ছেড়া কাগজের সূত্র ধরে হত্যার রহস্য উদঘাটন

জাতীয় নগর–মহানগর

এসএম দেলোয়ার হোসেন:
হাত পা রশি দিয়ে বাধা অজ্ঞাত এক যুবকের লাশ। পুরো শরীর ছিল বেডশীট-মশারি ও পলিথিন দিয়ে মোড়ানো। ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে লাশের পরিচয় যাতে শনাক্ত করা না যায়, সেজন্য হাতের আঙ্গুল বিকৃতকরণের পাশাপাশি মুখমন্ডলও বিকৃত করে খুনিরা। এমন একটি অজ্ঞাতনামা যুবকের অর্ধগলিত লাশ গত ১২ অক্টোবর সকাল ৭ টায় হাতিরঝিল লেকের মেরুল-বাড্ডা প্রান্ত থেকে উদ্ধার করে হাতিরঝিল থানা পুলিশ। সেই হত্যা সম্পর্কিত কোন একটি ক্লুর খোঁজে তীক্ষ দৃষ্টিতে মৃতদেহের চারপাশ খুঁজতে থাকে হাতিরঝিল থানা পুলিশ। লেকের যে স্থানে এ মৃতদেহটি ভেসে ছিল সেখান থেকে প্রায় ৫০ মিটার উত্তরে একটি ছেড়া কাগজ পড়ে থাকে। রহস্যঘেরা সেই ছেড়া কাগজটি খুঁজে পায় পুলিশ। ছেড়া কাগজে লেখা একটি মোবাইল নম্বরের সূত্র ধরে মৃত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্তের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডে জড়িত আসামিদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় হাতিরঝিল থানা পুলিশ। আজ সোমবার (১৯ অক্টোবর) ঢাকা প্রতিদিনকে এসব তথ্য জানান ডিএমপির গণমাধ্যম শাখার উপ-পুলিশ কমিশনার মো. ওয়ালিদ হোসেন।
তিনি জানান, গত ১৩ অক্টোবর দিবাগত রাত সোয়া ১টার দিকে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল জোনের এডিসি হাফিজ আল ফারুকের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল পরদিন সকাল পৌনে ৭টা পর্যন্ত খিলক্ষেত থানার উত্তরপাড়া এলাকায় অভিযান চালায়। সেখান থেকে আহসান ও তামিম, হাতিরঝিল থানাধীন মহানগর আবাসিক এলাকা থেকে আলাউদ্দিন এবং রামপুরা এলাকা থেকে রহিমকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পর অজ্ঞাত মৃতব্যক্তির পরিচয় হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে তারা পুলিশকে জানায়, মৃত ব্যক্তির নাম আজিজুল ইসলাম মেহেদী। বয়স ২৪ বছর। তিনি আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র ছিলেন। লেখাপাড়ার পাশাপাশি পরিচিতজনদের পাসপোর্ট ও ভিসা প্রসেসিংয়ে সহায়তা করতেন মেহেদী। গ্রেফতারকৃত আহসান নিহত আজিজুল ইসলামের বাল্যবন্ধু। সে গুলশানের একটি রেস্টুরেন্টে এক্সিকিউটিভ শেফ হিসেবে চাকরি করতেন। করোনায় রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আর্থিক সংকটে পড়ে আহসান। তখন সে আলাউদ্দিনের কাছে কিছু টাকা ধার চায়। আলাউদ্দিন পেশায় ড্রাইভার হলেও পাসপোর্ট অফিসে দালালী ও পরিবহন পুলের পুরাতন গাড়ি ক্রয়-বিক্রয়ের সাথে জড়িত ছিল। আলাউদ্দিন আহসানকে টাকা ধার না দিয়ে পাসপোর্ট সংক্রান্ত কাজ (নামের বানান সংশোধন, জন্ম তারিখ সংশোধন, বয়স বাড়ানো কমানো) দিতে বলে। এ কাজে যে টাকা পাওয়া যাবে দু’জনে ভাগ করে নিবে। আহসান বাল্যবন্ধু আজিজুল ইসলাম মেহেদীকে জানায় পাসপোর্টে সমস্যা সংক্রান্ত কোন কাজ থাকলে সে সমাধান করে দিতে পারবে। চট্টগ্রামের ৩টি পাসপোর্টের নাম ও বয়স সংশোধনের জন্য গত ১২ আগষ্ট ঢাকায় আহসানের কাছে আসে মেহেদী। দুই সপ্তাহের মধ্যে পাসপোর্টের ৩টির নাম ও বয়স সংশোধন করে দেওয়ার বিনিময়ে আলাউদ্দিনকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা ও আহসানকে ১ লাখ টাকা দেয় মেহেদী। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাসপোর্ট সংশোধন করতে না পারায় ভিকটিম মেহেদী তাদেরকে চাপ দিলে তারা এক সপ্তাহ সময় চেয়ে নেয়। এই সময়েও পাসপোর্ট সংশোধনের কাজ করতে না পারায় পাসপোর্ট ও টাকা ফেরত চায় মেহেদী। এতে তারা টাকা ফেরত না দিয়ে সময় ক্ষেপন করতে থাকে। একপর্যায়ে মেহেদী এ দু’জনকে জানায় পাসপোর্ট ও টাকা ফেরত না দিলে ঢাকায় এসে তাদের অফিসে অভিযোগ করবে। চাকরি হারানোর ভয়ে আহসান ও আলাউদ্দিন মেহেদীকে হত্যা করার পরিকল্পনা করে। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আহসান ও আলাউদ্দিন পাসপোর্ট নেওয়ার জন্য মেহেদীকে গত ১০ অক্টোবর ঢাকায় আসতে বলে। সেদিন রাত প্রায় সোয়া ১১টায় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসে পৌঁছে মেহেদী। হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা মোতাবেক আহসান মেহেদীকে খিলক্ষেত উত্তরপাড়ায় অবস্থিত তার ভাড়া বাসায় নিয়ে যায়। খাবারের সাথে ঘুমের ঔষধ খাওয়ানো হয় মেহেদীকে। ব্যক্তিগত কাজের কথা বলে বাসার বাহিরে চলে যায় আহসান। রাত অনুমান দেড়টার দিকে ঘুমন্ত মেহেদীকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করে হাত, পা রশি দিয়ে শক্ত করে বেধে বেডশীট, মশারি ও পলিথিনে মুড়িয়ে ফেলে আলাউদ্দিন। এরপর সে আহসানকে মোবাইল ফোনে হত্যার পর বিষয়টি কনফার্ম করে। আহসানের পাশের রুমের ভাড়াটিয়া তামিম (রেস্টুরেন্টে কর্মরত কলিগ) আকস্মিকভাবে আহসানের রুমে ঢুকে হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি জানতে পারে। আহসানের অনুরোধের তামিম বিষয়টি কাউকে বলবে না এবং লাশটি সুবিধাজনক স্থানে ফেলে দিতে আহসানকে সহায়তা করবে বলে জানায়। সেই রাতে লাশ সরাতে না পেরে বিছানার নিচে রেখে পরদিন দুপুর ১২টার দিকে রেস্টুরেন্টে ডিউটিতে যায় আহসান ও তামিম। কাজ শেষে দু’জন একসাথে বাসায় ফেরে। ওইদিন দিবাগত রাত ১টার দিকে আলাউদ্দিনের নির্দেশে ড্রাইভার রহিম আলাউদ্দিনের নোয়া মাইক্রোবাসটি চালিয়ে লাশ গুম করতে আহসানের বাসায় যায়। আহসান ও তামিম মেহেদীর লাশটি মাইক্রোবাসে উঠিয়ে হাতিরঝিল এলাকায় প্রবেশ করে। পথে তামিম নেমে যায়। হাতিরঝিল লেকের মেরুল-বাড্ডা প্রান্তে লোকজন বিহীন ও অন্ধকারচ্ছন্ন দেখে ড্রাইভার রহিম গাড়ি থামিয়ে দরজা খুলে দেয়। আহসান লাশটি গাড়ি থেকে পানিতে ফেলে দেয়। পরে গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে ৩টি পাসপোর্ট, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসার জন্য ব্যবহৃত মেহেদীর বাস টিকিট জব্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি মেহেদীর লাশ হাতিরঝিলে ফেলতে যে মাইক্রোবাসটি ব্যবহার করা হয়, সেই মাইক্রোবাসটিও জব্দ করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃত আহসান, আলাউদ্দিন ও রহিম বিজ্ঞ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।
এ বিষয়ে তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ ঢাকা প্রতিদিনকে বলেন- এটি একটি ক্লুলেস হত্যাকাণ্ড। একটি ছেড়া কাগজে লেখা একটি মোবাইল নম্বরের সূত্র ধরে লাশের পরিচয় শনাক্তকরণের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডে জড়িত ৪ জন আসামিকে গ্রেফতার ও সব আলামত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি আমরা। এই মামলাটি পুলিশি তদন্তের উৎকর্ষতার প্রমান বলে জানিয়েছেন পুলিশের শীর্ষ এ কর্মকর্তা।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *