গোল্ডেন জিপিএ-৫ প্রাপ্ত হতদরিদ্র সুমাইয়া ॥ বাড়িতে এলেন চীফ হুইপ জরাজীর্ণ বাড়িতে আধুনিকতা

সারাবাংলা

ফয়েজ চৌধুরী, শিবচর থেকে
এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জনের পরও হতদরিদ্র পিতৃহীন সুমাইয়াসহ তার পরিবারের সদস্যদের চোখ ভরা ছিল জল। জরাজীর্ণ ঘরটিই জানান দিচ্ছিল ভালো ফলাফল করেও অর্থনৈতিক কষ্টে লেখাপড়াই বন্ধের উপক্রম। সংবাদ মাধ্যমে বিষয়টি জেনে স্থানীয় সংসদ সদস্য চীফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী তাৎক্ষণিকভাবে ওই বাড়িতে মিষ্টি পাঠান। মুঠোফোনে কথা বলে লেখাপড়ার যাবতীয় দায়িত্ব নেন। আশ্বাস দেন নিজ অর্থে বাড়িটি সংস্কারের। সেই বাড়িটিই সংস্কার শেষে এখন টাইলস সমৃদ্ধ, সম্পূর্ণ পাকা ঘর। গত শুক্রবার সকালে চীফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী অদম্য মেধাবী সুমাইয়ার বাড়িতে আসেন। খোঁজ নেন লেখাপড়ার। লেখাপড়া চালিয়ে যেতে দেন নির্দেশনা ও আশ্বাস। মাদবরচরে শেখ জামাল সেতু ও ফজলুল করিম বেপারি সেতু ও পৌরসভায় একটি মসজিদ উদ্বোধনসহ হাজারো ব্যস্ততার মধ্যে একজন দরিদ্র অদম্য মেধাবীর জন্য চীফ হুইপের এমন মানবিক আচরনে বিমুগ্ধ এলাকাবাসী। চীফ হুইপের এই উদ্যোগ দেশের জনপ্রতিনিধি ও নেতাদের জন্য শিক্ষামূলক বলে দাবি শিক্ষক সমাজের।
সরেজমিনে জানা যায়, পেশায় দর্জি দেলোয়ার হোসেন শ্বশুরের দেওয়া জমিতে গত ৭ বছর আগে মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার মাদবরচর ইউনিয়নের সাড়ে এগার রশি লপ্তিকান্দি গ্রামে বসবাস শুরু করেন। সংসার চালাতে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে দর্জির কাজ করে কষ্টে চলছিল তাদের পরিবার। ৭ বছর আগে অসম্পূর্ণ ঘর রেখেই শ্বাসকষ্টে দেলোয়ারের মৃত্যু হয়। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম স্বামীকে হারিয়ে চারদিকে অন্ধকার দেখেন মা সালেহা বেগম। নিজে ঘরে বসে দর্জি কাজ শুরু করেন। বড় মেয়ে তাসলিমা কেজি স্কুলে চাকরি করে মার সঙ্গে সঙ্গে সংসারের হাল ধরেন। মেয়ে জামাইদের আর্থিক সহায়তায় কোনমতে চালিয়ে যাচ্ছেন সংসার। অর্থাভাবে ২ মেয়েকে বিয়ে দিতে হয় অল্প বয়সেই। ৬ মেয়ের সর্ব কনিষ্ঠ সুমাইয়া ফারহানা। আর্থিক অনটনের সংসারে সুমাইয়ার লেখাপড়া চালিয়ে নেবার সাহস প্রথমত অবস্থাতে না হলেও লেখাপড়ার প্রতি ওর প্রবল টান থাকায় বোনদের সহায়তায় লেখাপড়া চালিয়ে যায়। ৫ম ও ৮ম শ্রেনীতে জিপিএ-৫ সহ টেলেন্টপুলে বৃত্তি পায়। সুমাইয়ার পরিবারের অসহায়ত্বের কথা জেনে বিদ্যালয় শিক্ষক কর্তৃপক্ষও তাকে নিয়মিত খাতা, কলম, বই দিয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। প্রাইভেট পড়িয়ে কোন শিক্ষকও নেয়নি তার কাছ থেকে কোন টাকা। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে নিয়মিত বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা করে। চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অংশ গ্রহন করে সুমাইয়া। পরীক্ষার ফলাফলে জিপিএ-৫ গোল্ডেন অর্জন করে সে। এই অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করেও ভবিষ্যতে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া নিয়ে শঙ্কিত ছিল তার পরিবার। চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন বুকে ধারন করা পিতৃহীন সুমাইয়ার চোখে এখন নিয়ে ছিল হতাশার ছবি। চিকিৎসক তো অনেক দূরের কথা ভালো কলেজে ভর্তি হওয়া নিয়েই ছিল সংশয়। সুমাইয়ার খবরটি জানার পর স্থানীয় সংসদ সদস্য চীফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী ওই রাতেই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করে খবর নেন। পরদিন সকালেই চীফ হুইপ সুমাইয়ার বাড়িতে মিষ্টি পাঠান। দুপুর ১২টার দিকে চীফ হুইপ ফোন দিয়ে সুমাইয়া তার মা, বড় বোন ও স্কুল শিক্ষকসহ নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি সুমাইয়া ও তার পরিবারের কাছে লেখাপড়া চালিয়ে যেতে কি কি প্রতিবন্ধকতা ও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে তা জানতে চান। তিনি লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পাশে থাকার আশ্বাস দেন। তাদের পলেস্তারবিহীন ঘর সংস্কার করে ফ্লোর টাইলস, দরজাসহ সুপেয় জলের ব্যবস্থার তাৎক্ষণিক নির্দেশনা দেন।
এছাড়া তার নির্দেশনায় জেলা পরিষদ থেকে সেলাই মেশিন, বৃত্তি ইউপি চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে স্মার্টফোনের ব্যবস্থা করে দেন। সেই বাড়িটির সম্পন্নর পর গত শুক্রবার চীফ হুইপ সুমাইয়ার বাড়িতে যান। দরিদ্র পরিবারের অদম্য মেধাবীর বাড়িতে চীফ হুইপের আগমনকে কেন্দ্র করে অত্র অঞ্চলের শিক্ষার্থী শিক্ষক অভিভাবকদের মধ্যে প্রান চাঞ্চল্য দেখা দেয়। গত শুক্রবার চীফ হুইপ সুমাইয়ার বাড়িতে গেলে পরিবারের সদস্যরা তাকে মিষ্টি মুখ করান। চীফ হুইপ তার অর্থায়নে গড়ে দেয়া বাড়ি ঘুরে দেখেন। নির্দেশনা দেন শিক্ষা জীবন নিয়ে।
সুমাইয়ার বড় বোন তাসলিমা আক্তার বলেন, সুমাইয়া অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া করেছে। ও ভালো ফলাফল করলেও অভাবের কারণে কলেজে পড়া নিয়েই অনিশ্চয়তা ছিল। ফলাফলের পর এই সংবাদ পেয়ে চীফ হুইপ ওর কলেজ ভর্তিসহ লেখাপড়ার সব ব্যবস্থা করে দিয়েছে। সে আমাদের জরাজীর্ণ ঘরটিও টাইলস করে সংস্কার করে দিয়েছে। আমার বোনের ফলাফলের কারণেই আজ সে আমাদের বাড়ি এসেছে। আমরা গর্বিত। স্বপ্নেও কোনদিন ভাবিনি এমন দিন আমাদের পরিবারে আসবে।
অদম্য মেধাবী সুমাইয়া বাকরুদ্ধ কন্ঠে বলেন, লেখাপড়াই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কলেজে ফর্ম কেনার মতো সামর্থ্যও ছিল না। এমন সময় চীফ হুইপ স্যার সংবাদ পেয়ে ম্যাজিকের মতো সব পাল্টে দিল। কলেজে ভর্তির সব খরচ দিয়েছে। বাড়ি টাইলস করে পাকা করে দিয়েছে। বাড়িতে আসার রাস্তাও পাকা হয়ে গিয়েছে। সবই স্বপ্নের মতো হয়ে গেল। স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. সামসুল হক বলেন, হতদরিদ্র অদম্য মেধাবীর পরিবারের প্রতি এমন মানবিক আচরণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক প্রাণ চাঞ্চল্যর সৃষ্টি করেছে। চীফ হুইপের ম এমন দৃষ্টান্ত সারাদেশের সকল জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের অনুসরণ করা উচিত।
চীফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী এমন সংবাদের জন্য সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, বঙ্গবন্ধুই বলেছিলেন সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ গড়তে হবে। অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মানব সম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে সোনার মানুষ গড়ে তোলার লক্ষ্যেই আমরা সুমাইয়ার পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছি। সবাইকে এ ধরনের অদম্য মেধাবীদের পাশে থাকার আহ্বান জানান তিনি।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *