জন্মশতবর্ষে বঙ্গবন্ধু ও দেশপ্রেম

মতামত

ডেস্ক রিপোর্ট: বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উদযাপন সমগ্র বাঙালি জাতির জন্যই আনন্দঘন উৎসবে পরিণত হচ্ছে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাকে মৌখিকভাবে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উদযাপন করার প্রস্তাব উত্থাপন করি। আমার প্রস্তাব ছিল ২০১৯ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ পর্যন্ত বছর ব্যাপী জন্মদিন পালন।

কিছুদিন পরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই প্রস্তাবের সঙ্গে তাঁর নিজের কিছু পরিকল্পনা যুক্ত করে তিনি এটাকে ২০২০-২০২১ সাল পর্যন্ত সম্প্রসারিত করেন। এর ফলে দুটো সুবিধা হয়েছে, একটি হলো সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উদযাপন, অন্যটি হলোÑ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন। এই দুটি বিষয়ের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। সুতরাং আমি বিবেচনা করে দেখলাম মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে চিন্তা থেকে ‘মুজিববর্ষ’ ঘোষণা করেছেন এবং যে সময় তিনি নির্ধারণ করেছেন (২০২০-২০২১) তা যথার্যই হয়েছে।

 বঙ্গবন্ধুই আমাদের একমাত্র দিশারী, বঙ্গবন্ধুকে অনুসরণ করেই আমরা সৎ হতে পারি, সচেতন হতে পারি, দক্ষ কর্মী হতে পারি, দেশপ্রেমিক হয়ে দেশকে গড়ে তুলতে পারি। এ কথা এখন স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, বঙ্গবন্ধুই আমাদের ঐতিহ্য, বঙ্গবন্ধুই আমাদের ভবিষ্যৎ। বঙ্গবন্ধু আমাদের মঙ্গলের জন্যই, দেশের কল্যাণের জন্যই জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। 

আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনাই মেনে নিলাম। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ কে-কিভাবে গ্রহণ করেছেন জানি না, তবে বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ ২০১৮ সাল থেকেই বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উদযাপন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। আমরা একটু আগে থেকেই এই চিন্তা করেছিলাম বলে বেশকিছু মূল্যবান গ্রন্থ রচনা ও সম্পাদনা করতে পেরেছি। বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন একটি ছোট্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠান হলেও এর কর্মকাণ্ড আজ আর ছোট করে দেখার অবকাশ নেই। মুজিববর্ষ ঘিরে আমরা বিশটির মতো বই প্রকাশ করেছি, মৌলিক দুটি কালজয়ী গান নির্মাণ করেছি এবং দেশব্যাপী বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন প্রচার-প্রসারের ক্ষেত্রে পোস্টার, লিফলেট প্রকাশ করেছি। শুধু বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনই নয়, এরকম আরো অসংখ্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এখন মহাসমারোহে মুজিববর্ষ উদ্যাপন করছে। আমরা চেয়েছিলাম, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে শিশু-কিশোরদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর চিন্তা-চেতনা গেঁথে দিতে, বর্তমান সরকার সে বিষয়ে যথেষ্ট আন্তরিক বলেই মনে হচ্ছে।

বিশ্ব এখনও করোনা মহামারির ভয়ংকর থাবা থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি। করোনার কারণে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষের উৎসব কিছুটা ধীর গতিতে হয়েছে বটে, তবে এবার যদি তেমন কোনো বিপর্যয় না ঘটে আশাকরি ১৭ মার্চের কর্মসূচি নিঃসন্দেহে বর্ণাঢ্য ও সফল হবে। বঙ্গবন্ধু আজ শুধু আর বঙ্গবন্ধু নন, তিনি এখন বিশ্ববন্ধু। তার চিন্তা-চেতনা, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা পৃথিবীর মানুষকে চমকিত করেছে, তাঁর মতো সাহসী ও আপসহীন নেতা শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসে নয়, পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। এ কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা যেমন UNO, UNESCO বঙ্গবন্ধুকে সম্মানিত করার জন্য অবিরাম চেষ্টা করে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে এসব আন্তর্জাতিক সংস্থা বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের এতিহাসিক ভাষণ ১২টি ভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশ করেছে। UNESCO বঙ্গবন্ধুর নামে শান্তিপদকও ঘোষণা করেছে। UNESCO বিশ্বের শোষিত মানুষের মুক্তির দূত বঙ্গবন্ধুর নামে শান্তিপদক ঘোষণা করে একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিলেন বলেই আমি বিশ্বাস করি।

বঙ্গবন্ধু জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন ‘বিশ্ব দুই শিবিরে বিভক্ত, শোষক আর শোষিত আমি শোষিতের পক্ষে।’ আমৃত্যু বঙ্গবন্ধু শোষিত মানুষের পক্ষেই লড়াই করে গেছেন। এ কারণেই তিনি বাংলাদেশের কৃষক-শ্রমিককে যুক্ত করে ‘বাকশাল’ গঠন করে দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন। আজকের বিশ্বব্যবস্থায় ‘শোষিতের গণতন্ত্র’ই নিরন্ন মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারে, বঙ্গবন্ধু অনেক আগেই এ কথা ভেবেছিলেন। এ জন্যই তিনি ‘শোষিতের গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারলে বাংলা সত্যিকার অর্থেই সোনার বাংলা হয়ে উঠত। ঘাতকের দল বঙ্গবন্ধুকে সেই সুযোগ না-দিয়ে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রে পা-দিয়ে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে। এর ফলে পিছিয়ে পড়ে বাংলাদেশ, মুখ থুবড়ে পড়ে বঙ্গবন্ধুর আজন্মলালিত স্বপ্ন।

বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পিতার প্রদর্শিত পথেই নিরলসভাবে হেঁটে চলেছেন। তিনি একক নেতৃত্বে বাংলাদেশকে সম্মানের সঙ্গে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তার উন্নয়নমূলক গণমুখী কর্মকা বাংলাদেশের মানুষের মনে আশার সঞ্চার করেছে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে বাংলাদেশ সর্বদিক থেকেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নয় লক্ষ গৃহহীন পরিবারকে গৃহ প্রদান করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একটি ঐতিহাসিক কাজ করেছেন।

বঙ্গবন্ধুই আমাদের একমাত্র দিশারী, বঙ্গবন্ধুকে অনুসরণ করেই আমরা সৎ হতে পারি, সচেতন হতে পারি, দক্ষ কর্মী হতে পারি, দেশপ্রেমিক হয়ে দেশকে গড়ে তুলতে পারি। এ কথা এখন স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, বঙ্গবন্ধুই আমাদের ঐতিহ্য, বঙ্গবন্ধুই আমাদের ভবিষ্যৎ। বঙ্গবন্ধু আমাদের মঙ্গলের জন্যই, দেশের কল্যাণের জন্যই জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু প্রদর্শিত পথে অগ্রসর হয়ে যদি আমরা এ দেশে শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারি, যদি এ দেশের নিপীড়িত জনগণের জন্য অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারি তবেই শুধু বঙ্গবন্ধুর আত্মদান সার্থক হবে। আর এ কার্যসাধনে বঙ্গবন্ধুর অমলিন স্মৃতিই হবে আমাদের পথপ্রদর্শক।

আজ যদি আমরা বঙ্গবন্ধুকে ভুলে যাই, তাঁর আদর্শকে বিস্মৃত হই তবে যে জাতি হিসেবে আমাদের ভবিষ্যৎ বিপন্ন হয়ে পড়বে শুধু তাই নয়, পৃথিবীর জন্যও তা এক মহাক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। কারণ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের শোষিত ও নিপীড়িত জনগণের জন্য প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যে সকল বাস্তব পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তা সারা পৃথিবীর মানুষের পক্ষে শিক্ষণীয় ও অনুকরণীয় বিষয়।

এতদিন মুজিবপ্রেম ছিল বাঙালির বাইরে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে তা মননে ঢুকতে শুরু করেছে। এটা শুভ লক্ষণ। আগে বঙ্গবন্ধুর জন্ম ও শাহাদাৎ দিবসে নেতাকর্মীরা মাইক বাজাত, তোরণ বানাত আর খিচুড়ি খেত, এখন এই প্রবণতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রচনা প্রতিযোগিতা, কুইজ ও নানামুখী সাংস্কৃতিক কর্ম। আজ বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু জাদুঘর হয়েছে, প্রকাশিত হয়েছে বঙ্গবন্ধু রচিত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’ ও ‘আমার দেখা নয়া চীন’। তার এবং স্বাধীনতার স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য বিভিন্ন জায়গায় তৈরি হচ্ছে নানারকম ভাস্কর্য ও স্মৃতিসৌধ, যেমন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গ্লাসটাওয়ার, শিখা চিরন্তন, শেখ মুজিবের জন্মস্থান টুঙ্গিপাড়ার অবকাঠামোগত উন্নয়ন ইত্যাদি। ’৭৫-এর মুজিব সমাধির যে চেহারা ছিল আজ তা নেই। তার বাড়ির ভাঙা দরজাও আজ বদলে গেছে। এই ছবিগুলো আছে ‘হু কিলড মুজিব’ আর ‘বাংলাদেশের সমাজবিপ্লবে বঙ্গবন্ধুর দর্শন’ গ্রন্থে।

মুজিব হত্যাকাণ্ডের পর শেখ মুজিবের বিশ্বস্ত কর্মীরা কেউ মাথায় পাগড়ি বেঁধে ফেরিওয়ালা হয়ে পালিয়েছিল, কেউ স্বেচ্ছায় গ্রেফতার হয়েছিল ঘরের মধ্যে বসে থেকে। আমার ভয় হয় আবার যদি ১৫ আগস্টের মতো কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তাহলে আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশের অবস্থা কী হবে? আমরা আশা করি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবের আদর্শ, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও সাংস্কৃতিক শুদ্ধতা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে এগিয়ে যাবেন।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *