গৌরীপুরে ভিজিডির চাল বিতরণে অনিয়ম

সারাবাংলা

ওবায়দুর রহমান, গৌরীপুর থেকে : ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর উপজেলার ডৌহাখলা ইউনিয়নে ভিজিডি কর্মসূচির চাল ওজনে কম দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রতি বস্তায় ৩০ কেজি চাল থাকার কথা থাকলেও সেই বস্তায় রয়েছে ২৬ কেজি (প্রায়)। বর্তমানে ৩৪৩ জনের পুরো দুই মাসের চাল দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া ৪ মাস বা ৫ মাসের চাল পায়নি অনেক সুবিধাভোগীরা। প্রতি মাসে যেগুলো পেয়েছে তাতেও ৭ থেকে ৮ কেজি করে কম দেওয়া হয়েছে। চাল কম দেওয়ার প্রতিবাদ করলে ধমক দিয়ে বের করে দেয় সুবিধাভোগীদের। সত্যতা যাছাইয়ে গত ২৮ ডিসেম্বর সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ওই ইউনিয়ন পরিষদে সুবিধাভোগীদের মধ্যে চাল বিতরণ করা হচ্ছে, কিন্তু ওজনে কম। নেই তদারকি কর্মকর্তা, এনজিও প্রতিনিধি, ইউপি সচিব এমনকি ইউপি চেয়ারম্যানও। সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে চাল নিতে আসা উপকারভোগীদের তাড়িয়ে দেন ইউপি সদস্য আবুল কালাম। পরে সেখানে অন্তত ৩০ জন সুবিধাভোগী নারীর সঙ্গে কথা বললে তারা সবাই ভিজিডির চাল কম দেওয়ার এই অভিযোগ করেছেন।

ডৌহাখলা ইউনিয়নের উপকারভোগী নাজনীন বেগম বলেন, হুনছি চাউল দিব ৩০ কেজি, কিন্তু আমরা তো পাই ২৫-২৬ কেজি। অন্য আরেক উপকারভোগী রবিলা বেগম জানান, এইবার ২ বস্তা দিছে, ২৬ কেজি কইরা অইছে, আরও ২ বস্তা বাকি রইছে। আরেকজন সুবিধাভোগী রোকেয়া বেগম বলেন, লেহ্যা আছে ৩০ কেজি, মাইপ্পে দেহি ২৫ কেজি চাউল। কেউ কেউ তো ৭-৮ কেজি কমের অভিযোগ তোলেন। সত্যতা নিশ্চিত করতে উপকারভোগীরা একটি ডিজিটাল মিটার নিয়ে আসেন পরিষদের গুদামে। ইউপি সদস্য আবুল কালাম এবং ২০/২৫ জন উপকারভোগীদের সামনে ওজন দেওয়া হলে দেখা যায় প্রতি বস্তায় ৪/৫ কেজি চাল কম রয়েছে। এ বিষয়ে ডৌহাখলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শহিদুল হক সরকার জানান, গৌরীপুর খাদ্যগুদাম থেকে কম ওজনের ওই বস্তা সরবরাহ করা হয়েছে। এ বিষয়ে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা বিপ্লব সরকার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ভিজিডির চালের বস্তায় চাল কম হওয়ার কথা না। আমরা প্রতি বস্তায় ৩০ কেজি বুঝিয়ে দেই। তারাও আমাদের কাছ থেকে বুঝে নেয়। গুদাম থেকে বের হওয়ার পরে চাল কম হলে আমাদের কিছু করার নেই। বকেয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ২০২০ সালের কোনো চাল আমাদের কাছে বকেয়া নেই। আমরা চেয়ারম্যানদের কাছে হস্তান্তর করেছি। যদি তারা না দিয়ে থাকে এতে আমাদের কোনো দায়ভার নেই। এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান মারুফকে অনিয়মের বিষয়ে অবহিত করা হলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে ওই ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে পরিদর্শন করেন। এসময় উপস্থিত ছিলেনÑ উপজেলা নারী বিষয়ক কর্মকর্তা সুলতানা বেগম আকন্দ, ইউপি চেয়ারম্যান শহিদুল হক সরকার, ৩নং অচিন্তপুর ইউপি চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলাম অন্তর প্রমুখ। পরে তিনি ডৌহাখলা (ইউপি) চেয়ারম্যান শহিদুল হক সরকার সঙ্গে একান্ত বৈঠক করেন। গত ৪ জানুয়ারি সবার উপস্থিতিতে ওজনে কম হওয়া চালসহ বাকী দুই মাসের চাল বিতরণ করা হবে বলে জানান। নারী বিষয়ক কর্মকর্তা সুলতানা বেগম আকন্দ এসময় চালের বস্তা দেখেই বলেন ‘বস্তা দেখেই বুঝা যাচ্ছে বস্তায় চাল কম আছে’ কথাটি বললেও নীরব ছিল সবাই। পরে পরিষদের সামনে এসে সবার সামনে সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বলেন, আগামী সোমবার (গত ৪ জানুয়ারি) চাল বিতরণ করা হবে। এসময় সাংবাদিকদের জানিয়ে দেন তারা। পরে তাদের দেওয়া তারিখ মতো গত সোমবার সকালে ডৌহাখলা ইউনিয়ন পরিষদে গণমাধ্যমকর্মীরা গিয়ে দেখতে পায় উপকারভোগীরা দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু চাল দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। দেখা যায়, ইউপি সচিব তার কক্ষের ভেতর কাগজপত্র দেখছেন তার কাছে গিয়ে চাল বিতরণের কথা জানতে চাইলে তিনি জানান, আমিও শুনেছিলাম চাল দেবে। আপনারা চেয়ারম্যানকে বলেন এই কথা বলে চৌকিদার দিয়ে পরিষদে তালা ঝুলিয়ে চলে যান। চাল দেওয়ার বিষয়ে ইউপি চেয়ারম্যান শহিদুল হক সরকারের কাছে জানতে চাইলে মুঠোফোনে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে তদারকি কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান জানান, আমি নাম মাত্র ট্যাগ কর্মকর্তা বড় ঈদের পরে চাল বিতরণের বিষয়ে আমাকে কোনোদিন জানানো হয়নি। এ বিষয়ে উপজেলা নারী বিষয়ক কর্মকর্তা সুলতানা বেগম আকন্দ জানান, নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে ভিজিডি কর্মসূচির আওতায় গৌরীপুর উপজেলায় ৩ হাজার ২৬ জন দুস্থ নারী এই সুবিধা পাচ্ছেন। এর মধ্যে ডৌহাখলা ইউনিয়নে ৩ শত ৪৩ জন সুবিধাভোগী রয়েছেন। প্রত্যেক সুবিধাভোগী প্রতি মাসে ৩০ কেজি করে চাল সহায়তা পাচ্ছেন। এসব সুবিধাভোগী নারীকে প্রতি মাসেই ৩০ কেজি করে চাল দেওয়ার পরে নালী বিষয়ক কর্মকর্তা বরাবরে মাস্টার-রোল জমা দেওয়ার নিয়ম থাকলেও আজ পর্যন্ত কেউ জমা দেয়নি চেয়ারম্যানরা নিজেদের ইচ্ছামত চালিয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান মারুফের কাছে মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি জানান, ওজনে কম দেওয়া ও বকেয়া চাল সহ বিতরণের জন্য চেয়ারম্যানকে বলা হয়েছে, যদি না দেওয়া হয় তাহলে আইনানুগ ব্যবস্থ্যা নেওয়া হবে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *