কোভিড-১৯ : ফের বাড়ছে সংক্রমণ ও প্রাণহানী

কোভিড-১৯ : ফের বাড়ছে সংক্রমণ ও প্রাণহানী

জাতীয়

এসএম দেলোয়ার হোসেন

কোভিড-১৯ : ফের বাড়ছে সংক্রমণ ও প্রাণহানী
ছবি : প্রতীকী

বৈশ্বিক মহামারি অদৃশ্য প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত হানতে শুরু করেছে সারাবিশ্বে। এরইমধ্যে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে করোনাভাইরাসের প্রবণতা দেখা দিয়েছে। বিশ্বজুড়ে এখনো করোনার দাপট চলছে। অদৃশ্য এ ভাইরাসটিকে দমাতে বিশ্বজুড়ে ভ্যাকসিন তৈরির জোর তৎপরতা চলছে।

বাংলাদেশেও অদৃশ্য প্রাণঘাতী করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত হানতে শুরু করেছে। প্রথম ধাপের ধকল কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই কিছুদিন বিরতির পর দেশে করোনার ভয়াল থাবায় প্রায় প্রতিদিনই কেউ না কেউ নতুন করে সংক্রমিত হচ্ছেন, প্রাণ হারাচ্ছেন। যার ফলে গত কয়েকদিনে দেশে বেড়েছে করোনার সংক্রমণ, বেড়েছে প্রাণহানীও। আসছে শীতে বাংলাদেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত হানার শঙ্কায় সরকার তথা সাধারণ জনমনেও বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কবার্তার পর করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলায় ঘরে-বাইরে এমনকি কর্মস্থলসহ সকল ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কঠোর নির্দেশনা দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রীর এমন নির্দেশনার পর স্বাস্থ্য অধিদফতরসহ নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থার কর্তাব্যক্তিরা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। অফিস কিংবা রাস্তা, চলার পথে কোথাও কেউ মানছে না কোন স্বাস্থ্যবিধি। যার যার ইচ্ছে মতো চলছে যত্রতত্র। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ এখনও প্রথম ঢেউ পার করলেও দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রস্তুতি হিসেবে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রস্তুতি থাকা দরকার। সেই সাথে প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রবাহের মাধ্যমে স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে হাসপাতালগুলোতে চাহিদার তুলনায় আইসিইউ’র শয্যা সংখ্যা অনেকটাই অপ্রতুল।

তাই শীতের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার আগেই করোনায় প্রাণহানী রোধে দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে দ্রুত আইসিইউ’র শয্যা সংখ্যা বাড়াতে হবে। নতুবা করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সামলানো কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এদিকে স্বাস্থ্য অধিদফতরসহ সরকারি সংস্থাগুলো বলছে, প্রথম ধাপের করোনার ধকল কাটিয়ে উঠলেও এখনো শঙ্কা কাটেনি। তবে প্রধানমন্ত্রীর দিক-নির্দেশনায় দেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তি সচল রেখে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি রয়েছে। এ ক্ষেত্রে দেশের মানুষকেও সচেতন হতে হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আজ শনিবার (২৮ নভেম্বর) সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, গত বছরের শেষের দিকে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া অদৃশ্য প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরু হলে গোটা বিশ্ব কুপকাত হয়ে পড়ে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশসহ বিশ্বের ২১৮টি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে কোভিড-১৯। আজ শনিবার (২৮ নভেম্বর) বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে আরও ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে পুরুষ ২৮ ও নারী ৮ জন। সবাই হাসপাতালেই মারা গেছেন। এ নিয়ে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ৬ হাজার ৫৮০ জনে। গত এক সপ্তাহ ধরে করোনার ভয়াল থাবায় বাড়ছে সংক্রমণ, বাড়ছে প্রাণহানী। গত সাতদিনে (৪৮তম সপ্তাহ) এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ২৩০ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এর আগের দুটি সপ্তাহে (৪৭ ও ৪৬তম) করোনায় যথাক্রমে মৃত্যু হয় ১৭৭ ও ১২৪ জনের।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের এক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে জানা যায়, ৪৬তম সপ্তাহের চেয়ে ৪৭তম সপ্তাহে ৫৩ জন এবং ৪৭তম সপ্তাহের তুলনায় ৪৮তম সপ্তাহে আরও ৫৩ জন বেশি রোগী মারা গেছেন। গত এক সপ্তাহে মৃত্যুহার ২৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ বেড়েছে। অধিকাংশ মৃত্যুই হাসপাতালে হয়েছে। একইসঙ্গে বাড়ছে করোনা শনাক্তে নমুনা পরীক্ষা, রোগী শনাক্ত ও সুস্থতার হার। দেশে করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুর হারও বাড়ছে। গত এক সপ্তাহে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুহার প্রায় ৪৩ শতাংশ (৪২ দশমিক ৭৪ শতাংশ) বেড়েছে। একইসঙ্গে নমুনা পরীক্ষার হার, শনাক্ত ও সুস্থতার হার বেড়েছে।

জানা গেছে, ৪৭তম সপ্তাহে (১৫ থেকে ২১ নভেম্বর পর্যন্ত) ১ লাখ ৮ হাজার ৬৮টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। নতুন শনাক্ত হয় ১৪ হাজার ৭৮৫ জন। একই সময়ে সুস্থ হয়ে ওঠেন ১২ হাজার ৫০৩ জন। ৪৮তম সপ্তাহে (২২ থেকে ২৮ নভেম্বর) ১ লাখ ৮ হাজার ৩৯০টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। নতুন শনাক্ত হয় ১৫ হাজার ৩৩৮ জন। একই সময়ে সুস্থ হয়ে ওঠেন ১৩ হাজার ৩২৪ জন। এর আগে ৪৬তম সপ্তাহে (৮ থেকে ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত) ৯৭ হাজার ২৯২টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এ সময় ১১ হাজার ৭৩২ জনের করোনা শনাক্ত হয়। ১১ হাজার ২৮১ জন সুস্থ হয়ে ওঠেন। ৪৭ ও ৪৮তম সপ্তাহের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে আরও জানা যায়, গত সপ্তাহের তুলনায় এ সপ্তাহে নমুনা পরীক্ষার হার ০.৩ শতাংশ, শনাক্তের হার ৩.৭৪ শতাংশ এবং সুস্থতার হার ৬.৫৭ শতাংশ বেড়েছে।

এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কবার্তার পরও এ রোগ প্রতিরোধে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখনও কার্যকর কোন ভ্যাকসিন তৈরি করতে পারেনি। তবে বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস দমাতে কার্যকর ভ্যাকসিন তৈরির জোর তৎপরতা চলছে। কভিড প্রতিরোধে এখনও আলোর মুখ দেখেনি কেউ। এরইমধ্যে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে করোনাভাইরাসের প্রবণতা দেখা দিয়েছে। বিশ্বজুড়ে এখনো করোনার দাপট চলছে। বাংলাদেশও অদৃশ্য এ ভাইরাস থেকে রেহাই পাচ্ছে না। করোনার প্রথম ধাপের ধকল না কাটতেই ফের করোনার আঘাত শুরু হয়েছে এ দেশে। প্রতিদিনই আক্রান্ত ও প্রাণহানীর সংখ্যা বাড়ছে। আসছে শীতে বাংলাদেশে করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার শঙ্কায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও বেশ কয়েকবার দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে সতর্ক করেছেন। কিন্তু কেউই তা আমলে নিচ্ছে না।

এদিকে করোনায় আক্রান্তদের সংখ্যা ও প্রাণহানীর পরিসংখ্যান সংরক্ষণ করা ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডওমিটারের তথ্যানুযায়ী, আজ শনিবার (২৮ নভেম্বর) সকাল পর্যন্ত বিশ্বে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ৬ কোটি ১৯ লাখ ৮০ হাজার ২৩ জন। মৃত্যু হয়েছে ১৪ লাখ ৪৮ হাজার ৯২৮ জন। সুস্থ হয়েছেন ৪ কোটি ২৭ লাখ ৮৪ হাজার ৩১৫ জন।

চিকিৎসকরা জানান, শীতের প্রকোপ শুরু না হতেই বাড়ছে করোনা সংক্রমণ। হাসপাতালে প্রতিদিনই বাড়ছে জ্বর, কাশি, ঠাণ্ডাসহ ভাইরাসজনিত রোগীর সংখ্যা। এসব রোগ বা করোনার উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে প্রতিদিনই ভিড় করছে শিশুরা। দেশের হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে করোনা পজিটিভ শিশু রোগীর সংখ্যা। করোনার পাশাপাশি ডেঙ্গু ও শীতকালীন ভাইরাসজনিত নানা রোগের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় প্রতিনিয়তই হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক-নার্সসহ অন্যান্য স্টাফরা।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানান, শীত মৌসুম শুরুর আগেই বাড়তে শুরু করেছে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। আক্রান্ত বাড়ায় মুমূর্ষু রোগীর চিকিৎসায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে দেখা যাচ্ছে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের শয্যা (আইসিইউ) সংকট। বেসরকারি হাসপাতালেও আইসিইউ শয্যা অপ্রতুল। দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর আগেই হাসপাতালে আইসিইউ সংকটের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তারা জানান, জনসম্পৃক্ততা ছাড়া করোনা নয়, কোনো মহামারিই ঠেকানো সম্ভব নয়। তারা জানান, বাংলাদেশ এখনও প্রথম ঢেউ সামলাচ্ছে। তবে আসন্ন শীতে সাধারণ ফ্লুর সাথে কভিড যোগ হয়ে পরিস্থিতির অবনতি হবার আশঙ্কা রয়েছে। মহামারি মোকাবেলায় সবার আগে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট কাটাতে হবে। পরীক্ষার সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রস্তুত রাখতে হবে হাসপাতালগুলোকে। পর্যাপ্ত আইসিইউ’র সংখ্যা বাড়াতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা মহানগরীতে করোনা রোগীদের জন্য মোট আইসিইউ শয্যা রয়েছে ৩০৯টি, ফাঁকা ৯২টি। চট্টগ্রামে ৩৯টি, ফাঁকা ২৩টি। সারা দেশে আইসিইউ শয্যা রয়েছে সর্বমোট ৫৫৯টি। এর মধ্যে রোগী ভর্তি রয়েছেন ২৯৪ জন, ফাঁকা রয়েছে ২৬৫টি আইসিইউ শয্যা।

সূত্র জানায়, কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) আইসিইউ ফাঁকা নেই। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৪টি আইসিইউ শয্যার মধ্যে ১৮টিতে রোগী রয়েছে। মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৪টি শয্যার মধ্যে ১০টিতে রোগী ভর্তি রয়েছে। রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে ১৫টি শয্যার মধ্যে ১৩টিতে রোগী ভর্তি রয়েছে। শেখ রাসেল গ্যাসট্রোলিভার হাসপাতালে ১৬টি শয্যার মধ্যে ৭টিতে রোগী ভর্তি রয়েছে। আনোয়ার খান মর্ডান হাসপাতাল, সরকারি কর্মচারী হাসপাতালে একটি আইসিইউ শয্যা ফাঁকা আছে। আসগর আলী হাসপাতালে ৩১টি শয্যার মধ্যে ২৪টিতে রোগী ভর্তি আছে। স্কয়ার হাসপাতালে ২৫টি শয্যার মধ্যে ১৪টিতে রোগী ভর্তি রয়েছে। ইবনে সিনা হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা ফাঁকা নেই। ইউনাইটেড হাসপাতালে ২২টি শয্যার মধ্যে ১৫টিতে রোগী ভর্তি রয়েছে। এভারকেয়ার হাসপাতালে একটি আইসিইউ শয্যা ফাঁকা আছে। ইম্পালস হাসপাতালে ৫৬টি শয্যার মধ্যে ১৪টিতে রোগী ভর্তি রয়েছে, এ এম জেড হাসপাতালে একটি আইসিইউ শয্যা ফাঁকা রয়েছে, বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা ফাঁকা নেই। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৬টি আইসিইউ শয্যা ফাঁকা রয়েছে। চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ৪টি আইসিইউ শয্যা ফাঁকা রয়েছে, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে কোনো আইসিইউ শয্যা ফাঁকা নেই, বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল হাসপাতালে তিনটি আইসিইউ শয্যা ফাঁকা রয়েছে। অথচ এক মাস আগেও দেশের অধিকাংশ হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা ফাঁকা ছিল।

জানা গেছে, ঢাকা শিশু হাসপাতালে করোনা ইউনিটে শয্যা সংখ্যা ২০টি হলেও বর্তমানে পজেটিভ রোগীর সংখ্যা ২১ জন। এছাড়া গত অক্টোবর মাসে করোনা পজেটিভ রোগীর সংখ্যা ছিল যেখানে ৪৩ জন সেখানে চলতি মাসের ২১ দিনেই পজেটিভ রোগী ৬৮ জন। শীত বাড়লে সংকট আরও বাড়বে বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা। ঢাকা শিশু হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, মাঝখানে করোনা রোগীর সংখ্যা অনেক কমে এসেছিল। তবে এখন আবার রোগী বাড়ছে। বেডের চেয়ে রোগীর সংখ্যা বেশি। সুতরাং সংকট বাড়বেই।

চিকিৎসকরা জানান, শিশুর করোনা পজেটিভের দায় অভিভাবকরা এড়াতে পারেন না। বিকল্প নেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার। করোনার পাশাপাশি ডেঙ্গু ও শীতকালীন ভাইরাসজনিত সমস্যায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তবে শিশুর যে কোনো সমস্যায় বিভ্রান্ত না হয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসের পরামর্শ নিতে হবে। অভিভাবকরা শীতকালীন সাধারণ রোগের ব্যাপারে সচেতন হলে অনেক বড় বড় রোগের সংক্রমণের হাত থেকে শিশুদের রক্ষা করা সম্ভব। ঢাকা শিশু হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসক জানান, করোনা ইউনিট চালু হয় গত ১৩ জুলাই। তখন ওয়ার্ড স্থাপন ও সেবা কার্যক্রম চালুর জন্য হাসপাতালের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে ছয় কোটি টাকা চাওয়া হয়। সরকার দিয়েছিল ৬ কোটি ২ লাখ টাকা। কিন্তু সেই টাকায় শিশুদের জন্য একটি হাইফ্লো ন্যাজাল বা অক্সিজেন কনসেনট্রেটর পর্যন্ত কেনা হয়নি। ডাক্তার-স্বাস্থ্যকর্মীদের থাকা-খাওয়া, বেতন, এসি; এসবেই খরচ করে চলেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বিএসএমএমইউ’র সাবেক ডেপুটি ডিরেক্টর ডা. মুখলেসুজ্জামান হিরো বলেন, শীতে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে যে শঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। তবে আমরা যদি সঠিকভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলি, বিশেষ করে মাস্ক পরাতে সরকার বাধ্য করে তাহলে করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা নেই। কিন্তু এখন পর্যন্ত মানুষকে মাস্ক পরানোই যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে। তিনি বলেন, জরুরি প্রয়োজনে আইসিইউ সংকটও সরকার কাটাতে পারে। দেশের প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের একটি ফ্লোরে আইসিইউ ইউনিট স্থাপন করতে পারে সরকার। যদি তা বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে শুধু করোনাই নয়, যে কোনো জরুরি রোগীদের আইসিইউ সংকট কাটতে পারে।

স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজ বলেন, শীতকালে করোনাভাইরাস সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাই আইসিইউ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এটা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। তিনি বলেন, আইসিইউ সংখ্যা বাড়াতে হলে পর্যাপ্ত দক্ষ জনবলেরও প্রয়োজন। এ জন্য সরকারকে প্রশিক্ষিত জনবলও নিয়োগ দিতে হবে। তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আইসিইউ সাপোর্ট দেয়ার জন্য যথেষ্ট যন্ত্রপাতি থাকলেও তা পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর দিক-নির্দেশনায় দ্রুত রোগ নির্ণয়সহ কোভিড আক্রান্তসহ অন্যান্য রোগীর সেবা নিশ্চিতকরণে কাজ করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

আইইডিসিআর এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এ এস এম আলমগীর বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্ক বার্তার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বাংলাদেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের সংক্রমণ রোধে বার বার দিক-নির্দেশনা দিচ্ছেন। স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার ও সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখার পাশাপাশি মাস্ক ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করে দেশের সব মানুষকে অনুরোধ জানিয়েছেন। মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিতকরণে আরো কঠোর হতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। তবে ইতোমধ্যেই মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করা শুরু হয়েছে।

এদিকে গত ২৩ নভেম্বর মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেছেন, করোনার সংক্রমণরোধে আরও কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সরকার। সপ্তাহব্যাপী সচেতনতামূলক কার্যক্রম শেষে মাস্ক না পরার জন্য সর্বক্ষেত্রে জরিমানা কার্যকর ও জরিমানার পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, বৈঠকে গণভবন থেকে ভার্চুয়াল মাধ্যমে যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘মানুষকে মাস্ক পরতে বাধ্য করতে হবে। বিষয়টি বেশি বেশি প্রচার করতে হবে। কারণ মাস্ক না পরলে যত কিছুই করা হোক কাজে আসবে না।

তিনি বলেন, বিভাগীয় কমিশনাররা জানিয়েছেন, মাস্ক না পরায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মাস্ক বিতরণ করে জনসচেতনতার পাশাপাশি মাস্কবিমুখ মানুষকে জরিমানা করা হচ্ছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জরিমানার পরিমাণ ৫০০ বা ১ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা হতে পারে। তবে সময় সাপেক্ষে তা কার্যকর করা হবে।

এদিকে গত ২২ নভেম্বর দুপুরে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হেলথ কার্ড বিতরণের এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, করোনাকালে দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালসহ কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো সেবাপ্রদান করছে। প্রধানমন্ত্রীর দিক-নির্দেশনায় করোনা মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ায় অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে মৃত্যু ও সংক্রমণের হার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে বর্তমানে জনগণ বেখেয়ালি হয়ে উঠেছে। তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে দেশবাসীকে অনুরোধ জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *