করোনার শীতল বার্তা

মতামত

আমাদের দেশে করোনার অফিসিয়াল অস্তিত্ব ধরা পড়ার পর থেকে পার হতে চলেছে প্রায় ১০ মাস। প্রথম দিকে এটা নিয়ে যতটা অতঙ্ক এবং ভোগান্তি ছিলো সেটা এখন অনেকটা কেটে গেছে।

ভোগান্তি বলতে আমি শুধু চিকিৎসাজনিত ভোগান্তির কথা বলছি না; বলছি সামগ্রিক ভোগান্তির কথা। আমরা জানি করোনা হলে সে পরিবারকে একঘরে করে দেয়ার কথা।

লাশ দাফন করতে না দেয়ার মতো ঘটনা। করোনা হওয়ায় মাকে জঙ্গলে ফেলে আসার ভয়াবহ কথাও আমরা জানতে পেরেছি। সামাজিক সেই ভোগান্তি এখন নেই। এখন করোনা হলে সেটাকে স্বাভাবিকভাবেই দেখা হচ্ছে। এটা খুবই ভালো দিক।

তবে, ভয়ের ব্যাপার এখন যেটা দাঁড়িয়েছে সেটা হচ্ছে- অধিকাংশ লোকই এখন আর স্বাস্থ্যবিধি মানতে চাইছেন না। তারা মাস্ক পরছেন না। সামাজিক দূরত্বও উবে গেছে। সাবান দিয়ে হাত ধোঁয়া বা হাত স্যানিটাইজ করাটাও যেন আমরা ভুলতে বসেছি।

প্রশ্ন হচ্ছে, এখন স্বাস্থ্যবিধি তাহলে আবার কড়াকড়িভাবে মানার কথা কেন আসছে? এটা আসছে এই কারণে যে, আমাদের দেশে মার্চ মাসের ৮ তারিখে যখন করোনা রোগী পাওয়ার অফিসিয়াল ঘোষণা এলো তখন কিন্তু শীত বিদায় নিয়েছে। তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করেছে।

 এই শীতের ৩ মাসে আমাদের দেশে করোনার নতুন করে বিস্তার হওয়ার কোনো সুযোগ সৃষ্টি হবে না। আর সেটা যদি আমরা করতে ব্যর্থ হই তাহলে হয়ত আমাদেরকে ভয়াবহ মাশুল গুণতে হতে পারে।

হারাতে হতে পারে অতি নিকটজন-কাছের মানুষটিকে।করোনার এ শীতল বার্তাটি যেন আমাদের বুঝতে ভুল না হয়-সেই বিনীত নিবেদন রাখছি সকলের কাছে 

করোনাকালের এতটা সময় আমরা এই গরমকালের ভেতর দিয়েই গিয়েছি।ফলে শীতকালে করোনার বিস্তার ও ভয়াবহতা কেমন হতে পারে তা কিন্তু আমাদের অজানাই রয়ে গেছে। তবে খেয়াল করলে দেখবেন , চীনের উহানে যখন করোনা ধরা পড়ে তখন কিন্তু সেখানে শীতের সময় ছিলো। ইউরোপেও এটার ভয়াবহতা ও বিস্তার –দুটোই কিন্তু শীতকালে বেশি ছিলো।

সেই অভিজ্ঞতা এবং ধারণা থেকে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন আমাদের এখানেও শীতের এ সময়ে করোনা আক্রান্তের হার বাড়তে পারে। আর আক্রান্তের হার বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই মৃত্যুও বাড়বে।

আর একটা জিনিস মনে করিয়ে দিই। সেটা হচ্ছে-যারা করোনার জটিল অবস্থা থেকে বেঁচে ফিরেছেন তাদের অনেকের করোনা পরবর্তী জীবনব্যবস্থা কিন্তু এখনও স্বাভাবিক হয় নি। অনেকেই এখনও ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারেন না।

অল্পতেই হাঁপিয়ে উঠছেন। ঠিকঠাকভাবে কাজকর্ম করতে পারছেন না। মাথা ঘোরা, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, হার্ট, কিডনি, লিভারের জটিলতা এসবেও অনেকে ভুগছেন।একে বলা হচ্ছে- “লং কোভিড সিনড্রোম” (দীর্ঘমেয়াদে কোভিড জটিলতা)।

যদিও ঠিক কত শতাংশ মানুষ আমাদের দেশে এই “লং কোভিড সিনড্রোম” এ ভুগছেন তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে এটার জটিলতা বোঝার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগ্যান রাজ্যের একটা গবেষণার সারসংক্ষেপ তুলে ধরছি আপনাদের জন্য।

কোভিড পরবর্তী ২ মাস পর এসব রোগীরা কেমন ছিলেন গবেষণায় সেটা তুলে ধরা হয়েছে। দেখা গেছে ১২৫০ জন রোগী যাদেরকে চিকিৎসা দিয়ে বাড়িতে পাঠানো হয়েছিলো তাদের মধ্যে ৮৪ জন পরে মারা গেছেন। আর ১৮৯ জন এ দুই মাসের মধ্যে নানা ধরণের জটিলতা নিয়ে আবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন।

এছাড়া কাঁশি, শ্বাসকষ্টসহ শারীরিক অবস্থার অবনতির চিত্রও এতে তুলে ধরা হয়েছে। ভয়ংকর ব্যাপার হচ্ছে- যারা আগে চাকরি করতেন তাদের ৪০% করোনা পরবর্তীতে সুস্থ হয়েও কাজে ফিরে যেতে পারেন নি।

আবার যারা কাজে যোগ দিয়েছেন তাদের ২৬% পুর্ণকালীন সময় কাজ করতে পারার মতো শারীরিক ও মানসিক অবস্থার মধ্যে নেই।

সতর্ক হতে হবে নিজের জন্য।
সতর্ক হতে হবে পরিবারের সকলের জন্য। আমরা নিশ্চয় জানি যে বয়স্ক মানুষ, ডায়াবেটিস, হাইপ্রেশার, কিডনি রোগ, হৃদরোগ, ক্যান্সারে ভোগা রোগীদের করোনায় মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি।

আমাদের দেশে যে ৬ হাজারেরে উপরে মানুষ মারা গেছেন তাদের মেজরিটির বয়স ৬০ বছরের উপরে এবং ডায়াবেটিসসহ নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। ফলে পরিবারের বয়স্ক ও শারীরিক জটিলতায় আছেন এমন সদস্যদের কথা বিবচেনায় নিয়ে হলেও আমাদেরকে অবশ্যই সতর্ক হতে হবে। কারণ তারা বাইরে না গেলেও পরিবারের কেউ না কেউ তো নিয়মিতই রুটি রুজির সন্ধানে বাইরে বের হচ্ছেন বা হতে বাধ্য হচ্ছেন। এখন এই আমরা যারা বাইরে বের হচ্ছি তারা যদি সতর্ক না হই তাহলে কিন্তু পরিবারের এসব মানুষ আমাদের সহজেই আক্রান্ত হয়ে যেতে পারেন। এর ফলে হয়ত প্রিয় মানুষটির অকালমৃত্যুও হতে পারে। তখন নিজেকে ক্ষমা করতে পারবেন তো?

এ কারণে নিজের ও পরিবারের সকলের মঙ্গলের তথা ভেবে আসুন আমরা সকলে দায়িত্বশীল আচরণ করি। এজন্য শুধুমাত্র নিচের ৩ টি কাজ করলেই হবে-
(১) মাস্ক পরতে হবে। ওয়ান টাইম ব্যবহারযোগ্য মাস্ক পরলে তা পেলিথিনে মুড়িয়ে ফেলে দিন। পুনরায় ব্যবহার করবেন না। আর কাপড়ের মাস্ক পরলে বাড়িতে ফিরে নিয়মিত তা সাবান দিয়ে ধুঁয়ে ফেলুন।
(২) নিয়মিত হাত সাবান দিয়ে পরিষ্কার করুন। সম্ভব না হলে স্যানিটাইজ করুন। বাসায় এসে সরারসি বাথরুমে ঢুকুন।

কাপড়চোপড় ডিটারজেন্টে ভিজিয়ে হাত মুখ ভালো করে পরিষ্কার করে তারপর অন্যদের সাথে বসুন। প্রয়োজনে গরম পানি দিয়ে গোসল করতে পারলে সবচেয়ে ভালো হয়।
(৩) নিরাপদ শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখুন। পারলে ভিড় এড়িয়ে চলুন।

আসুন সবাই দায়িত্বশীল নাগরিকের মতো আচরণ করি। শুধূমাত্র এই ৩টি জিনিস আমরা যদি সবাই মেনে চলি তাহলে সবমিলিয়ে এই শীতের ৩ মাসে আমাদের দেশে করোনার নতুন করে বিস্তার হওয়ার কোনো সুযোগ সৃষ্টি হবে না।

আর সেটা যদি আমরা করতে ব্যর্থ হই তাহলে হয়ত আমাদেরকে ভয়াবহ মাশুল গুণতে হতে পারে।

হারাতে হতে পারে অতি নিকটজন-কাছের মানুষটিকে।করোনার এ শীতল বার্তাটি যেন আমাদের বুঝতে ভুল না হয়-সেই বিনীত নিবেদন রাখছি সকলের কাছে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *