কিশোরগঞ্জের দুঃখ নরসুন্দা নদীও এখন জলশূন্য

সারাবাংলা

রাজিবুল হক সিদ্দিকী, কিশোরগঞ্জ থেকে:
এবার মৌসুমের শুরুতেই কিশোরগঞ্জের নদীগুলো তীব্র জল সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে নদীগুলোর অস্তিত্ব প্রায় বিলীন হওয়ার পথে। এক সময়ের স্রোতস্বিনী মেঘনা, ধলেশ্বরী, ব্রহ্মপুত্র, ঘোড়াউত্রা, ধনু, নাগচিনি, নরসুন্দা গুরুত্বপূর্ণ এসব নদীতে এ বছরের শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই জল সংকট দেখা দিয়েছে। নদীগুলোর কোনো কোনো স্থানে চর জেগে উঠেছে। জেলার ১৩টি উপজেলায় ছড়িয়ে আছে ছোট বড় অসংখ্য নদ-নদী। বর্তমানে জেলার অধিকাংশ নদ-নদীতে পলি পড়ে নাব্যতা হারিয়ে গেছে। ফলে বর্ষা মৌসুম ছাড়া নদীগুলো নৌপথের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় বোরো মৌসুমে বেশীরভাগ নদ-নদীর অংশ খাল বিল কার্যত জল সেচে কৃষকদের ফসল উৎপাদনে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না।
কিশোরগঞ্জের বুক চিরে প্রবাহিত এককালের খরস্রোতা নরসুন্দা নদী এখন কিশোরগঞ্জের দুঃখ। ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদী নরসুন্দা হোসেনপুর উপজেলা থেকে উৎপন্ন হয়ে কিশোরগঞ্জের মধ্য দিয়ে জেলার পূর্বদিকে ইটনার চৌগাঙ্গায় ধনু নদীতে গিয়ে মিশেছে। ৫৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদী এখন মরা খাল। এক সময় নদী দিয়ে সারা দেশের সঙ্গে নৌ যোগাযোগ ছিল। এখন নৌপথ না থাকায় কিশোরগঞ্জবাসীর নদী পথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। নরসুন্দা নদীর অধিকাংশ স্থানে এখন বোরো আবাদ হয়। নরসুন্দার শাখা ধুলদিয়া ঘাটের কাছে প্রবহমান সূতি নদী ও নিকলী উপজেলার সোনাইজানি নদীতে জল না থাকায় মালবাহী নৌকাসহ সাধারণ নৌকাগুলো আটকা পড়েছে। অন্যদিকে, কিশোরগঞ্জের ওপর দিয়ে ব্রহ্মপুত্র, ঘোড়াউত্রা, ধনু, কালনী, ধলেশ্বরী, নাগচিনি এবং মেঘনার মত বড় বড় নদ নদীর পাশাপাশি আড়িয়াল খাঁ, ধলেশ্বরী, কালনী, নরসুন্দা, ধনু, সিঙ্গুয়া, সোয়াইজানি নদীর মত আরো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নদী রয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদ জামালপুর দিয়ে ঢুকে ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী হয়ে ভৈরবের কাছে মেঘনার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। বর্তমানে ব্রহ্মপুত্র নদ হোসেনপুর অংশ শুকিয়ে চর পড়ে মরা নদে পরিণত হওয়ায় ময়মনসিংহের গফরগাঁওসহ বিশাল এলাকার মানুষ নদী পথে যেতে পারে না। ব্রহ্মপুত্র নদের মাধ্যমে গফরগাঁও, হোসেনপুরসহ এসব এলাকার ৪০টি বাজার ও মোকামে নৌ-পথে মালামাল পরিবহন করা হত। নদের তীরবর্তী এসব বাজার ও মোকামগুলো বর্তমানে কালের সাক্ষী হয়ে আছে। কটিয়াদী উপজেলার আড়িয়াল খাঁ নদী কটিয়াদী থেকে উজানচর ও লোহাজুড়ি হয়ে ভৈরবের মেঘনা নদী, আবার নোয়াকান্দি জালালপুর দিয়ে মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র দিয়ে সারা দেশের সঙ্গে যোগাযোগ ও মালামাল পরিবহনে বিশাল ভূমিকা ছিল। বর্তমানে নাব্যতা সংকটে নৌপথ বন্ধ থাকায় হাজার হাজার ব্যবসায়ী এখন মালামাল পরিবহন করে সড়ক পথে। তাছাড়াও কটিয়াদী বাজারে ব্রহ্মপুত্র নদের উপর বাঁধ দেয়ায় তা শুকিয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে।
বিশেষ করে হবিগঞ্জের খোয়াই, মৌলভী বাজারের মনু সিলেটের সুরমা, কুশিয়ারা কিশোরগঞ্জে অষ্টগ্রাম উপজেলা ও সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার মোহনায় কালনী নদী নামে পরিচিতি লাভ করেছে। এই কালনী- দিরাই নৌপথটি বন্ধ হয়ে পড়ায় হাওরের ৩২টি উপজেলার মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়ে বিকল্প পথে যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছে। হাওরের মিঠামইন উপজেলার সুরমা নদী শুকিয়ে যাওয়ায় বৃহৎ হাওরের অষ্টগ্রাম উপজেলার আদমপুর পর্যন্ত নৌপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাওরের ৫০টি বাজার ও মোকামগুলোতে নৌ পথে মালামাল পরিবহন করতে পারছে না। আবহাওয়াগত পরিবর্তনের কারণে এখন সব বছর ভরা বর্ষা হয় না। প্রবল বর্ষায় স্বাভাবিক উচ্চতায় জল ওঠে না। কোনো কোনো বছর নজির বিহীন দীর্ঘস্থায়ী বন্যা মানুষকে ভোগায়। বোরো আবাদ ব্যাহত হয়। আবার কোনো কোনো বছর ঠিকমত বর্ষাই হয় না। বর্ষার জলের স্থায়িত্ব কোনো কোনো বছর স্বল্পকালীন হয়। তখন কৃষকরা ভূগর্ভস্থ জল ছাড়া বোরো চাষাবাদ করতে পারেন না। কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা মাইজখাপন ইউনিয়নে প্রবাহিত ফুলেশ্বরী ও নরসুন্দা নদীতে জল নেই। নদী শুকিয়ে গিয়ে নদীর তলদেশের মাটিতে ফাটল দেখা দিয়েছে। ফলে নদীর আশে-পাশের শত-শত একর জমিতে কৃষকরা জল সেচে মারাত্মক সমস্যার মধ্যে পড়েছে। এখন কৃষকরা ছোট ছোট ডোবা ও নালা থেকে জল সংগ্রহ করে ধঅন ক্ষেতে জল দিচ্ছে। যাদের অবস্থা আর্থিকভাবে একটু ভাল তারা স্যালু মেশিন দিয়ে ক্ষেতে সেচের ব্যবস্থা নিয়েছে। হাওর থেকে নির্বাচিত জাতীয় সংসদে সদস্য রেজওয়ান আহমেদ তৌফিক বলেন, হাওরের মানুষকে বাঁচাতে ইতোমধ্যে আগাম বন্যার কবল থেকে প্রধান ফসল বোরো ধান রক্ষা করা এবং ভাঙনের তাণ্ডবে বিলীন হয়ে যাওয়া গ্রামগুলো পুনরুদ্ধারকল্পে কালনী-কুশিয়ারা প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। প্রকল্পে কাজ চলছে। প্রকল্পের সার্বিক কাজ বাস্তবায়নের হলে হাওরবাসী নৌ-পথে যোগাযোগসহ বোরো জমিতে সেচের সমস্যা দূর হবে। কিশোরগঞ্জের পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মতিউর রহমান জানান, নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় নৌ-পথে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। ইতিমধ্যে কালনী-কুশিয়ারা প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে। এই প্রকল্পের অধীনে নদী খনন ও বাঁকা নদী কেটে (লুপ কাট) সোজাকরণের কাজ করা হবে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *