করোনা ঝুঁকিতে ১৯ থানা, তাও কেউই মানছেন না স্বাস্থ্যবিধি

জাতীয় লিড ১

ডেস্ক রিপোর্ট : সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) গত এপ্রিল মাসে ঘোষণা দেয়, রাজধানীর ১৯টি থানা এলাকা করোনা সংক্রমণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এসব থানায় পরীক্ষার বিপরীতে রোগী শনাক্তের হার ছিল ৩১ থেকে ৪৬ শতাংশ। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তখন রূপনগর ও আদাবর এলাকা চিহ্নিত করা হয়। সেখানে শনাক্তের হার ছিল যথাক্রমে ৪৬ ও ৪৪ শতাংশ।

গত ২৭ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত করোনা শনাক্তের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সতর্কতা জারি করে আইইডিসিআর। পরবর্তী সময়ে ওই দুই এলাকায় করোনা মোকাবিলায় নেওয়া হয় ব্যাপক স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কর্মসূচি। সিটি করপোরেশন, স্থানীয় কাউন্সিলরসহ সংশ্লিষ্টরা এ কাজে সরাসরি অংশ নেন। তিন মাস পর ওই এলাকাগুলোতে যেন আগের চিত্র ফিরে এসেছে। কেউই মানছেন না স্বাস্থ্যবিধি। অলিগলিসহ সর্বত্রই মানুষ অসচেতন অবস্থায় চলাফেরা করছেন। এমনকি মাস্ক ব্যবহারেও ব্যাপক অনীহা তাদের। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে এসব এলাকায় করোনার ঝুঁকি ফের মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।

আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী, যেসব থানা এলাকায় শনাক্তের হার ৩১ শতাংশের ওপরে ছিল, তার মধ্যে আরও রয়েছে শাহ আলী, রামপুরা, তুরাগ, মিরপুর, কলাবাগান, তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর, মুগদা, গেন্ডারিয়া, ধানমন্ডি, হাজারীবাগ, নিউ মার্কেট, চকবাজার, সবুজবাগ, মতিঝিল, দারুস সালাম ও খিলগাঁও রয়েছে।

যেসব জায়গায় শনাক্তের হার ২১ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে ছিল, সেগুলো হলো- শাহবাগ, বংশাল, লালবাগ, শাহজাহানপুর, রমনা, কামরাঙ্গীরচর, শ্যামপুর, বাড্ডা, বনানী, উত্তরখান, শেরেবাংলা নগর, সূত্রাপুর, যাত্রাবাড়ী, পল্লবী, কাফরুল, ডেমরা, ওয়ারী, ভাটারা, দক্ষিণখান, খিলক্ষেত, কদমতলী, উত্তরা পূর্ব থানা ও পল্টন।

১১ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে শনাক্তের হার ছিল তেজগাঁও ডেভেলপমেন্ট, উত্তরা-পশ্চিম, ভাষানটেক, গুলশান, ক্যান্টনমেন্ট, তেজগাঁও শিল্প ও বিমানবন্দর থানা এলাকায়।

সরেজমিন এসব এলাকা ঘুরে স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। চলমান বিধিনিষেধের মধ্যেও বাজার ও চায়ের দোকানগুলোতে ভিড় করতে দেখা যায় অসংখ্য মানুষকে। সামাজিক দূরত্বেরও কোনো বালাই নেই। যথাযথভাবে মাস্কও ব্যবহার করছেন না অনেকে।

এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, করোনা প্রতিরোধে সফলতা অর্জনের প্রধান কৌশল হলো জনসম্পৃক্ততা বা জনসাধারণকে যুক্ত করা। কাজটি আমরা করতে পারিনি। আমাদের প্রত্যাশা ছিল, সরকার প্রতিটি পাড়া, মহল্লা ও এলাকায় একটি গণতদারকি কমিটি গড়ে তুলবে। জনপ্রতিনিধিদের উদ্যোগে এলাকার মান্যবর একজনকে কেন্দ্র করে এ কমিটি হবে। সেখানে ওই এলাকার সামাজিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক নেতৃবৃন্দকে যুক্ত করা হবে। তরুণদের নিয়ে স্বেচ্ছাসেবী টিম করা হবে। তারা নির্বাচনের সময়ের মতো প্রতিটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাস্ক পরার কথা বলবেন। একই সঙ্গে জানিয়ে দেবেন মাস্ক ব্যতীত কাউকে বাড়ির বাইরে আসতে দেওয়া হবে না। কিন্তু এমনটি করা সম্ভব হয়নি।

ডিএনসিসি কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালের বাইরে কথা হয় মিরপুরের রূপনগর এলাকা থেকে আসা করোনা রোগীর স্বজন হাফিজুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমার চাচাকে এ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। আমরা জানতাম রূপনগর ও আদাবর করোনা সংক্রমণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। কিন্তু আমাদের এলাকার বেশির ভাগ মানুষ এ বিষয়ে সচেতন নন। সেখানে অনেকেই মাস্ক পরেন না, স্বাস্থ্যবিধি মানেন না। এ কারণে রূপনগর এলাকায় করোনায় আক্রান্তের হার বেশি। শুধু আমার চাচা নন, এলাকায় অনেক পরিচিত ও আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যেও করোনার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। প্রায় প্রতিটি বাসায় এখন জ্বরের রোগী। এরপরও মানুষ সচেতন হচ্ছেন না। আমার চাচার মতো যদি সবাইকে হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন পড়ে তাহলে তো হাসপাতালেই জায়গা হবে না। সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে এখনই জোরাল ভূমিকা নেওয়া উচিত।

রূপনগর ও আদাবর এলাকার একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে কথা হয় । তারা জানান, করোনার এমন দুর্যোগের মধ্যেও মানুষ সেভাবে সচেতন হয়নি। এলাকার অলিগলির দোকানপাট থেকে শুরু করে প্রধান প্রধান সড়কে মানুষের জটলা। কেউ সেভাবে মাস্ক পরছেন না, সামাজিক দূরত্বও মানছেন না।

মানুষ কেন সচেতন হচ্ছে না— এ বিষয়ে কথা বলতে যোগাযোগ করা হয় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন রূপনগর এলাকা তথা ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তফাজ্জল হোসেন টেনুর সঙ্গে। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্যবিধি মানাতে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে প্রচারের পাশাপাশি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের মাধ্যমে অভিযান, জরিমানা অব্যাহত আছে।

‘গত এপ্রিলে আইইডিসিআরের পক্ষ থেকে রূপনগর ও আদাবর করোনা সংক্রমণের দিক থেকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে ঘোষণার পর আমরা আমাদের প্রতিটি এলাকা, পাড়া ও মহল্লায় নিয়মিত স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে কাজ করছি, যা এখনও চলমান আছে।’

তবে নাম প্রকাশ না করে এ ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা ডিএনসিসির এক আঞ্চলিক কর্মকর্তা বলেন, প্রথমদিকে স্বাস্থ্যবিধি মানাতে যেভাবে তৎপরতা চালানো হয়েছিল, সেটি এখন আর নেই। মানুষ এখন যে যার মতো করে চলছে। আর সিটি করপোরেশনের এমন জনবল নেই যে সবসময় মনিটরিং করবে। মানুষ নিজেরাই যদি সচেতন না হয়, তাহলে কোনো পদক্ষেপই কাজে আসবে না।

তাহলে করণীয় কী— প্রশ্ন রাখা হয় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরীর কাছে। তিনি বলেন, করোনা সংক্রমণের বেশি ঝুঁকিতে থাকা আদাবর ও রূপনগরের বিষয়ে আইইডিসিআরের যে বিশ্লেষণ ছিল সেই প্রেক্ষাপট কিন্তু এখন বদলে গেছে। কারণ, তখন কেন্দ্র থেকে অর্থাৎ বড় শহর থেকে গ্রাম অঞ্চলে করোনা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি ছিল। এখন সীমান্ত এলাকা থেকে এটি কেন্দ্রে চলে এসেছে। তাই তিন মাসের আগের সেই প্রেক্ষাপট এখন আর নেই।

‘এখন এলাকাকেন্দ্রিক কর্মপরিকল্পনা তৈরির কোনো জায়গা নেই। কারণ, সামাজিক সংক্রমণ এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে, কোন এলাকা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, কোন এলাকা কম ঝুঁকিতে— এটি বলার আর সুযোগ নেই। জোনিং সিস্টেম এখন আর কাজে দেবে না।’

তার যুক্তি, আমাদের হাসপাতালগুলো এখন সক্ষমতার চূড়ান্তসীমা অতিক্রম করছে। রোগী আরও বাড়লে হাসপাতালগুলোতে আর জায়গা দেওয়া যাবে না। ফলে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাবে। এ অবস্থায় এসে লকডাউন বা বিধিনিষেধ সেভাবে কার্যকরও করা যাচ্ছে না। তাই সামাজিকভাবে মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মানানোর বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য নিয়মিত একটি প্রশাসনিক কার্যক্রম গ্রহণ করা যেতে পারে।

সেটি কীভাবে, তারও ব্যাখ্যা দেন এ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। বলেন, ‘প্রতিটি ওয়ার্ড, এলাকা, পাড়া ও মহল্লাকেন্দ্রিক স্বেচ্ছাসেবা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। স্বেচ্ছাসেবীদের দিয়ে মাস্ক পরিধান, স্বাস্থ্যবিধি মানানোর বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। মাস্ক ছাড়া কাউকে বাইরে বের হতে দেওয়া হবে না— এটি নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে যত দ্রুত সম্ভব মানুষকে টিকার আওতায় আনতে হবে। তা না হলে পরিস্থিতি কখনওই নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে না। এ পদক্ষেপগুলো জরুরিভিত্তিতি এবং গুরুত্বসহকারে আমাদের এখনই গ্রহণ করতে হবে।’

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *