ক্রেতা সংকটে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বড় ধানের হাট

সারাবাংলা

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার মেঘনা নদীর ভিওসি ঘাটে বসা শতবর্ষী ধানের হাটকে দেশের পূর্বাঞ্চলের সবচেয়ে বড় হাট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। হাওরাঞ্চলে উৎপাদিত ধানের এ হাটে গড়ে এক লাখ মণ ধান বেচাকেনা হয়। তবে ধানের দাম বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ভারত থেকে বেসরকারি ভাবে চাল আমদানি করার খবরে ক্রেতা সংকটে পড়েছে প্রাচীন এই হাট। ধানের বেচাকেনা ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে বলে জানিয়েছেন হাট সংশ্লিষ্টরা। ভারতীয় চালের দাম পর্যবেক্ষণ না করে চালকল মালিকরা নতুন করে ধান কিনতে চাচ্ছেননা।

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের দেয়া তথ্যানুযায়ী, সরকারি ভাবে ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ৪ লাখ টন চাল আমদানি করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সরকারিভাবে আমদানিকৃত চাল দেশে আসা শুরু হয়েছে। এছাড়া বেসরকারি ভাবে আরও ১০ লাখ টন চাল আমদানির অনুমতি দিয়েছে সরকার। এসব চাল বাজারে আসলে চালের দর আরও কমবে।

জানা যায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ, সিলেট ও হবিগঞ্জ জেলার হাওরাঞ্চলে উৎপাদিত ধান ভিওসি ঘাটের হাটে বেচাকেনা হয়। কৃষকদের কাছ থেকে বেপারিরা ধান কিনে এনে এই হাটে বিক্রি করেন চালকল মালিকদের কাছে। মূলত মেঘনা তীরের এই হাটই আশুগঞ্জ উপজেলার চালকলগুলোতে ধানের যোগান দেয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় চালকল রয়েছে ৩শতাধিক। এর মধ্যে শুধুমাত্র আশুগঞ্জেই রয়েছে আড়াইশ চালকল।

প্রতিদিন নদীপথে অর্ধশত নৌকায় করে কৃষকের ধান হাটে নিয়ে আসেন বেপারিরা। ভোর থেকেই নদীর তীরে এক এক করে ভিড়তে থাকে ধানবোঝাই নৌকাগুলো। এরপর সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত চলে ধানের বেচাকেনা। প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষের আনাগোনা হয় ধানের এই হাটে। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন গড়ে অন্তত এক লাখ মণ ধান বেচাকেনা হয় হাটে।

তবে গত এক মাস ধরে হাটে ক্রেতা সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। এর কারণ হিসেবে ধানের দাম বৃদ্ধির কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ ধানের দাম বাড়লেও চালের দাম বাড়েনি। এছাড়া বেসরকারি ভাবে ভারত থেকে চাল আমদানির খবরেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ধানের বাজারে।

বেপারিরা জানায়, বর্তমানে প্রতিদিন হাটে ৬-৭টি নৌকা ধান নিয়ে আসছে। হাটে প্রতি মণ বিআর ২৯ জাতের ধান বিক্রি হচ্ছে ১৩৭০ থেকে ১৪০০ টাকায়, বিআর ২২ বিক্রি হচ্ছে ১১০০ টাকা ও বিআর ৪৯ জাতের ধান প্রতি মণ বিক্রি হচ্ছে ১২৮০ টাকা দরে। প্রত্যেক জাতের ধানের দাম গড়ে আড়াইশ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

আগে গড়ে ১ লাখ মণ ধান বিক্রি হলেও এখন হচ্ছে মাত্র ৫ হাজার মণ। এতে করে বেপারি ও চালকল মালিক উভয়ই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। মূলত ধানের দামের তুলনায় চালের দাম না বাড়ায় ধান কিনছেন না চালকল মালিকরা।

কিশোরগঞ্জে নিকলী উপজেলা থেকে আসা বেপারি ইয়াকুব মিয়া জানান, দীর্ঘ ২০ বছর ধরে এই হাটে ধান বিক্রি করে আসছেন। হাটের এমন খারাপ পরিস্থিতি আগে কখনো হয়নি। কৃষকদের কাছ থেকে বেশি দরে ধান কিনে এনে লোকসানে বিক্রি করতে হচ্ছে হাটে। ভারত থেকে চাল আমদানি করার খবরে চালকল মালিকরা এখন আর ধান কিনতে চাইছেন না।

চালকল মালিকরা বলছেন, বাজারে প্রতি মণ চাল বিক্রি হচ্ছে ২৫০০ টাকায়। এর ফলে এখনকার দরে ধান কিনে চাল তৈরি করে লোকসানে পড়তে হচ্ছে। প্রতি মণ শুকনা ধানে চাল হয় ২৩ থেকে ২৫ কেজি আর কাঁচা ধানে হয় ১৮ থেকে ২২ কেজি। শ্রমিকদের খরচসহ আনুষাঙ্গিক সকল খরচ মিটিয়ে চাল বিক্রি করে উল্টো লোকসান গুণতে হয়। এতে করে অধিকাংশ চালকল বন্ধ রাখা হয়েছে। কোনো কোনো চালকল মালিক শ্রমিকরা যদি চলে যান- সেই শঙ্কা থেকে লোকসান দিয়েও চালকল সচল রেখেছেন।

আশুগঞ্জ উপজেলার কামাউড়া এলাকার ছাত্তাহার অটোরাইস মিলের সত্ত্বাধিকারী হাবিব মিয়া বলেন, ধানের দর আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে, কিন্তু চালের দর বাড়েনি। চালের দর বাড়লে বেশি দরে ধান কিনলেও কোনো সমস্যা ছিলনা। ব্যবসায়ীরা এখন ভারতীয় চালের দিকে তাকিয়ে আছেন। ভারত থেকে আমদানি করা চাল বাজারে আসে চালের দাম আরও কমবে।

আশুগঞ্জ উপজেলার রজনীগন্ধা এগ্রো ফুডের সত্ত্বাধিকারী হাসান ইমরান বলেন, আগের কেনা ধান দিয়ে এখন গুটিকয়েক চালকল সচল রাখা হয়েছে। কারণ নতুন করে ধান কিনে চাল করতে গেলে লোকসান হয়। এছাড়া ভারত থেকে চাল আমদানির খবরে ধান ও চাল দুই বাজারই থমকে আছে।

আশুগঞ্জ উপজেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হেলাল শিকদার বলেন, বর্তমান দরে ধান কিনে আমাদের আমাদের লোকসান হচ্ছে। সেজন্য বাধ্য হয়ে ৮০ শতাংশ চালকল বন্ধ রাখ হয়েছে। যদি ভারত থেকে আমদানি করা চাল বাজারে আসে চলের দাম আরও কমবে। তখন ধানের দামও হয়তো কমবে। আমরা এখন সেই অপেক্ষায় আছি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সুবীর নাথ চৌধুরী জানান, নতুন বোরো ধানের আগমন হলে হয়তবা ধানের বাজার সহনশীল হবে। একাবারেই ক্রেতা নেই এটা এখন বলা যাবে না। নতুন ধান বাজারে আসলে ক্রেতা অব্যশই বাড়বে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *