গ্লোবের ভ্যাকসিন গবেষণায় সাফল্য দাবি প্রশ্নবিদ্ধ

জাতীয়

নিজস্ব প্রতিবেদক:
মহামারি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে কার্যকরী ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বিশ্বের বেশ কয়েকটি রাষ্ট্র এবং তাদের প্রতিষ্ঠিত গবেষণা সংস্থাসমূহ। যার ধারাবাহিকতায় এক পর্যায়ে নিজেস্ব গবেষণালব্ধ প্রক্রিয়া অনুসরনে, দেশীয়ভিত্তিতে কোরোনা প্রতিরোধক ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ করে গ্লোব বায়োটেক।

গণমাধ্যমে দেয়া এক আবেগআপ্লুত বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের এই সম্ভাব্যতার বিষয়ে বিস্তারিত নানা তথ্যও জানানো হয়। বিষয়টি ব্যাপক আলোড়োন সৃষ্টি করে গোটা দেশব্যাপী। করোনা সংক্রমণ থেকে বেঁচে যাওয়া নয় বরং বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে বিশ্বমানবতার এমন ক্রান্তিলগ্নে অনন্য অবদান রাখার সক্ষমতা অর্জনের পথে দেশের একটি প্রতিষ্ঠান; বিরল এই অর্জনের সম্ভভাব্যতাই বেশি আবেগতাড়িত করেছিলো দেশের কোটি মানুষকে।

পরবর্তীতে নিজেদের এই গবেষণার অগ্রগতি সম্পর্কে বিভিন্ন সময় ইতিবাচক তথ্যও জানায় গ্লোব। দাবি করা হয় ভ্যাকসিনের অ্যানিমেল টেস্টিংয়ের সাফল্যের কথাও। এক পর্যায়ে গত ১ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক ‘জার্নাল’ তাদের ওয়েবসাইটে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান গ্লোব বায়োটেকের করোনা ভ্যাকসিন ‘ব্যানকোভিড’-এর সম্ভাব্য সাফল্যের কথা তুলে ধরে তাদের ভ্যাকসিনের গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে বলে জানায়। সেইসাথে তারা তৃতীয় ধাপের ট্রায়ালের জন্যও প্রস্তুত রয়েছে বলেও দাবি করে প্রতিষ্ঠানটি। যার প্রেক্ষিতে দেশের বহু সুপ্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমে সেই সংবাদও প্রকাশিত হয়।

কিন্তু গ্লোব বায়োটেকের দাবিকৃত জার্নাল ‘বায়োআর্কাইভ’ এবং তাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনের বিস্তারিত তথ্য ও গ্রহণযোগ্যতা যাচাইয়ে তাদের ওয়েবসাইটে খোঁজ করতেই জানা যায় আশাহত হবার মত তথ্য! নিজেস্ব ওয়েবসাইটের ফ্যাক্ট কোয়েশ্যিনিং (তথ্য-সত্যতা যাচাই) অংশে দাবি তারা নিজেরাই দাবি করছে যে, এটি কোন জার্নাল নয় বরং তারা

বায়োআর্কাইভ বলছে, তাদের সার্ভারে গবেষণাপত্রগুলো কোনো ধরনের ‘পিআর রিভিউ’ (Peer Review- উচ্চ পর্যায়ের স্বীকৃত কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার গবেষণাভিত্তিক অনুসন্ধানের প্রেক্ষিতে চালানো পর্যকালোচনা) ছাড়াই প্রকাশিত হয়। বায়োআর্কাইভের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, বিশ্বের যে কোনো অঞ্চলের গবেষকদের অনুসন্ধানে এমন বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে যা সাম্প্রতিক কোনো উদ্ভাবনী কাজে সহায়ক হতে পারে। তাছাড়া এমন বহু সম্ভাবনাময় গবেষণাপত্রসমূহ যেন সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের নজরে পড়ে এবং তাতে বিদ্যমান ভুল-ত্রুটিগুলো সংশোধন করা যায়। সেক্ষেত্রে বায়োআর্কাইভে জমাকৃত অনুসন্ধানমূলক গবেষণা পত্রগুলো সন্নিবেশিত থাকলে তা খুঁজে নিয়ে কাজে প্রয়োগ করার ব্যাপারটি সহজতর হবে। অর্থাৎ সম্ভাবনাময় তথ্য সংগ্রাহক হিসেবে একটি আর্কাইভ প্রতিষ্ঠা করাই তাদের মূল লক্ষ্য। তবে তাতে প্রকাশিত কোনো পর্যায়ের গবেষণাপত্র গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচ্য নয়।

শুধু তাই নয়, বায়োআর্কাইভ তাদের সাইটে প্রকাশিত কোনো আর্টিকেলকে কোনো কাজের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ধরে নিয়ে সে প্রসঙ্গে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন করতেও নিরুৎসাহিত করেছে।

সুতরাং, বায়োআর্কাইভে প্রকাশিত হওয়ার কারণে গ্লোব বায়োটেকের করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে কোনো ধরনের বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার সুযোগ একেবারেই নেই। এটি নিতান্তই একটি প্রাথমিক ধাপ মাত্র। কিন্তু গ্লোব বায়োটেক এটিকে ‘জার্নাল’ দাবি করে কার্যত নিজেদের গবেষণা কাজের স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠার এমন প্রহসনমূলক প্রচারণা চালানোর পাশাপাশি ভ্যাকসিনের তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল চালানোর ব্যাপারে যে ঘোষণা দিয়েছে তা কোটি বাংলাদেশির আস্থার চরম অবমাননাই বলা চলে। করোনা ভ্যাকসিনের মত একটি স্পর্শ কাতর বিষয় নিয়ে স্বনামধন্য এই প্রতিষ্ঠানটির এমন প্রচারণা সত্যিই বিস্ময়কর! বাস্তবতা হচ্ছে, স্বীকৃত কোনো সংস্থার অধীনে অনুসন্ধানী পর্যায়েও এখনো পৌঁছতে পারেনি গ্লোব বায়োটেকের ভ্যাকসিন বিষয়ক গবেষণা পত্র। এমন কয়েক লাখ নথির স্তূপ জমে আছে বায়োআর্কাইউভের ওয়েবসাইটে। যেগুলো বাস্তবায়িত হবার ক্ষেত্রে নুন্যতম স্বীকৃতি অর্জনের পর্যায়েও পৌঁছায়নি।

তবে সত্যিই যদি এর প্রেক্ষিতে তৃতীয় ধাপের ট্রায়াল পরিচালনার সু্যোগ সৃষ্টি হতো তাহলে সেটি কোন পর্যায়ের বিপত্তি সৃষ্টি করতো এবং এর ফলে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশকে কতটা লজ্জায় পড়তে হতো, সে বিষয়গুলো প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের বিবেচনাধীন থাকলো।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *