চট্টগ্রামে এক নারীকে রিকশা থেকে নামিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, গ্রেফতার ৮

নগর–মহানগর সারাবাংলা

নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁও থানাধীন মৌলভী পুকুরপাড় এলাকায় এক নারীকে (২২) রিকশা থেকে নামিয়ে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় এক নারীসহ আট জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) রাত দেড়টা থেকে চারটা পর্যন্ত ওই এলাকার আনোয়ার সাহেবের চারতলা বাড়ির ডান পাশের এক গলিতে ওই নারী ধর্ষণের শিকার হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। ঘটনার পর শুক্রবার (৯ অক্টোবর) ভোর রাত থেকে দুপুর পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে আসামিদের গ্রেফতার করা হয়।

নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) বিজয় বসাক এ তথ্য জানিয়েছেন। শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন আট জনকে গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

গ্রেফতারদের বিরুদ্ধে পুলিশ ওই নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ আনলেও আসামিদের দাবি, তারা এ ধরনের কোনও ঘটনা ঘটায়নি। বরং চান্দগাঁও থানা পুলিশের সোর্স সুমন এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত। সুমন নিজেই এই ঘটনার মূল হোতা বলে অভিযোগ তাদের। তাকে সঙ্গে নিয়ে সবাইকে গ্রেফতার করলেও পুলিশ সুমনকে গ্রেফতার দেখায়নি বলে জানিয়েছেন তারা।

গ্রেফতার আট জন হলো জাহাঙ্গীর আলম (৩৮), মো. ইউসুফ (৩২), মো. রিপন (২৭), মো. সুজন (২৪), দেবু বড়ুয়া প্রকাশ জোবায়ের (৩১), মো. শাহেদ (২৪), রিন্টু দত্ত প্রকাশ বিপ্লব (৩০) ও মনোয়ারা বেগম প্রকাশ লেবুর মা (৫৫)। গ্রেফতার আট জনের মধ্যে জাহাঙ্গীর, ইউসুফ, বিপ্লব ও দেবু পেশায় সিএনজিচালক বলে জানিয়েছে পুলিশ।

ঘটনার বর্ণনায় পুলিশ কর্মকর্তা বিজয় বসাক বলেন, ‘ভিকটিম নারী বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থানাধীন গ্রামের বাড়ি থেকে শহরে নিজ বাসার উদ্দেশ্যে সিএনজি অটোরিকশা যোগে রওনা হন। রাত ১১টার দিকে চান্দগাঁও থানাধীন কাপ্তাই রাস্তার মাথায় সিএনজি থেকে নেমে বাসার উদ্দেশ্যে রিকশায় ওঠেন। কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকেই আসামিরা ভিকটিমকে অনুসরণ করতে থাকে। পরে চান্দগাঁও থানাধীন মৌলভী পুকুর এলাকায় আসলে আসামিরা ভিকটিমকে রিকশা থেকে নামিয়ে টেনে হেঁচড়ে আরকান সড়কের মৌলভী পুকুরপাড়ের আনোয়ার সাহেবের চার তলা ভবনের ডান পাশের গলিতে নিয়ে যায়। সেখানে একটি ডাস্টবিনের পাশে রাত দেড়টা থেকে ৪টা পর্যন্ত ভিকটিমকে ধর্ষণ করা হয়। পরে ভিকটিমকে উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালের ওসিসিতে ভর্তি করা হলে সেখান থেকে চান্দগাঁও থানা পুলিশকে ঘটনাটি অবহিত করা হয়। এরপর পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে আসামিদের গ্রেফতার করে।’

তিনি আরও বলেন, ঘটনার পর আমি নিজে ওই ভিকটিমের সঙ্গে গিয়ে কথা বলেছি। ওই নারী আমাদের জানিয়েছেন ৮ থেকে ১০ জন তাকে ধর্ষণ করেছে। ধর্ষণ কাজে বাধা দেওয়ায় তাকে বেধড়ক পেটানো হয়। অপর আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রেখেছে। এ ঘটনায় ভিকটিম বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেছেন। ওই আসামিদের গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।

তবে পুলিশের এই তথ্য অস্বীকার করেছেন গ্রেফতার আসামিরা। নগর পুলিশের উপ কমিশনার (উত্তর) কার্যালয়ে গ্রেফতার একাধিক আসামির সঙ্গে কথা বললে তারা বলেন, আমরা কেউ ওই নারীকে ধর্ষণ করিনি। আপনারা প্রয়োজনে আমাদের ডিএনএ টেস্ট করে দেখতে পারেন। চান্দগাঁও থানা পুলিশের সোর্স এ ঘটনাটি ঘটিয়েছে। অথচ পুলিশ তাকেই গ্রেফতার করেনি।

গ্রেফতার দেবু বড়ুয়া বলেন, পুলিশের সোর্স সুমনসহ আমরা একই স্ট্যান্ডে সিএনজি চালাই। করোনার সময় গত দুই মাস আগে ওই নারী আমাদের এক বন্ধুর কাছ থেকে দুই হাজার টাকা নিয়ে যায়। বৃহস্পতিবার রাতে কাপ্তাই রাস্তার মাথা এলাকায় ওই নারীকে দেখে সুমন আমাদের ডাক দেয়। পরে আমরা তার সঙ্গে আসি। মৌলভী পুকুরপাড় এলাকায় এসে আমরা ওই নারীকে আটকাই। তার কাছ থেকে টাকা উদ্ধারের চেষ্টা করি। এসময় ওই নারীর সঙ্গে একটি ছেলে ছিল। টাকার জন্য আমরা তাদেরকে মারধর করি। ছেলেটিকেই বেশি মারধর করা হয়। এরপর আমরা বাসায় চলে যাই। পরে সকালে সুমন এসে আমার বাসার দরজায় নক করে। কাল রাতের বিষয়ে কথা বলবে বলে সে বাসায় পুলিশ নিয়ে আসে। এরপর পুলিশ এসে আমাকে ধরে থানায় নিয়ে যায়।

গ্রেফতার আট জন আপনারা বন্ধু কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সুমনসহ আমরা ৪-৫জন একই স্ট্যান্ডে সিএনজি অটোরিকশা চালাই। অন্যরাও আমাদের পরিচিত।

একই কথা জানিয়েছেন গ্রেফতার অপর আসামি মো. সুজন। তিনি বলেন, ‘বিশ্বাস করেন, এই বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। আমাকে পুলিশ কোনও কারণ ছাড়াই ধরে নিয়ে এসেছে।’

আসামিদের এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিজয় বসাক বলেন, ‘আমরা নিশ্চিত হয়েই তাদেরকে গ্রেফতার করেছি। নিরাপরাধ কাউকে আমরা গ্রেফতার করিনি। ভিকটিম মহিলাকে আমরা ছবিগুলো দেখিয়েছি।’

সড়কে প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে এক নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছে ওই রাস্তা দিয়ে কি কেউ যায়নি? তাকে মারধর করা হয়েছে, এর সঙ্গে পূর্ব কোনও শত্রুতার জের নেই তো? এমন প্রশ্নের উত্তরে বিজয় বসাক বলেন, ‘স্পর্শকাতর ঘটনা হওয়ায় আমরা দ্রুত অভিযান চালিয়ে আসামিদের গ্রেফতার করেছি। গ্রেফতারের পর আসামিদের ওইভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা সম্ভব হয়নি। জিজ্ঞাসাবাদ করলে আমরা বিষয়টি জানতে পারবো।’

সুমন পুলিশের সোর্স তার সঙ্গে ভিকটিমের পরিচয় ছিল, এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তদন্তের স্বার্থে আমরা আপনাদের অনেক তথ্য জানাতে পারছি না। তদন্ত করার পর আমরা সব বিষয় আপনাদের জানাতো পারবো।

ওই নারীর সঙ্গে ঘটনার সময় এক যুবক ছিল ওই বিষয়ে জানতে চাইলে বিজয় বসাক বলেন, তার সঙ্গে একজন ছিলেন শুনেছি। এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনও তথ্য আমরা এখনও পাইনি।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *