কিশোরগঞ্জে বড়ইতলা গণহত্যা দিবস পালন

সারাবাংলা

রাজিবুল হক সিদ্দিকী, কিশোরগঞ্জ থেকে
শোক ও শ্রদ্ধায় কিশোরগঞ্জে বড়ইতলা গণহত্যা দিবস পালিত হয়েছে। একাত্তরের ১৩ অক্টোবর কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার কর্শাকড়িয়াইল ইউনিয়নের বড়ইতলায় স্থানীয় দোসরদের সহায়তায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন গ্রামের ৩৬৫ জন মানুষকে কাতারবন্দি করে একসঙ্গে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। এক দিনে একসঙ্গে এতগুলো মানুষকে হত্যার ঘটনা খুবই বিরল। এরপর থেকেই দিবসটি বড়ইতলা গণহত্যা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। বরইতলায় শহীদদের স্মরণে গত রোববার সকালে জেলা প্রশাসন, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, আওয়ামী লীগ ও শহীদ পরিবারের স্বজনরা শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে দোয়া করা হয়েছে। এছাড়া এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) গোলাম মোস্তফা, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল কাদির মিয়া, সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাগুপ্তা হক, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ওবায়দুর রহমান সাহেল, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অর্ণব দত্ত, সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস-চেয়ারম্যান মোঃ আব্দুস সাত্তার, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মাছুমা আক্তার, সাবেক সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ভূপাল নন্দী, যশোদল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইমতিয়াজ সুলতান রাজন, কর্শাকড়িয়াইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বদর উদ্দিনসহ মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও শহীদ পরিবারের স্বজনেরা শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
জেলা সদর থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দক্ষিণে সদর উপজেলার কর্শাকড়িয়াইল ইউনিয়নের একটি এলাকা বড়ইতলা। ময়মনসিংহ-ভৈরব-ঢাকা রেলপথের পাশেই এর অবস্থান। একাত্তরের ১৩ অক্টোবর জেলা সদর থেকে বিশেষ ট্রেনযোগে পাকিস্তানী সেনারা স্থানীয় দোসরদের সঙ্গে নিয়ে দুপুর ১২টার দিকে বরইতলা এলাকায় পৌঁছে।
আগে থেকেই স্থানীয় স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার, আল-শামসরা আশপাশের দামপাড়া, চিকনিরচর, কালিকাবাড়ি, তিলকনাথপুর, গোবিন্দপুর, ভুবিরচর, কড়িয়াইলসহ কয়েক গ্রামের অন্তত ৪০০ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে জড়ো করে রেখেছিল হানাদারদের স্বাগত জানানোর জন্য। হানাদাররা বড়ইতলায় নামলে কিছু হানাদার সৈন্য রাজাকারদের সহায়তায় পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে ঢুকে লুটপাটে মত্ত হয়। এরপর যখন এরা গ্রামগুলো থেকে ফিরে আসে তখন এক রাজাকার রটিয়ে দেয়, দু’জন হানাদার সেনাকে গ্রামবাসী গুম করে ফেলেছে। একথা শুনেই উন্মত্ত হানাদাররা সমবেত গ্রামবাসীর ওপর দানবের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। মেশিনগানের ব্রাশ ফায়ার, বেয়নেটের খোঁচা, রাইফেলের বাট, শাবল আর হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে কয়েক মুহুর্তে ৩৬৫ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে হত্যা করে।
এসময় অনেকে দৌড়ে পার্শ্ববর্তী মসজিদে গিয়ে নামাজের ভান করে রক্ষা পান। কেউ মরে গেছেন ভান করে রক্তাক্ত লাশের স্তুপে পড়ে থেকে রক্ষা পান। আবার কেউ কেউ আহত অবস্থায় মৃতের ভান করে রক্ষা পান। আহতদের কেউ কেউ এখনো সেদিনের দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে শহীদদের স্মরণে বড়ইতলা এলাকাটির নামকরণ করা হয় ‘শহীদ নগর’। যদিও প্রচারণার অভাবে এ নামটি এখনো প্রতিষ্ঠা পায়নি। এখানে তৈরি করা হয়েছে শোকের প্রতীক গাঢ় কালো সুউচ্চ স্মৃতিসৌধ। স্থাপন করা হয়েছে শহীদদের নামাঙ্কিত ফলক।
২০০০ সনে জেলা পরিষদের উদ্যোগে ৬৬৭ বর্গফুট এলাকা জুড়ে ২৫ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট স্মৃতিসৌধটির নির্মাণ করা হয়। স্মৃতিসৌধটির ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করেন তৎকালীন বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী প্রয়াত জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। এর নকশা প্রণয়ন করেন সজল বসাক। স্মৃতিসৌধের ফলকে খোদাই করা শহীদদের নাম মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই রক্তাক্ত ভয়াল দিনে। প্রতি বছর ১৩ অক্টোবর স্মৃতিসৌধের বেদিতে প্রশাসনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন পুষ্পস্তবক অর্পন করে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *