করোনাকালে জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা!

সুস্থ্ থাকুন

এসএম দেলোয়ার হোসেন:
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ কমলেও এর প্রভাবে নানা ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বাংলাদেশের কোমলমতি শিশুরা। জটিল এ রোগ মাল্টিসিস্টেম ইনফ্লেমেটরি সিনড্রোমে (এমআইএসসি) আক্রান্ত শিশুদের শনাক্তের হার এ দেশে ক্রমেই বাড়ছে। চলতি বছরের এপ্রিলে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে এ রোগ শনাক্তের পর মে মাসেই বাংলাদেশে প্রথম শনাক্ত হয় রোগটি। জটিল এই রোগ সংক্রমণের মূল কারণ করোনাভাইরাস। শিশু-কিশোররা এ রোগে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। উচ্চমাত্রার জ্বর এই রোগের প্রধান লক্ষণ। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরীক্ষায় কোনো জীবাণুর অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে না। নতুন এ রোগে কিডনি, হার্ট, লিভারসহ একাধিক অঙ্গ একসঙ্গে আক্রান্ত হওয়ায় শিশুদের মৃত্যুঝুঁকিঁ বাড়িয়ে তুলছে। চিকিৎসকরা বলছেন, নতুন জটিল এ রোগে আক্রান্তদের মৃত্যুহার কমাতে দ্রুত শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে এখন থেকে আইইডিসিআর এর কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। জটিল এ রোগ শনাক্তের পর ৭২ ঘণ্টার মধ্যে জরুরি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করতে পারলে সহজেই রোগীদের সুস্থ জীবনে ফেরানো সম্ভব। তবে এ রোগ দ্রুত শনাক্তে অভিভাবক ও চিকিৎসকদের মধ্যে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টির আহ্বান বিশেষজ্ঞদের। রাজধানীর কয়েকটি হাসপাতাল ঘুরে সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, বৈশ্বিক মহামারি করোনার প্রাদুর্ভারের মধ্যেই চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল যুক্তরাজ্যে প্রথম মাল্টিসিস্টেম ইনফ্লেমেটরি সিনড্রোম (এমআইএসসি) রোগটি ধরা পড়ে। এর সংক্রমণ যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারতে সংক্রমিত হয়। এরপর গত ১৫ মে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে সাড়ে তিন মাস বয়সী এক নবজাতকের শরীরে জটিল এ রোগটি শনাক্ত হয়েছে। মূলত করোনাভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে কোনো শিশু এলে সংক্রমণ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত এভারকেয়ার হাসপাতালে ১৫টি শিশু চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, করোনাকালের মধ্যেই এমআইএসসি রোগে আক্রান্ত শিশু-কিশোরের শরীরে রক্তপ্রবাহ কমে যাচ্ছে। এতে হার্ট, কিডনি, ফুসফুস ও যকৃতের মতো অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে তাকে মৃত্যুর মুখেও ঠেলে দিতে পারে। করোনাকালের মধ্যেই সম্প্রতি ঢাকা শিশু হাসপাতালে জটিল রোগ মাল্টিসিস্টেম ইনফ্লেমেটরি সিনড্রোম (এমআইএসসি) এর লক্ষণ নিয়ে ৩টি শিশু ভর্তি হয়। একজন সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরলেও দুই শিশুর চিকিৎসা চলছে। যথাসময়ে চিকিৎসা শুরু করে শিশুকে আশঙ্কামুক্ত করতে পারায় আনন্দিত অভিভাবকরা।
নতুন এ রোগে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হওয়া এক শিশুর অভিভাববক ঢাকা প্রতিদিনকে জানান, তার কোমলমতি শিশুটির শরীরে হঠাৎ করেই জ্বর ওঠে। পর্যায়ক্রমে জ্বরের মাত্রাও বাড়তে শুরু করে। সর্বশেষ ১০৫ ডিগ্রি জ্বর ছিল। কোনো কিছু দিলে খেতে চায় না। এছাড়া কিছু খাওয়ালেই বমি করে সব ফেলে দিত। তিনি জানান, শিশুটির এমন অবস্থা দেখে পরিবারের মাঝে উদ্বেগ বেড়ে যায়। অজানা আতঙ্ক মনের মধ্যে বাসা বাধে। এরপর হাসপাতালে নিয়ে যান। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে এমআইএসসি নামে নতুন জটিল রোগে তার শিশুটি আক্রান্ত হয়েছে বলে জানান। তবে চিকিৎসকের পরামর্শে যথাযথ চিকিৎসা প্রদানের কারণে তার শিশুটি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে। এ জন্য তিনি আনন্দিত হলেও এখনও শঙ্কিত। তবে এমন জটিল রোগে কোন শিশু যাতে আক্রান্ত না হয়, সেজন্য তিনি অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন। সূত্র জানায়, বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও ২১ বছরের নিচের শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে নতুন রোগ এমআইএসসিতে। কোভিডের সাধারণ লক্ষণ শ্বাসকষ্ট বা কাশি ছাড়াও অনেক শিশু জটিলতায় পড়ছে।
চিকিৎসকরা জানান, টানা ৫দিন মাত্রাতিরিক্ত জ্বর, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, পেটে ব্যথাসহ শরীরে র‌্যাশ উঠলে শিশুকে বাড়িতে না রেখে হাসপাতাল তথা চিকিৎসকদের কাছে নিতে হবে। শুধু জ্বর নয়, নতুন এ রোগে শিশু-কিশোরদের শরীরের একাধিক অঙ্গ একসঙ্গে আক্রান্ত হলে দ্রুত আইসিইউ সুবিধা সম্বলিত বড় হাসপাতালে নিয়ে জরুরি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করাতে হবে।
ঢাকা শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সফি বলেন, জটিল রোগে আক্রান্তদের হার্টে সমস্যা বেশি হয়, হার্টের ইকোটা ভাল করে করতে হবে। নতুন জটিল এ রোগে ঢাকার কয়েকটি হাসপাতালে ৩০ এর বেশী শিশু শনাক্ত হলেও ১০৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট জ্বর নিয়ে ভর্তি হওয়া একটি শিশুকে সুস্থ করতে দ্বিতীয় ধাপের চিকিৎসা দিতে হয়েছে। তাই এসব রোগীরা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও অভিভাবকদের নিশ্চিন্ত হবার কোন সুযোগ নেই।
বেসরকারি এভারকেয়ার হাসপাতালের কনসালট্যান্ট (ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ইন্টারভেনশনাল পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি) ডা. তাহেরা নাজরীন সাংবাদিকদের জানান, এমআইএসসি রোগে আক্রান্ত শিশুদের প্রধান লক্ষণ তীব্র জ্বর, ডায়রিয়া, পেটব্যথা, বমি, শ্বাসকষ্ট ও বুকে ব্যথা, খাবারে অনীহা, চোখ-ঠোঁট ও জিহ্বা লাল হয়ে যাওয়া। জ্বরের পর এসব লক্ষণ একই সঙ্গে বা একটি-একটি করে দেখা দিতে পারে। তিনি জানান, এতে শিশুদের হার্টঅ্যাটাক হতে পারে। এমনকি নিম্নরক্তচাপ সৃষ্টি হতে পারে। সঠিক সময়ে হাসপাতালে নেওয়া না হলে রোগীর শরীরে মারাত্মক সংক্রমণ দেখা দিতে পারে। এমনকি নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র বা আইসিইউতে নিতে হতে পারে। এতে বাড়তে পারে মৃত্যুঝুঁকিও।
শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ (কিডনি) অধ্যাপক ডা. শিরীন বলেন, জটিল এ রোগে আক্রান্ত শিশু-কিশোরদের অবহেলা না করে দ্রুত হাসপাতাল বা অভিজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদান করতে হবে। তত তাড়াতাড়ি শিশুকে চিকিৎসা দিলে দ্রুত ওই শিশুটিকে সুস্থ করা সম্ভব।
শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সাঈদা আনোয়ার জানান, ফলোআপ এই রোগের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় শিরাগুলো সংকুচিত হয়ে রক্ত চলাচল কমে যায়। এতে মৃত্যুও হতে পারে। তিনি জানান, মূলত করোনাভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে কোনো শিশু এলে সংক্রমণ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। জটিল এ রোগের লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা দিলে এমনকি শনাক্ত হলে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে জরুরি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করতে পারলে সহজেই রোগীদের সুস্থ জীবনে ফেরানো সম্ভব। তবে এসব রোগের প্রাদুর্ভাব থেকে শিশু-কিশোরদের রক্ষা করতে হলে অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে। কোন রোগকেই অবহেলা করা যাবে না।
এদিকে আইইডিসিআর পরিচালক ডা. তাহমিনা শারমিন জানান, দেশব্যাপী করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে জটিল রোগ মাল্টিসিস্টেম ইনফ্লেমেটরি সিনড্রোম (এমআইএসসি) এর লক্ষণ সংক্রান্তে এই রোগ শনাক্ত বা নিয়ন্ত্রণে এই মুহুর্তে কিছু করছে না আইইডিসিআর। তবে জটিল এ রোগটি শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের জন্য রিসার্চ করে বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে আইইডিসিআর।

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *