করোনাভাইরাসের রূপান্তর আতঙ্কে সিলেটবাসী

সারাবাংলা

সাদিক চৌধুরী, সিলেট ব্যুরো :
প্রবাসী আধ্যুসিত অঞ্চল সিলেট। এর মধ্যে প্রায় প্রতিদিনই সিলেটে ফিরেছেন বিভিন্ন দেশের প্রবাসী সিলেটিরা। আর বিশ্বে ও বিভিন্ন দেশে দ্রুত গতিতে সংক্রমণ ঘটানো করোনাভাইরাসের রূপান্তর বা নতুন স্ট্রেইন বাংলাদেশেও ধরা পড়েছে। আর একারনেই চরম আতঙ্কে রয়েছন সিলেট অঞ্চলের মানুষ। সচেতন মহল বলছেন, অধিকাংশ যুক্তরাজ্য প্রবাসী শীতে সিলেটে আসেন। নতুন ধরণের করোনাভাইরাস খুব দ্রুত ছড়ায় বলে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন। অতীতের মতো ভুল না করে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সিলেট এম এ জি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সকল ফ্লাইট বন্ধ করার ঘোষণার সময় এসেছে বলে মন্তব্য সচেতন মহলের। জানা যায়, বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া মূল করোনা ভাইরাসের নতুন ধরন সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে ধরা পড়ে। এরপর দ্রুতই সেটি অনেক এলাকায় নতুন সংক্রমণের প্রধান কারণ হয়ে ওঠে। গবেষকরা বলছেন, এটি মূল ভাইরাসের চেয়ে ৭০ শতাংশ বেশি দ্রুত সংক্রমণ ঘটায়। এর ফলে দেশটিতে আবার লকডাউন চলছে। ভাইরাসের সংক্রমণ অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় ভারতসহ ৪০টিরও বেশি দেশ যুক্তরাজ্য থেকে ফ্লাইট স্থগিত করেছে। এ ছাড়াও, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, জাপান ও ফ্রান্সেও রোগীদের শরীরে নতুন এই স্ট্রেইন শনাক্ত হয়েছে।
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ও মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. ময়নুল হক বলেন, ব্রিটেনে শনাক্ত হওয়া করোনাভাইরাসের নতুন ধরনের সঙ্গে মিল আছে এমন জিনোমের উপস্থিতি পাওয়া গেছে বাংলাদেশেও। এ তথ্য নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ বিজ্ঞান এবং শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) জিনোমিক গবেষণাগার ল্যাব।
তিনি বলেন, বিসিএসআইআর যে তথ্য দিয়েছে সেটা বেসরকারি পর্যায়ে প্রাথমিক একটি তথ্য। এটা পুরোপুরি নিশ্চিত হতে হলেও আরও গবেষণা এবং সময় প্রযোজন। তবে যুক্তরাজ্যে ধরা পড়া নতুন ধরণের করোনাভাইরাস মূল ভাইরাসের চেয়ে ৭০ শতাংশ বেশি দ্রুত ছাড়ায় বলে সেখানকার গবেষকরা জানিয়েছেন। এই তথ্যের বাইরে নতুন ভাইরাস সম্পর্কে অন্য কোনো তথ্য সরবরাহ করা হয়নি। এদিকে যুক্তরাজ্যে শনাক্ত করোনাভাইরাসের নতুন স্ট্রেইন ছড়িয়ে পড়া রোধে বিভিন্ন দেশ নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কিন্তু, বাংলাদেশে এখনও এ ব্যাপারে বিশেষ কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। সিলেট এম এ জি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সূত্র জানায়, সিলেট যুক্তরাজ্য বিমান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। নতুন করে কোনো নির্দেশনা তাদের কাছে আসেনি।
সুজন সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, করোনার জন্য গত কয়েক মাস যুক্তরাজ্য প্রবাসীরা দেশে আসতে পারেননি। শীত আসার পর সিলেটে যুক্তরাজ্য প্রবাসীরা আসছেন। কিন্তু, অতীতের মতো কোয়ারেন্টিন ব্যবস্থায় অবহেলা এবং বিমান চলাচলে নিয়ন্ত্রণ অরোপ না করলে দ্রুত আমরা আবারও করোনা মহামারির কবলে পড়তে পারি। তিনি বলেন, নতুন করোনাভাইরাস আগেরটার থেকে দ্রুত সংক্রমণ করে বলে শুনেছি। দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে যুুক্তরাজ্যের সঙ্গে আমাদের সিলেটের যোগাযোগ বেশি। সেখানে আমাদের স্বজন যারা আছেন এবং দেশে যারা আছেন সবাইকে বিষয়টি বুঝতে হবে। সরকারকে দ্রুত এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে হবে।
চীন থেকে প্রথম উৎপত্তি হওয়ার পর বাংলাদেশে কভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির কথা প্রথম জানা যায় চলতি বছরের ৮ই মার্চ এবং প্রথম মৃত্যুটি ঘটে ১৮ মার্চ। সেসময় বিদেশ ফেরত ব্যক্তিদের মাধ্যমে বেশ কিছু মানুষ সংক্রমিত হচ্ছে এমন বলতে থাকে বাংলাদেশ রোগতত্ত¦, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট (আইইডিসিআর)। এরপর দেশে দ্রুত করোনাভাইরাস আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকে। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন বিমান প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, পরিস্থিতির অবনতি হলে লন্ডনের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ বন্ধ করবে বাংলাদেশ। দেশের বাইরে যেখান থেকেই আসুক পিসিআর টেস্ট করে তারপরেই আসতে হবে। আর যুক্তরাজ্য থেকে আসা যাত্রীদের জন্য রয়েছে আলাদা ব্যবস্থা।
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ও মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. ময়নুল হক বলেন, প্রাথমিকভাবে যেহেতু জানা গেছে যুক্তরাজ্যের আর বাংলাদেশের মিউটেশনের পজিশন এক, সেটাই শঙ্কার বিষয়। এজন্য এখন আমাদের জিনোম সিকোয়েন্সিয়ের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের ভাইরাসটির বৈশিষ্ট্য আরও মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। কয়েকদিনের মধ্যে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।
তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যের গবেষকরা বলছেন, নতুন ধরনের আক্রান্ত হলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগীদের শরীরে আগেরটির মতোই উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ জ্বর, শুষ্ক কাশি, খাবারের স্বাদ ও ঘ্রাণ চলে যাওয়া প্রভৃতি সমস্যায় ভুগছেন রোগীরা। তবে যুক্তরাজ্যে সিলেট অঞ্চলের মানুষের বসবাস বেশি। তারা শীতকালে দেশে বেড়াতে আসেন। আমাদের দেশে আগের করোনাভাইরাস বিদেশি যাত্রীদের মাধ্যমে সংক্রমণ ঘটেছিলো। তাই বর্তমান নতুন ধরণের ভাইরাস নিয়ে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। প্রযোজনে সিলেট এবং যুক্তরাজ্যের বিমানের ফ্লাইট বন্ধ করতে হবে। তবে আগের মতই আমাদের হাত ধোয়া, মাস্ক পরা , সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার কোন বিকল্প নেই।
আইইডিসিআর বলেছে, দেশে শনাক্ত হওয়া করোনাভাইরাসের নতুন এ স্ট্রেইন বা ধরন নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং বিমানবন্দরে সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে এখন।
যুক্তরাজ্যে এই ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় দেশটির সঙ্গে বিমান চলাচল যখন বন্ধ করেছে কয়েকটি দেশ, তখন যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশে একটি বিমান প্রায় দুশোর মত যাত্রী নিয়ে বাংলাদেশের সিলেটে অবতরণ করলে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন। তবে আইইডিসিআর বলছে তাদের কাছে স্বাস্থ্যের সনদপত্র ছিল। এছাড়া তাদেরকে কোয়ারেন্টিনে থাকারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
সিলেট এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের ম্যানেজার হাফিজ আহমদ বলেন, আগের নিয়মেই প্রবাসী যাত্রীরা আসা যাওয়া করছেন। সরকারিভাবে তাদের কাছে নতুন কোনো নির্দেশনা আসেনি। যুক্তরাজ্য-সিলেট বিমান চলাচল বর্তমানে স্বাভাবিক রয়েছে বলেও জানান এ বিমান কর্মকর্তা।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *