চার কোটি টাকার মনোনয়ন বাণিজ্য!

জাতীয় লিড লিড ১ লিড 2

বিশেষ প্রতিনিধি:

ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়িয়া উপজেলা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের ১২টিতেই পাওয়া গেছে অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ। এতে প্রায় ৪ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১২টি ইউনিয়নের প্রত্যেক চেয়ারম্যান প্রার্থীর কাছ থেকে ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত উৎকোচ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৪ জন প্রার্থী খুবই বিতর্কিত এবং তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে বারবার দল বদলের অভিযোগ। এলাকার সচেতন মহল, মনোনয়নবঞ্চিত প্রার্থী এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগামী ১১ নভেম্বর ফুলবাড়িয়া উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে নির্বাচন। এই নির্বাচনকে ঘিরে উপজেলায় এখন উৎসবের আমেজ। গত সোমবার ১৩টি ইউনিয়নে উপজেলা আওয়ামী লীগ তাদের দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। ফুলবাড়িয়া উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে মনোনয়নপ্রাপ্তরা হচ্ছেনÑ ১ নম্বর নাওগাঁও ইউনিয়নে আব্দুর রাজ্জাক, ২ নম্বর পুটিজানা ইউনিয়নে ময়েজউদ্দিন তরফদার, ৩ নম্বর কুশমাইল ইউনিয়নে শামসুল হক, ৪ নম্বর বালিয়ান ইউনিয়নে হাজেরা খাতুন, ৫ নম্বর দেওখোলা ইউনিয়নে তাজুল ইসলাম বাবলু, ৬ নম্বর ফুলবাড়িয়া ইউনিয়নে আতাহার আলী, ৭ নম্বর বাক্তা ইউনিয়নে নাজমুল হক সোহেল, ৮ নম্বর রাঙামাটি ইউনিয়নে মির্জা কামরুজ্জামান, ৯ নম্বর এনায়েতপুর ইউনিয়নে বুলবুল হোসেন, ১০ নম্বর কালাদহ ইউনিয়নে ইমান আলী, ১১ নম্বর রাধাকানাই ইউনিয়নে গোলাম কিবরিয়া শিমুল তরফদার, ১২ নম্বর আছিম পাটুলি ইউনিয়নে এস এম সাইফুজ্জামান এবং ১৩ নম্বর ভবানীপুর ইউনিয়নে জবান আলী সরকার। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা প্রতিদিনের সঙ্গে অন্তত অর্ধডজন মনোনয়ন বঞ্চিত প্রার্থীর কথা হয়। তাদের মধ্যে জেলা পরিষদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিন। তিনি জানান, এবারের ইউপি নির্বাচনে সরকারি দল থেকে ১৩টি ইউনিয়নে যাদের মনোনয়ন দেয়া হয়েছে তাদের মধ্যে চারজন প্রার্থী বিতর্কিত। তাদের কারোরই দলীয় পূর্ব পরিচিতি নেই। এরা বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এবার সরকারি দল থেকে ৬ নম্বর ফুলবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন চেয়েছেন ছয়জন। এদের মধ্যে জেলা পরিষদের সদস্য রুহুল আমিন, ৬ নম্বর ফুলবাড়িয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুস সালামের মেয়ে জিনাত রেহানা ইলোরা, থানা আওয়ামী লীগের সমাজকল্যাণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন, আওয়ামী লীগ নেতা এজিদুল হক, কবির হোসেন এবং আজহার আলী। তাদের মধ্যে দলীয় ব্যাকগ্রাউন্ড না থাকার পরও আতাহার আলীকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তার কাছ থেকে অন্তত ৮০ লাখ টাকা নেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আতাহার আলীর মনোনয়ন চূড়ান্ত করেছেন উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক সরকার। তিনি ১২ নম্বর আছিম পাটুলি ইউনিয়ন পরিষদের প্রার্থীও চূড়ান্ত করেছেন। এই ইউনিয়নেও ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন শামসুল আলম বাবলু, ডা. কামরুজ্জামান এবং সাইফুজ্জামান। এই সাইফুজ্জামান এলাকার একজন বিতর্কিত ব্যক্তি। তিনি জাতীয় পার্টি ও বিএনপি ঘুরে আওয়ামী লীগে এসেছেন। তার কাছ থেকেও অর্ধকোটি টাকা নেয়া হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। ৩ নম্বর বাক্তা ইউনিয়নে এবার সরকারি দলের মনোনয়ন চেয়েছিলেন কয়েকজন। এরমধ্যে দীর্ঘদিনের ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুস সালাম এবং বাক্তা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক সোহেল। মনোনয়ন পেয়েছেন সোহেল। মনোনয়নবঞ্চিত আব্দুস সালামের অভিযোগ, সোহেলের কাছ থেকে ৩০ লাখ এবং ইউনিয়ন বিএনপি’র সভাপতি স্বতন্ত্র প্রার্থী ফজলুল হক মাখনের কাছ থেকে ৩০ লাখ এই ৬০ লাখ টাকা নিয়ে তার নাম চূড়ান্ত করার পরও তাকে বাদ দেয়া হয়েছে। ৩ নম্বর কুশমাইল ইউনিয়নেও বিতর্কিত প্রার্থীকে নৌকার মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। তিনিও একসময় জাতীয় পার্টি করতেন। এই ইউনিয়নে মনোনয়ন চেয়েছিলেন আব্দুল বাতেন পুলু, দলিল লেখক লিটন ও শামসুল হক। অভিযোগ আছে, পুলুর কাছ থেকে ২০ লাখ এবং লিটনের কাছ থেকেও প্রায় সমপরিমাণ টাকা নেয়া হয়। কিন্তু তাদের দুজনের কাউকেই মনোনয়ন না দিয়ে দেওয়া হয়েছে ৪০ লাখ টাকার বিনিময়ে শামসুল হককে। ১৩ নম্বর ভবানীপুর ইউনিয়নে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে পল্টিবাজ পলিটিশিয়ান জবান আলী সরকারকে। শোনা যাচ্ছে, তার কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে প্রায় ৪০ লাখ টাকা। শুধু ১১ নম্বর রাধাকানাই ইউনিয়নে বিনা টাকায় নৌকায় মনোনয়ন পেয়েছেন শিমুল তরফদার। তিনি এমপি সাহেবের মেয়ের জামাই। বাদবাকি ১২টি ইউনিয়নে মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ পাওয়া গেছে। মনোনয়নপ্রাপ্ত এবং মনোনয়নবঞ্চিত ক্ষমতাসীন দলের একাধিক প্রার্থী অর্থ লেনদেনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। এই মনোনয়ন বাণিজ্যের সঙ্গে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ফুলবাড়িয়ার যুবরাজ খ্যাত একজনসহ এমপি পরিবারের তিন প্রভাবশালী সদস্য জড়িত। ৬ নম্বর ফুলবাড়িয়া ইউনিয়ন ও ১২ নম্বর আছিম পাটুলি ইউনিয়নসহ অন্যান্য ইউনিয়নে মনোনয়ন বাণিজ্যের ব্যাপারে জানতে চাইলে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক সরকার বলেন, যাদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে তারা প্রত্যেকেই দলের ইউনিয়ন পর্যায়ের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। এর মধ্যে ৬ নম্বর ফুলবাড়িয়া ইউনিয়নের নৌকার প্রার্থী মৎস্যলীগের সভাপতি। তিনি বলেন, কেউ কোনো টাকা-পয়সা দেননি। আর যারা মনোনয়নবঞ্চিত হয়েছেন তারা দলীয় কোনো পদে নেই।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *