ওয়ারীতে যুবকের পাঁচ টুকরা লাশ উদ্ধার

জাতীয় রাজধানী

নিজস্ব প্রতিবেদক : পরকিয়ার টানে স্বামীর ঘর ছেড়ে পালিয়েছিল শাহনাজ পারভিন। কিন্তু হঠাৎ করেই প্রতারণার আশ্রয় নেয় পরকিয়ার নায়ক সজিব হাসান। অবৈধ মেলামেশার সময় মোবাইলে ভিডিও ধারণ করে সে। পারভিনকে সেই ভিডিও দিয়ে জিম্মি করা হয়। তার কাছে বায়না ধরে এবার তাকে (শাহনাজ) নয়, মেয়েকে এনে দিতে হবে। একইসঙ্গে স্বামীর কাছ থেকে টাকা এনে দিতে হবে। না হলে লোকজনের মধ্যে ভিডিও ছেড়ে দেয়ার হুমকি দেয়া হয়। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে চলে ঝগড়া ও মারামারি। একপর্যায় সজিব ঘুমিয়ে পড়েন। এ সময় শাহনাজ রান্নাঘর থেকে বটি এনে ঘুমন্ত সজীবকে কোপাতে থাকেন। বিছানার ওপর সজীব নিহত হন। পরে সজিবের শরীর থেকে দুই হাত ও দুই পা বিচ্ছিন্ন করেন। এরপর পারভিন নিজেই তার স্বামীর কাছে ফোন দেন।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর সায়েদাবাদ সংলগ্ন ওয়ারির টিকাটুলির ১৭/১ কে এম দাস লেনের ভবনের চারতলার বাসায় ঘটে এই হত্যাকান্ডের ঘটনা। এ ঘটনায় পুলিশ শাহনাজকে গ্রেফতার করেছে। ঘটনাটি সম্পর্কে তথ্য জানতে পুলিশ শাহনাজের স্বামী জসিমকেও আটক করেছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ৫ টুকরা লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছে। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত রক্তমাখা বটিসহ অন্যান্য সরঞ্জাম। গতকাল দুপুরের এ খবর ছড়িয়ে পড়লে ওই বাড়িতে উৎসুক মানুষ ভিড় করে।

স্থানীয়রা জানায়, সজিব হাসান কে এম দাস লেনের ওই বাসায় বেশিরভাগ সময়ই একা থাকতো। তার পরিবার (স্ত্রী-সন্তান) ঝিনাইদহ জেলার হরিনাকুন্ড উপজেলায় গ্রামের বাড়িতে থাকতো। এই সুযোগে সজিব একা বাসায় নারীদের নিয়ে আসতো।

এ ব্যাপারে ওয়ারি থানার এসআই সোহাগ ও এসআই সাইফুল ইসলাম জানান, শাহনাজ পারভিনের স্বামী জসিম ৩ দিন আগে স্ত্রীকে খুঁজে পাচ্ছেন না বলে থানায় একটি ডায়েরি করেন। গত মঙ্গলবার দুপুরে তিনি থানায় গিয়ে জানান, তার স্ত্রী শাহনাজ ফোনে জানিয়েছে, সে বিপদে আছে। সায়েদাবাদের কাছে একটি বাড়িতে সজিব তাকে আটকে রেখেছে। একথা শুনে পুলিশ তাকে নিয়ে কে এম দাস লেনের ওই বাড়িতে যায়। চারতলার বাসার দরজা নক করার সঙ্গে সঙ্গে শাহনাজ পারভিন নিজেই দরজা খুলে দেন। শাহনাজ পুলিশকে জানায়, সজিবকে তিনি খুন করেছেন। পুলিশ বাসার ভেতরে ঢুকে সজিবের খন্ডিত ৫ টুকরা লাশ দেখতে পায়।

এসআই সোহাগ জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শাহনাজ পুলিশকে জানিয়েছে- তিনি একাই সজিবকে বটি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছেন। তবে তার সঙ্গে আরো কেউ ছিল কিনা তা গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

শাহনাজের কাছ থেকে নেওয়া তথ্যে উদ্ধৃতি দিয়ে ওয়ারী থানার ওসি জানান, ৪৯/২ আর কে মিশন রোডে তাদের বাসা। প্রায় দুই বছর ধরে স্বামীবাগের কাছাকাছি কে এম দাস লেনের ১৭/১ এর ওই বাসায় গিয়ে সজীবের সঙ্গে কারচুপি (ড্রেসে পুঁথি বসানো) বসানোর কাজ করতেন তিনি। তার ছেলে-মেয়েরা বড় হয়েছে। বড় মেয়ে কলেজে পড়ে আর দুই ছেলে চাকরি করেন। স্বামীও ব্যবসা করেন। একপর্যায়ে সজীবের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। কিছুদিন হলো সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সজীবের বাসায় সময় কাটাতেন তিনি। রাতের বেলা বাসায় ফিরলে পরিবারের লোকজন জিজ্ঞেস করলে তাদের বলতেন, তিনি পুঁথি বসানোর কাজ শিখছেন। কাজের প্রয়োজনে তিনি বাইরে ছিলেন। ড্রেসে পুঁথি বসানো এবং বাসায় এসে কিছু ড্রেস দিয়ে যাওয়ার সুবাদে সজীব ওই নারীর বাসায় আসা-যাওয়া করতেন। এ সুযোগে সজীবের সঙ্গে ওই নারীর মেয়ের প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। বিষয়টি নিয়ে এর আগে সজীবকে বেশ কয়েকবার সতর্কও করেছিলেন ওই নারী। এরপরও সজীব থেমে থাকেনি। বরং তার মেয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের আশায় বারবার বাসায় যাওয়া-আসা করতেন। সম্প্রতি সজিব শাহনাজকে স্বামী-সন্তান ছেড়ে তার সঙ্গে ঘর করতে প্ররোচণা দিতে থাকেন। এ অবস্থায় গত ৮ ফেব্রুয়ারি কাপড়-চোপড় ব্যাগে ভরে নিয়ে ওই নারী কাউকে না জানিয়ে সজীবের বাসায় ওঠেন। এরমধ্যে ওই নারীর স্বামী স্ত্রীকে পাওয়া যাচ্ছে না জানিয়ে থানায় জিডি করেন। শাহনাজ পুলিশকে জানায়, তাদের মধ্যে অনৈতিক সম্পর্ক সজীব তার মোবাইলে গোপনে ভিডিও করেছিল। ওই ভিডিওকে জিম্মি করে সে তার (শাহনাজ) মেয়েকে বাসায় নিয়ে আসতে বলে। আবার মুক্তির জন্য স্বামীর কাছ থেকে টাকা এনে দিতে বায়না ধরে। শাহনাজ পুলিশকে জানায়, গত বুধবার রাতে এ নিয়ে তাদের মধ্যে ঝগড়া ও মারামারি হয়। পরে তারা ঘুমিয়ে পড়ে। এরই এক সময় শাহনাজ রান্না ঘর থেকে বটি এনে ঘুমে থাকা সজিবকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে ওই নারী তার স্বামীকে ফোন করে বলেন, আমি কে এম দাস রোডের এই বাসায় আছি। এখানে মহাবিপদে আছি। তুমি এসে আমাকে নিয়ে যাও। ওই নারীর স্বামী থানায় আগেই জিডি করেছিলেন তাই তিনি থানা পুলিশকে জানান যে, তার স্ত্রী কল করে সহায়তা চেয়েছে। তখন পুলিশ তার স্বামীকে নিয়ে ওই বাসায় গিয়ে দেখেন, পাঁচ টুকরো মরদেহের সামনে ওই নারী বসে আছেন।

পুলিশের ওয়ারী বিভাগের উপ-কমিশনার কামরুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘তদন্তের আগে এ বিষয়ে বেশি কিছু বলা যাচ্ছে না। ওই নারী যে সত্য বলছে, তদন্তের আগে তা বলা যাবে না। তদন্তে ভিন্ন কিছুও বের হতে পারে। এ জন্য সব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে ঘটনাটির তদন্ত চলছে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *