ঘরে ঘরে টিকা দেওয়ার নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালু করুন

মতামত

শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ মহামারি মোকাবেলায় সাফল্যের ধারাবাহিকতায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার নাগরিকদের কোভিড-১৯ ভাইরাসের মারাত্মক সংক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য দেশের সকল নাগরিককে বিনামূল্যে টিকা সরবরাহের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সফলতার পরিচয় দেখিয়েছে।

খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পাশাপাশি টিকা ক্রয়ের ব্যবস্থা করে দেশের নাগরিকদের টিকা প্রদান প্রক্রিয়া শুরু করেছে। যেখানে এখন পর্যন্ত পৃথিবীর ১৩৫ টি দেশ তাদের নাগরিকদের জন্য টিকার ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়নি, সেখানে বাংলাদেশ সরকার টিকা প্রদান শুরু করেছে কয়েক সপ্তাহ আগে। সুতরাং, বর্তমান সরকার এই ক্রান্তিকালে টিকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে যোগ্যতা প্রদর্শন করায় প্রশংসার দাবিদার।

৭ ফেব্রুয়ারি সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে দেশব্যাপী এই টিকাদান প্রক্রিয়া শুরু করে। প্রথমদিকে, সরকার বিভিন্ন ফ্রন্টলাইন কর্মীদের পাশাপাশি ৫৫ বছরের বেশি বয়সী জনগণকে টিকা সরবরাহের সিদ্ধান্ত নেয়। সরকার টিকা দেওয়ার জন্য নাগরিকদের নিবন্ধনের জন্য একটি ওয়েবসাইট তৈরি করেছে। তবে, টিকা প্রদানের প্রাথমিক পর্যায়ে নিবন্ধনের গতি কিছুতা শ্লথ হওয়ার কারণে তারা বয়সসীমা ৪০ বছরে নামিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তার পর থেকে দেশে টিকা গ্রহণকারী মানুষের বেড়েছে। টিকা প্রদান প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পরে, দেশের অনেক মানুষ টিকা গ্রহণ করবেন কিনা সে সম্পর্কে বিভ্রান্ত রয়েছেন। বিভিন্ন ধরনের সামাজিক বাধার পাশাপাশি টিকা সম্পর্কে গুজব-ছড়ানো গোষ্ঠি নেতিবাচক তথ্য প্রচার করছে। অতএব, টিকা গ্রহণ করবেন কিনা সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে অনেকেই দ্বিধা নিয়ে সময় পার করছেন।

অনুঘটকদের আরও কার্যকর নীতিমালা প্রস্তুত করতে হবে। এর সাথে, উৎসাহমূলক তথ্য প্রচারের পাশাপাশি সরকার ঘরে ঘরে টিকা দেওয়ার নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। আমাদের দেশের গণ টিকা প্রদানের ক্ষেত্রে অসাধারণ সাফল্য অর্জনের পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে। সুতরাং, স্থানীয় পর্যায়ে এবং শহরগুলোতে রাস্তায় এবং বস্তিতে বসবাসকারী মানুষদের ঘরে ঘরে গিয়ে নিবন্ধন এবং টিকা দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত মানবসম্পদ রয়েছে। 

কয়েক সপ্তাহ ধরে টিকা দেওয়ার প্রক্রিয়াটি পর্যবেক্ষণ করে আমি অনুভব করেছি যে টিকা গ্রহণের ক্ষেত্রে গ্রামীণ ও শহুরে অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে এখনও যথেষ্ট ব্যবধান রয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে জানা গেছে যে শহরগুলোতে টিকা গ্রহণের হার এখনও বেশি, যেটি টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে নগর অঞ্চলের মানুষের আগ্রহের প্রতিফলন ঘটায়। এমনকি পুরুষদের তুলনায় টিকা গ্রহণকারী নারীদের অনুপাত তুলনামূলকভাবে কম কারণ এখন পর্যন্ত পুরুষের তুলনায় টিকা গ্রহণকারী নারীর সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশ বলে সংবাদপত্র সূত্রে জানা গেছে।

এখন একটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্নটি হল, গ্রামাঞ্চলের মানুষেরা টিকা নেয়ার জন্য নিবন্ধিত হওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে কেন? বাস্তবতা হ’ল গ্রামীণ অঞ্চলে এবং শহরের রাস্তায় বাস করা অনেক মানুষের কাছে টিকা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। তদুপরি, তাদের টিকা দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করার জন্য প্রয়োজনীয় ইন্টারনেট এবং ডিভাইস নেই। প্রায়শই নাগরিকদের টিকার নিবন্ধন ও টিকার কার্ডটি মুদ্রণের জন্য বিভিন্ন কম্পিউটারের দোকানে ১০০/২০০ টাকা দিতে হচ্ছে। সুতরাং, এই ব্যক্তিরা নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় অ্যাক্সেসের অভাবে এবং ব্যক্তিগতভাবে দোকানে নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে টিকা নিতে নিরুৎসাহিত বোধ করছেন।

সরকার নিবন্ধকরণ প্রক্রিয়া সহজ করার জন্য একটি অ্যাপও তৈরি করেছে। তবে, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগ মানুষের এই অ্যাপটিতে অ্যাক্সেস নেই। সুতরাং, নিবন্ধন প্রক্রিয়ার কারণে একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী টিকা গ্রহণ প্রক্রিয়ার বাইরে রয়েছে। সরকার টিকা দেওয়ার প্রাথমিক দিনগুলোতে টিকা প্রদানের স্থানে নিবন্ধনের ব্যবস্থা চালু করলেও, পরে তা বন্ধ করে দেয়। ফলে, অধিক জনগোষ্ঠীকে ভ্যাকসিনের আওতায় নিয়ে আসার সুবিধার্থে সরকার অনসাইট রেজিস্ট্রেশনের বিষয়ের অবস্থান পর্যালোচনা করে পুনরায় চালু করতে পারে।

আর একটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হল- টিকা দেওয়ার জন্য সর্বাধিক সংখ্যক নাগরিকের নিবন্ধনের জন্য সরকার আর কী করতে পারে? প্রথমেই সরকারের যে পদক্ষেপটি নেওয়া উচিত সেটি হল ব্যাপকভাবে প্রচার কার্যক্রম শুরু করা। একথা সত্য যে, সরকার জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য বিভিন্ন প্রচার চালাচ্ছে, তবে এই কার্যক্রমের তীব্রতা আরও বাড়াতে হবে। জনগণকে টিকা দেওয়ার জন্য নিবন্ধিত হতে সহায়তা করতে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) এ কাজ করা ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (ইউডিসি)কে ব্যবহার করার জন্য বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রতিটি ইউডিসিতে কমপক্ষে একজন উদ্যোক্তা রয়েছে যারা ইউপির জনগণকে বিভিন্ন অনলাইন পরিষেবা প্রদান করে।

এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক যে দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতায় ভুগছেন এমন জনগণ টিকা গ্রহণের বিষয়ে দ্বিধা-গ্রস্থ কারণ টিকা গ্রহণ করা হলে তাদের শরীরে কোনও প্রতিকূল পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া ফেলবে কিনা তা নিয়ে তারা বিভ্রান্ত। এই শ্রেণির মানুষদের উৎসাহিত করতে সরকার বিভিন্ন ধরনের তথ্য প্রচার করতে পারে। তবুও, এই বার্তাগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে এখনও পৌঁছেনি।

সুতরাং, ইতিমধ্যে টিকা নেওয়া ব্যক্তিদের গড় সংখ্যার ক্ষেত্রে শহুর এবং গ্রামীণ অঞ্চলের মধ্যে যথেষ্ট ব্যবধান রয়েছে। গ্রামীণ মানুষ ছাড়াও, অনেক মানুষ রয়েছে যারা শহরের রাস্তায় এবং বস্তিতে বাস করে ভাসমান মানুষ হিসেবে। এই মানুষরাও টিকা দেওয়ার আওতার বাইরে থেকে গেছে।

বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম থেকে জানা গেছে যে এই শ্রেণির মানুষের মধ্যে টিকার ইতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে স্পষ্ট কোন ধারণা নেই। ফলে, টিকা গ্রহণ সম্পর্কে তাদের মধ্যে খুব অনীহা দেখা যাচ্ছে। সুতরাং, জনসংখ্যার সিংহভাগ মানুষকে টিকা প্রদান প্রক্রিয়ার বাইরে রেখে, বিনামূল্যে টিকা দেওয়ার জন্য সরকারের মহৎ প্রচেষ্টা দেশের কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সফল হবে না।

আমাদের দেশের গণ টিকা প্রদানের ক্ষেত্রে অসাধারণ সাফল্য অর্জনের পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে। সুতরাং, স্থানীয় পর্যায়ে এবং শহরগুলোতে রাস্তায় এবং বস্তিতে বসবাসকারী মানুষদের ঘরে ঘরে গিয়ে নিবন্ধন এবং টিকা দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত মানবসম্পদ রয়েছে। অন্যথায়, বিপুল সংখ্যক মানুষকে টিকার আওতার বাইরে রেখে, দেশে কোভিড-১৯ এর সংক্রমণের বিস্তার রোধ করা যাবে না।

অতএব, গ্রামীণ ও শহুরে অঞ্চলে টিকা গ্রহণকারীর সংখ্যার ব্যবধান কমিয়ে আনতে আমাদের একসাথে কাজ করতে হবে। সুতরাং, আমরা প্রত্যাশা করি যে দেশবাসীকে বিনামূল্যে টিকা দেওয়ার সরকারের সিদ্ধান্তটি যথেষ্ট পরিমাণে সফল হবে। বাংলাদেশকে কোভিড -১৯ মুক্ত করার চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের জন্য টিকা প্রদান প্রক্রিয়ায় দেশের সকল জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার জন্য সরকারকে আরও কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।

লেখক : ড. প্রণব কুমার পান্ডে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের প্রফেসর।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *