?

মতামত

‘স্বপ্নেও ভাবতে পারিনাই জমিসহ ইটের একখান নতুন ঘর হইবো আমাগো’ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর পেয়ে এমনই আবেগঘন কথা বলছিলেন সুকজান বেগম। ঈশ্বরদীর দড়িনারিচা পশ্চিম টেংরী এলকার ভূমিহীন সুকজানের চোখে আনন্দের অশ্রু। দীর্ঘদিন ধরে ছেলে-নাতিসহ অন্যের জমিতে কুঁড়েঘর তুলে থাকেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে জমিসহ পাকা বাড়ি পেয়ে নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। তাই খুশিতে কেঁদেছেন তিনি।

‘জমি নেই, ঘর নেই’ এমন অসহায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৩৬০টি পরিবারকে গত ২০ জানুয়ারি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দুইশতক জমিসহ পাকা বাড়ি হস্তান্তর করেন। এলাকা ভিত্তিক নির্মান ব্যায় ১ লাখ ৬০ থেকে ৯০ হাজার পর্যন্ত ধরা হয়েছে। ‘মুজিববর্ষে কেউ থাকবে না গৃহহীন’ এমন ঘোষণা বাস্তবায়নে রূপ দিতে ‘স্বপ্নের নীড়’ নির্মান ও হস্তান্তর চলছে।

সেমিপাকা এই ঘরগুলো প্রতিটির আয়তন ৪০০ বর্গফুট। প্রতিটি ঘরে আছে দুটি কামরা, রান্নাঘর, বারান্দা ও টয়লেট। ১০ টি ঘরের জন্য একটি করে গভীর নলকূপ বসানো হয়েছে। চলতি মাসে ভারী বৃষ্টি হওয়ার পর থেকে একের পর এক দরিদ্র অসহায় মানুষগুলোর স্বপ্নের ঠিকানাগুলো ভেঙ্গে পড়তে শুরু করেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, তড়িঘড়ি করে খালের কিনারায় ঘরগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। তাছাড়া খরচ বাঁচাতে খালের মাটি কেটেই বাড়ির চারপাশে দেওয়া হয়েছে। যার প্রেক্ষিতে অল্প বৃষ্টিতেই আলগা মাটি খালে চলে যাওয়ায় ঘরগুলো ভেঙ্গে পড়ছে।

৬ মাস আগে ঘর পাওয়া লুতফা বেগম নামে এক বাসিন্দা জানান, ‘প্রধানমন্ত্রীর উপহার পাইয়া খুব খুশি হয়েছি। তার জন্য অনেক দোয়া করছি। কিন্তু কয়েকদিনের বৃষ্টিতে চাল দিয়ে পানি পড়তে আরম্ভ করছে। কাঠ নষ্ট হইয়া গেছে। ঘরের মেঝে ও পিলার ফাইটা গেছে। এখন এই ঘরে থাকতেই ভয় হইতাছে।’

এমন অসংখ্য অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়ে আছে। গণমাধ্যমে প্রচার হওয়ার পর বিষয়টি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিগোচর হয়। এতে প্রধানমন্ত্রী ভীষণ ক্ষুব্ধ হন। এ বিষয়টিতে বোদ্ধা রাজনৈকিত ব্যক্তিত্ববর্গও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তবে এ বিষয়ে মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা ও অসাধু ঠিকাদারই দায়ী বলে মনে করছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কর্মরত কর্মকর্তাগণ।

চলতি মাসে স্থান নির্বাচন এবং নির্মাণে গাফিলতির কারণে বিভিন্ন স্থানে বেশকিছু ঘর ভেঙ্গে পড়েছে। এছাড়া অনেক ঘরেই ইতোমধ্যে ফাটল দেখা দিয়েছে। ৬ মাসেই ঘরের চালের টিন ফুটা হয়ে পানি পড়তে শুরু করেছে। দরজার, জানালার কাঠ নষ্ট হয়ে গেছে। এ সকল ঘটনায় সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বার বার গণমাধ্যমে বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস। এ ছাড়া প্রকল্প পরিচালক বলেছেন, যে কয়েকটি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলো মেরামত করে দেওয়া হবে।

সারা দেশে মোট ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবার রয়েছে ৮ লাখ ৮৫ হাজার ৬২২টি পরিবার। প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ন প্রকল্প থেকে একে একে সকল ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে জমিসহ ঘর উপহার দেওয়া হবে বলে প্রজেক্ট পাস হয়েছে।

এক সঙ্গে এত মানুষকে ভূমি ও ঘর উপহার দেওয়ার নজির বিশ্বে বিরল। যা সম্ভব করতে পেরেছেন বঙ্গতনয়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অথচ গুটি কয়েক মানুষের নোংরা চিন্তাধারা এবং টাকা আত্মসাতের লোভের কাছে সব বিলিন হয়ে পড়েছে। মাত্র কয়েকদিন আগে যে ঘর পেয়ে অসহায় মানুষদের চোখে মুখে আনন্দের বন্যা বয়ে গেছে। সেই মানুষগুলো এখন চোখে ভীতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ‘স্বপ্নের নীড়ে’ দুঃস্বপ্নের রাত কাটায়।

এয়াড়া সরকারি হাসপাতালে কর্মরত ডাক্তার সাবরিনার কথা সকলেরই মনে আছে। তিনি প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে প্রকাশ্যে দুর্নীতি করে জনগণের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছেন। শুধু ডা. সাবরিনাই নয় এখনো এমন অনেক সরকারি ডাক্তার আছেন যারা সরকারি সিলমোহর নিয়ে অনেক অবৈধ কাজ করে যাচ্ছেন।

সরকারের সবচেয়ে আস্থাভাজন ‘সোনালী ব্যাংকে’র কথা নিশ্চয়ই মনে আছে। ২০১৯ সালে সোনালী ব্যাংকের ১২৬ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় ব্যাংকের ৪ কর্মকর্তা অভিযুক্ত হন। শুধু তাই নয় প্রতিনিয়ত এমন আত্মসাতের ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। যেগুলো গণমাধ্যমে উঠে আসে শুধু সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বাকি সবগুলো রয়ে যাচেছ ধরাছোঁয়ার বাইরে।

একই সালে জনতা ব্যাংকের ১ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তাসহ মোট ২২ জনের নামে মামলা হয়। লোন পাইয়ে দেওয়ার পর টাকার ভাগ পাওয়ার শর্তে ক্রিসেন্ট গ্রুপের নামে অবৈধভাবে লোন পাস করানো হয়।

এমন সরকারি টাকা আত্মাসাতের ঘটনা অহরহ রয়েছে। বিগত দিনের ঘটনাগুলোর সুষ্ঠ তদন্ত এবং প্রক্রিয়া বন্ধ করতে না পারার ফল আজকের আশ্রয়ন প্রকল্পের দুর্নীতি। মানুষ যখন লোভ পড়ে যায় তখন হিতাহিত জ্ঞান ভুলে যায়। কথায় আছে লোভ মানুষকে পাপের দিকে তাড়িত করে। এত বছরের সরকারী দুর্নীতি লোভ সরকারি কর্মচারিদের পাপের পথে নিয়ে গিয়েছিল। এ জন্যই তারা হিতাহিত জ্ঞান ভুলে পূর্বের অভ্যাসবশত লোভের শিকার হয়েছিল।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাস্তবায় করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ‘আশ্রয়ণ প্রকল্প’-এর উদ্যোগ নিয়েছেন। এটা শুধু একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বাস্তবায়ন প্রকল্প নয়। এর সঙ্গে মিশে আছে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন। তিনি চেয়েছিলেন এ দেশের মানুষ আশ্রয়হীন থাকবে না। নিরন্ন থাকবে না। তারই ধারাবহিকতায় বাংলাদেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত করতে প্রধানমন্ত্রী আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এ যে এক বাবার স্বপ্ন পূরণে মরিয়া এক কন্যার প্রচেষ্টা। অথচ সেই প্রকল্প নিয়ে ছিনিমিনি খেলা, কার এত স্পর্ধা হলো! যে ব্যক্তির ন্যূনতম দেশপ্রেম থাকবে, মানবিকতা থাকবে সেই ব্যক্তিরা এই প্রকল্প নিয়ে এমন দুর্নীতির চিন্তাও করতে পারে না।

দেশের অসহায় ভূমিহীন মানুষগুলোর দুঃখ-কষ্ট নিজের মধ্যে ধারণ করেছিলেন। তাই তো তাদের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর এই চাওয়ার মধ্যে ছিল পবিত্র ভালোবাসা। অথচ তার পরিণাম কি হলো! দেশের মানুষের কাছে নয় ওই সাধারণ অসহায় মানুষগুলোর কাছে প্রধানমন্ত্রীকে হেয় করা হয়েছে।

এই ঘৃণ্য কাজের জন্য একচেটিয়া মাঠ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের দোষারোপ না করে সুষ্ঠু তদন্ত প্রয়োজন। কারণ প্রত্যেক দুর্নীতির পেছনে লম্বা সুতা থাকে। সেই সুতার পেছনে একজন শক্তিশালী মানুষের হাত থাকে। সাধারণ মানুষ সবসময় স্টেজে নড়াচড়া প্রাণহীন পুতুলের নাচই দেখতে পারে। কিন্তু পর্দার আড়ালে সুতা ধরে যে ব্যক্তি পুতুলটি নাচায় তার চেহারা কখনোই স্টেজে দেখা যায় না। এবার সময় এসেছে, সুতার অপর প্রান্তে বাঁধা শক্তিশালী হাতটি দেখার অপেক্ষায়।

লেখক : ইরানী বিশ্বাস , সাংবাদিক, নাট্যকার ও নাট্যপরিচালক।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *