কলকাকলীতে মুখরিত হোক শিক্ষাঙ্গন

মতামত

দুদিন আগে পূর্বাচলে গিয়ে রেশমির সাথে দেখা। বড়কাউ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ফাইভে পড়ে। প্রথমে জিজ্ঞাসা করায় বলেছিল, ক্লাস ফোরে পড়ি। সাথে সাথেই লজ্জা পেয়ে বললো, ফোরে না ফাইভে উঠে গেছি। বোঝা গেল, পরীক্ষা ছাড়া প্রমোশনটা ঠিক মেনে নিতে পারেনি এখনও। তাই ভুলে যায়। রেশমির হাতে ছিল নতুন বই, চেহারা হাসিতে ঝলমলে। তবে কাছে যেতেই বললো, বইগুলো তার নয়, তার বান্ধবীর। সে এখনও নতুন বই পায়নি। তবে দু-একদিনের মধ্যে পেয়ে যাবে। বান্ধবীর বই হলেও, নতুন বইয়ের যে গন্ধ, তাতেই বিমোহিত রেশমি। তার পাশে দাঁড়ানো বান্ধবী লতা নতুন বইয়ের মালিকানার গরবে গরবিনী। তার চোখে মুখেও হাসির ঝিলিক। এই দুই শিশুকে দেখে আমার ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে গেল।

১০ বছর ধরে সরকার বছরের প্রথম দিনই রীতিমতো উৎসব করে শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেয়। আমাদের সময় এমন উৎসব ছিল না। আমরা নতুন বই পেতাম না। বই পেতাম আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে। আমার বড় বোনের বই-ই পড়তে হয়েছে আমাকে। কালেভদ্রে সিলেবাজ পাল্টালে বা আপার বই বেশি ছিড়ে গেলে একটা দুটা নতুন বই কেনার সৌভাগ্য হতো। নতুন বই পাওয়া মানে যেন আকাশের চাঁদ পাওয়া। ভোমর আর দুই রঙা সুতা দিয়ে সেলাই করা। পুরোনো ক্যালেন্ডার বা রুশ ম্যাগাজিন উদয়নের পৃষ্ঠা দিয়ে ‘টিস’ করে তার ওপর নিজের নাম, ক্লাস, রোল নাম্বার, বিষয় লিখে যত্ন করে রাখতাম। আহা নতুন বইয়ের কী অপরূপ রূপ, কী অসাধারণ গন্ধ। বুকে চেপে ধরে রাখতাম। গত এক যুগে সরকার ভালো-মন্দ অনেক কিছু করেছে। আমার ভালোর তালিকায় উপরের দিকেই থাকবে বই উৎসব। বাংলাদেশের সবগুলো উৎসবের মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় বই উৎসব। বছরের প্রথম দিনই শিক্ষার্থীরা হাতে নতুন বই নিয়ে হাসছে, এর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য আর কী হতে পারে।

 এখন সময় সামনে তাকানোর। শিক্ষার্থীরা সবাই চাই। আমরাও চাই, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আবার মুখরিত হোক আমাদের সন্তানদের কলকাকলীতে। কিন্তু আমিও জানি, সন্তানের স্বাস্থ্য ঝুকিতে ফেলে তাকে কেউই স্কুলে পাঠাতে চাইবেন না। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার আগে করোনার ঝুঁকিটা যাচাই করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিতে হবে। 

করোনা আতঙ্কে গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। এবারের বই উৎসব নিয়ে আমার কিছুটা শঙ্কা ছিল। কিন্তু সব শঙ্কার মেঘ উড়িয়ে দিয়ে হেসেছে উৎসবের সূর্য। প্রধানমন্ত্রী আগের বছরের শেষ দিনই ভার্চুয়ালি বই উৎসবের উদ্বোধন করেছেন। বছরের প্রথম দিন থেকেই স্কুলে স্কুলে চলছে অন্যরকম বই উৎসব। আগের মতো উৎসব আয়োজন নেই বটে। তবে বছরের প্রথম দিন থেকেই চলছে বই বিতরণ। ঝুঁকি এড়াতে একেক দিন একে ক্লাসের বই দেয়া হচ্ছে, যাতে স্কুলে খুব বেশি ভিড় হতে না পারে। এভাবে ১২ দিন ধরে চলবে বই উৎসব। এই করোনাকালেও প্রায় সাড়ে ৪ কোটি ৬ শিক্ষার্থীর হাতে পৌঁছে দেয়া হবে প্রায় ৩৫ কোটি বই। করোনা মোকাবিলায় সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য মানি আমি এটিকেই।

স্কুলে শিশুদের হইচই, দুষ্টামি, কলকাকলী আমার সবচেয়ে প্রিয়। এ যেন প্রতিদিনের উৎসব। এ উৎসবে শামিল হতে আমি প্রতিদিন সকালে প্রসূনকে নিয়ে স্কুলে যেতাম। যদিও বাসা থেকে প্রসূনের স্কুল (এখন কলেজ) কয়েক মিনিটের পথ। একটু বড় হওয়ার পর তার সাথে স্কুলে গেলে সে খুবই বিরক্ত হতো। কিন্তু আমি যেতাম আসলে সেই উৎসবে শামিল হতে। প্রসূন ঢুকে যাওয়ার পরও আমি গেটে দাঁড়িয়ে থাকতাম। হইচই করে সবার ঢোকা। ক্যাম্পাস থেকে সম্মিলিত উল্লাসধ্বনি বা অ্যাসেম্বলিতে সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত শুনতে শুনতে আমি প্রতিদিনই একবার ঘুরে আসতাম আমার ছেলেবেলা থেকে। কোনো দিন প্রসূনের স্কুলে না গেলেও আমি এই আনন্দ মিস করতাম না। আমার বাসার উল্টো দিকেই একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল আছে। কোনো কোনো দিন আমার ঘুম ভাঙতো সেই স্কুলের অ্যাসেম্বলির সমবেত জাতীয় সঙ্গীত শুনে। এরপর আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতাম সেই স্কুলের শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা। প্রতিদিনই আমি শিশুদের হইচই শুনে নিজে রিচার্জ হতাম। দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশায় বুক বাধতাম।

কিন্তু বছর ঘুরে এলো দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুনসান নীরবতা। করোনা আতঙ্কে সব বন্ধ। এমনিতে স্কুল ছুটি হলে বা বন্ধ হলে শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি খুশি হয়। কিন্তু এবারের বন্ধে কেউ আর খুশি হতে পারছে না। আমার এক বন্ধু ফেসবুকে লিখেছিল, ছেলেবেলায় স্কুল ছুটির জন্য আল্লাহর কাছে অনেক দোয়া করেছি। আল্লাহ দোয়া কবুল করেছেন এবং ৪০ বছরের দোয়া একসাথে। এখন উল্টো স্কুল খোলার দোয়া করছে শিক্ষার্থীরা। হুমায়ূন আহমেদের নাটক ‘বহুব্রীহি’তে বিপত্নীক এক লোক তার দুই সন্তানকে নিয়ে সংসার করছিলেন। সে চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন আসাদুজ্জামান নূর। তো একদিন দুই সন্তান এসে তাদের বাবাকে বললো, বাবা স্বাধীনতা কী?

জবাবে আসাদুজ্জামান নূর বললেন, যা ইচ্ছা তাই করতে পারা হলো স্বাধীনতা। তারপর দুষ্টু দুজন বললো, আমাদের স্কুলে যেতে ভালো লাগে না। আসাদুজ্জামান নূর বললো, তাহলে স্কুলে যেও না। তারা খুব খুশি হয়ে নাচতে নাচতে খেলতে চলে গেল। দুদিন পরই তারা কাচুমাচু হয়ে বাচ্চারা এসে বললো, বাবা স্বাধীনতা আমাদের ভালো লাগে না। তার মানে তারা স্কুলে যেতে চায়। এখন বাংলাদেশের সব শিক্ষার্থীর অবস্থা সেই দুই শিশুর মতো- ছুটি আর তাদের কাছে ভালো লাগে না। সবাই স্কুলে যেতে চায়। শুরুতে যে রেশমীর কথা বললাম, সেও বললো, বাড়িতে থেকে আর ভালো লাগছে না। বললো, আঙ্কেল সরকারকে বলেন স্কুল খুলে দিতে।

আমার বলতে হবে কেন, সরকার আমার চেয়ে ভালো জানে। সরকার তো আর ইচ্ছা করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখেনি। জাতির ভবিষ্যৎকে করোনার হাত থেকে রক্ষার জন্যই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। বারবার ছুটি বাড়ানো হচ্ছে। বারবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার নানা পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিন্তু করোনার বিস্তার সব পরিকল্পনা ভন্ডুল করে দিয়েছে। কথায় বলে না, ম্যান প্রপোজেস, গড ডিসপোজেস। করোনায় বারবার এ ঘটনা ঘটছে। কোন মাসে স্কুল খুললে কোন পরীক্ষা হবে, এ ধরনের নানা টাইমলাইন ঘোষণা করেছিল সরকার। বারবার তা পেছাতে হয়েছে।

বার্ষিক পরীক্ষা হয়নি, পিইসি, জেএসসি, এমনকি অতি গুরুত্বপূর্ণ এইচএসসি পরীক্ষাও হয়নি। সব অটোপাস, অটো প্রমোশন। এইচএসসি পরীক্ষাটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই পরীক্ষার ওপর নির্ভর করে দেশে-বিদেশে উচ্চশিক্ষা। জেএসসি এবং এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে না হওয়া এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রস্তুত করা হলেও আইনগত জটিলতায় তা ঘোষণা করা যাচ্ছে না। কারণ পরীক্ষা ছাড়া ফলাফল ঘোষণা প্রচলিত আইনের সাথে সাংঘর্ষিক। আগে আইন সংশোধন করতে হবে, তারপর ফলাফল। সরকার এবার সংক্ষিপ্ত পাঠ্যক্রমে হলেও এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষা নেয়ার ব্যাপারে বদ্ধপরিকর। আপাতত ১৬ জানুয়ারি পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। সরকারের পরিকল্পনা সব ঠিক থাকলে ফেব্রুয়ারিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা। তারপর এপ্রিল পর্যন্ত ক্লাস করিয়ে জুন নাগাদ এসএসসি পরীক্ষা নেয়া। একইভাবে মে পর্যন্ত ক্লাস করিয়ে জুলাই-আগস্ট নাগাদ এইচএসসি পরীক্ষা নেয়ার পরিকল্পনা। তবে সবকিছু নির্ভর করছে করোনার ওপর।

করোনাভাইরাস সব খাতের ওপর আঘাত করেছে। অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে শিক্ষাখাতের। অন্য সব খাতের ক্ষতি বাড়তি কাজ করে পুষিয়ে নেয়া যাবে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া একটি বছর আর কখনো ফিরে পাবে না তারা, যা গেছে, তা তো আর ফিরে আসবে না। এখন সময় সামনে তাকানোর। শিক্ষার্থীরা সবাই চায়। আমরাও চাই, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আবার মুখরিত হোক আমাদের সন্তানদের কলকাকলীতে। কিন্তু আমিও জানি, সন্তানের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলে তাকে কেউ-ই স্কুলে পাঠাতে চাইবেন না। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার আগে করোনার ঝুঁকিটা যাচাই করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিতে হবে।

লেখক, প্রভাষ আমিন, হেড অব নিউজ, এটিএননিউজ

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *