কয়লা শ্রমিক থেকে কোটিপতি

সারাবাংলা

শামীম আহমদ তালুকদার, সুনামগঞ্জ থেকে : সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় এক সময়ের কয়লা শ্রমিক রিয়াজ উদ্দিন অল্প দিনে জিরো থেকে হিরো বনে যাওয়ায় জনমনে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তিনি শ্রমিক জীবনের শুরুতেই স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াতে ইসলামীর একজন সক্রিয় সদস্য হয়ে রাজনৈতিকভাবে যাত্রা শুরু করেন। অভিযোগ উঠেছে উপজেলার ট্যাকেরঘাট সীমান্তে চোরাচালান ও মাদক ও ভারতে অবাধেভাবে শ্রমিক পাঠিয়ে অবৈধ আয়ের মাধ্যমে রাতারাতি কোটিপতি হয়েছেন রিয়াজ উদ্দিন। অল্পদিনে কোটিপতি হওয়া নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে চলছে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার ঝড়। এরপর থেকে তিনি নিজেকে কয়লা ব্যবসায়ী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ও তামান্না এন্টারপ্রাইজ নামে এলসি লাইসেন্স করেন। তার প্রতিষ্ঠানের নামীয় লাইসেন্স দিয়ে এলসি মালামাল আমদানি এবং অন্যান্য পরিচিত লোকজনকে দিয়ে ভারত থেকে কয়লার এলসি শুরু করলেও থেমে যাননি তিনি। মরণ নাশক ইয়াবা ও হিরোইন চোরাইভাবে দেশের ভেতরে আমদানি করে থাকেন- এমন অভিযোগও উঠেছে। এক পর্যায়ে অদৃশ্য কিছু বিপদগামী শক্তির সঙ্গে তার সখ্যতা গড়ে উঠে। এভাবে অল্পদিনে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে যান রিয়াজ উদ্দিন। তাকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। তাহিরপুর সীমান্ত এলাকাগুলোতে সব অবৈধ কর্মকান্ডের সম্রাট হিসেবে ট্যাকেরঘাট চুনাপাথর কোম্পানীর আমদানিকৃত হাজার হাজার টন চুনাপাথর সংশ্লিষ্ট অফিসকে ম্যানেজ করে রাতের আঁধারে বিক্রি করে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। সীমান্ত এলাকায় চলছে রিয়াজ উদ্দিনের ত্রাসের রাজত্ব। তার একক আধিপত্য ও শক্তির কাছে যেন সবাই ছিল অসহায়। সু-কৌশলে কয়লার ব্যবসার অধিক মুনাফার কথা বলে কাছে টেনে নেন পার্শ্ববর্তী এলাকার লাকমা গ্রামের জসিম উদ্দিন, পুটিয়া গ্রামের জহির, কামড়াবন্দ গ্রামের আজিজুল হক, মাটিকাটা গ্রামের আব্দুল্লাহ আল-মাসুদ ও ভৈরবের রাশিদ মিয়াকে। পরবর্তীতে ব্যবসায়িক ব্যর্থতার মারপ্যাচে জসিম উদ্দিনের ত্রিশ লাখ, জহিরের লাখ লাখ, আজিজুল হকের ১ কোটি টাকা না দিয়ে অদৃশ্য এক শক্তির সহযোগিতায় মামলা মোকদ্দমার ভয় দেখিয়ে তাদের ব্যবসায়ীক অংশীদারিত্ব থেকে বের করে দেন। রিয়াজ উদ্দিনের ভাগ্য আকাশে দেখা দেয় নতুন চাঁদ। এরই মধ্যে ভৈরবের রাশিদ মিয়া টাকা না পাওয়ার শোকে স্টোক করে মৃত্যুবরণ করেন। অনায়াসে রাশিদ মিয়ার পুঁজির এক কোটি টাকা রিয়াজ উদ্দিনের কাছে। রিয়াজ উদ্দিনের বিরুদ্ধে অন্তহীন অভিযোগ, ব্যবসা বাণিজ্যের বাহানা করে রাখেন মাটি কাটার আব্দুল্লাহ আল-মাসুদকে। রিয়াজ উদ্দিনের পরামর্শে মাসুদ আর রিয়াজ উদ্দিন যৌথভাবে বাদাঘাট বাজারের পাশে কামড়াবন্দ গ্রামে ২২.৭৬ শতক জমি কিনে তৈরি করেন তিনতলা ভবন। এই ভবনেই রিয়াজ উদ্দিন পূর্ব পরিকল্পিতভাবে গভীর ষড়যন্ত্র করে মাসুদের নামে ইসলামী ব্যাংক, সুনামগঞ্জ শাখা থেকে এক কোটি পঁচিশ লাখ টাকা টিআর ঋণ তোলেন। ব্যাংক থেকে টাকা তোলার পর রিয়াজ উদ্দিন বাষট্টি লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা তার ব্যক্তিগত ব্যবসার কাজে নিলেও বাকী টাকা দিয়ে সুনামগঞ্জ শহরের হাসপাতালের পাশে তিনগুণ মুনাফার কথা বলে ২০ শতক জমি কিনে মাসুদের দলিল করে দেন। কিছুদিন পর মাসুদ সুনামগঞ্জ শহরে কেনা জমি দেখতে গিয়ে ভ‚মির মূল মালিকের সঙ্গে পরিচয় হয়। প্রসঙ্গে ক্রমে মাসুদ জমির বিক্রয়মূল্য জানতে চাইলে ভ‚মি মালিক জানান প্রতি শতকের মূল্য ত্রিশ হাজার টাকা। এ কথা শুনেই মাসুদের মাথায় হাত। এই জমি কেনার জন্য মাসুদ ছেষট্টি লাখ টাকা রিয়াজ উদ্দিনকে বুঝিয়ে দেন। এরপর রিয়াজ উদ্দিনের সঙ্গে চলাফেরা থেকে বিরত থাকার সিন্ধান্ত নেন মাসুদ। এই বিষয়ে রিয়াজ উদ্দিন কোনো সঠিক জবাব দিতে না পারায় তাদের মধ্যে শুরু হয় ব্যাপক অন্তর দ্ব›দ্ব। এ অবস্থায় শুরু হয় রিয়াজ উদ্দিনের প্রতিক্রিয়া। প্রথম দিকে মাসুদকে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার কুরবান নগর ইউনিয়নের মেসার্স আজিজ বিক্স এর পার্টনারশীপ থেকে মাসুদের পুঁজির টাকা ফেরৎ না দিয়ে তাকে বের করে দেওয়া হয়। দ্বিতীয় ধাপে বাদাঘাট বাজারের পাশে কামড়াবন্দ গ্রামের তিনতলা ভবন বাসা থেকে মাসুদকে স্বপরিবারে বের করে দেওয়া হয়। অভিযোগ উঠেছে রিয়াজ উদ্দিন ঠান্ডা মাথায় দুষ্ট চক্রের সাহায্য নিয়ে মাসুদের নামে গত বছরের ৪ জানুয়ারি মাদারীপুর জেলা থেকে মাদক মামলার ভুয়া সাঁজা ওয়ারেন্ট ইস্যু করে তাহিরপুর থানা পুলিশ দিয়ে মাসুদকে গ্রেফতার করানো হয়। ভুয়া ওয়ারেন্ট নিয়ে সর্বমহলে জানাজানি ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়।

এই ওয়ারেন্ট মামলা থেকে মাসুদ নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে বাড়িতে আসার পর রিয়াজ উদ্দিন আবারও মাসুদের নামে ঢাকা ওয়ারী থানায় সিআর ৯০৫২/১৮ নং মামলার কোর্ট প্রসেস নম্বর ৯৯/২০২০ইং ধারা ১৪৩/১৪৪/১৪৮/১৪৯/১৫১/৩২৩/৩২৬/৩০৭ দিয়ে ঢাকা জেলা থেকে ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা তাহিরপুর থানায় নিয়ে আসেন। পরে চলচাতুর রিয়াজ তাহিরপুর থানা পুলিশ দিয়ে মাসুদকে গ্রেফতার করতে চাইলে মাসুদ এ ওয়ারেন্ট ভুয়া দাবি করে তাহিরপুর সার্কেলের এএসপি বাবুল আক্তারের শরনাপন্ন হন। সার্কেল এসপি ওয়ারেন্টের কাগজপত্র তদন্ত সাপেক্ষে যাচাই-বাছাই করে ওয়ারেন্টটি ভুয়া প্রমাণিত হলে মাসুদকে গ্রেফতার না করে বিনা গ্রেফতারে ভুয়া ওয়ারেন্ট তামিল করেন। ভুয়া ওয়ারেন্ট সংক্রান্ত বিষয়ে মাসুদ সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে রিয়াজ উদ্দিনের বিরুদ্ধে একই বছরের ১৭ আগস্ট সুনামগঞ্জ তাহিরপুর জোন আদালতে মামলা দায়ের করেন, যার মামলা নং ৮৮/২০। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর জোনের বিজ্ঞ আদালত মামলাটি তদন্ত সাপেক্ষে আমলে নিয়ে গ্রেফতারকৃত আসামি রিয়াজ উদ্দিনকে আদালতে হাজির করা হলে বিজ্ঞ বিচারক তার জামিন না মঞ্জুর করে জেলহাজতে পাঠানো নির্দেশ দেন।

রিয়াজ উদ্দিন জেল থেকে বের হয়ে শুরু করেন নতুন অপকৌশল। ব্যবসায় অংশীদারিত্ব থাকা অবস্থায় রিয়াজ উদ্দিনের কাছে জমাকৃত কামড়াবন্দ গ্রামের আজিজুল হকের ও মাটিকাটা গ্রামের মাসুদের স্বাক্ষর করা ব্যাংকের একাধিক ব্যাংক চেক দিয়ে রিয়াজ উদ্দিন নিজে ও তার অন্য লোক দিয়ে ইচ্ছামত টাকার অংক বসিয়ে আইনি নোটিশ আর চেক ডিজঅনারের মামলা করেন। রিয়াজ বারহাল গ্রামের মুলু হোসেনকে দিয়ে পঁয়তাল্লিশ লাখ টাকার মামলা দায়ের করেন আজিজুল হকের নামে। অথচ মামলার বাদি মুলু হোসেন সরকারি রিলিফএর চাল খেয়ে জীবন-যাপন করেন। তাহিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অমল কান্তি করকে দিয়ে বাইশ লাখ টাকার ও রিয়াজ উদ্দিন নিজে আজিজুল হকের নামে সতেরো লাখ টাকার মামলা করেন। অপরদিকে আজিজুল হক তার পাওনা টাকা আদায়ের জন্য রিয়াজ উদ্দিনের নামে বহু আগেই চুয়াল্লিশ লাখ টাকার মামলা করেছেন সুনামগঞ্জ আমল গ্রহণকারী আদালতে। সেই মামলা এখনও আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। মাসুদের নামে নরসিংদী জেলার বেলাব উপজেলার রিয়াজ উদ্দিনের আত্মীয় শাহ আলম নামের এক লোক দিয়ে আরও নব্বই লাখ টাকার চেক ডিজঅনার মামলা এবং তার শ্যালক ভাদেরটেক গ্রামের উজ্জলকে দিয়ে দশ লাখ টাকার মামলা রুজু করান রিয়াজ।

রিয়াজ উদ্দিনের প্রধান উপদেষ্টা স্বপন কুমার দাস বিজ্ঞ আদালতের সীলমোহর ও পুলিশ বিভাগের সবোর্চ্চ কর্মকর্তার সীলমোহর সহ র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হন। তিনি গ্রেফতারের আগে রিয়াজ উদ্দিন নারী সংগঠিত বিষয়ে ট্যাকেরঘাটের পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন পুলিশ কর্মকর্তা ইমাম হোসেনের কাছে গ্রেফতার হলে স্বপন কুমার দাস সু-কৌশলে মোটা অংকের টাকা দিয়ে রিয়াজ উদ্দিনকে ছাড়িয়ে নেন। স্বপন কুমার দাস গ্রেফতার হওয়ার পর রিয়াজ উদ্দিনকে টাকার দাপট দেখিয়ে কৃষকলীগের ব্যানারে বাদাঘাট বাজারে জনসভায় মঞ্চে উঠেন। এভাবেই এক সময়কার রিয়াজ উদ্দিনের ব্যবসায়ীক অংশীদারকে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধামকি দেওয়া সহ বিভিন্ন ধরনের মিথ্যা মামলায় জড়ানোর পাঁয়তারা করছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

এ বিষয়ে অভিযোগকারী ও মামলার বাদী মো. আব্দুল্লাহ আল মাসুদ জানান, আমি সরল বিশ্বাসে রিয়াজ উদ্দিনের সঙ্গে ব্যবসায়ীক অংশীদার হয়েছিলেন। আমার ব্যবসার সবগুলো টাকা রিয়াজ উদ্দিনের পকেটে। তিনি আরও বলেন, ব্যাংক ঋণের জ্বালায় পথে পথে ঘুরে বেড়ালেও দেখার যেন কেউ নেই। উল্টো রিয়াজের একেক সময় মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে আমাকে ফাঁসানোর ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। অভিযুক্ত মো. রিয়াজ উদ্দিন তার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ অস্বীকার করলেও প্রতিপক্ষ আব্দুল্লাহ আল মাসুদ তার ব্যবসায়ীক অংশীদার ছিলেন জানান। তিনি আরও বলেন, মাসুদ সহ তাহিরপুরের বাদাঘাট বাজারে অংশিদারিত্বে জমি কেনেন। সুনামগঞ্জ জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সাহেব আলী পাঠান জানান, রিয়াজ এবং আব্দুল্লাহ আল মাসুদের মধ্যে বাদাঘাটের একটি বাড়ি নিয়ে বিরোধের অংশ হিসেবেই বিষয়টি তদন্তের প্রয়োজনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। পুলিশ বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *