জিডিপির ইতিবাচকতা ছড়িয়ে পড়ুক সম্পর্কেও

মতামত

আইএমএফ মানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক রিপোর্ট তো প্রকাশ করেনি, যেন বোমা ফাটিয়েছে। বৈশ্বিক রিপোর্ট হলেও বোমাটা ফেটেছে ভারতে। বিশ্বের আর কোনো দেশে এই রিপোর্ট নিয়ে আলোচনা প্রায় নেইই। কেন জানি না বাংলাদেশে রিপোর্টটি নিয়ে যতটা আলোচনা-পর্যালোচনা হওয়ার কথা, ততটা নেই। বোমাটা ফেটেছে আসলে ভারতে। আইএমএফের রিপোর্টে ধারণা করা হচ্ছে, বছর শেষে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়াবে ১ হাজার ৮৮৮ ডলার, আর ভারতের মাথাপিছু জিডিপি হবে এক হাজার ৮৭৭ ডলার। তার মানে অর্থনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ সূচকে বাংলাদেশ ভারতকে ছাড়িয়ে যাবে।

তাতেই গেল গেল রব উঠেছে ভারতীয় মিডিয়া আর সোশ্যাল মিডিয়ায়। তাদের টার্গেট অবশ্য বাংলাদেশ নয়, মোদি সরকার। ভারতে সরকারের অর্থনৈতিক নানা নীতি, উদ্যোগ নিয়ে তুমুল সমালোচনা চলছে। রাহুল গান্ধী থেকে কৌশিক বসু; অর্থনীতির জটিল হিসাব-নিকাশ থেকে রাজনীতির ময়দান; টেলিভিশনের টক শো থেকে সোশ্যাল মিডিয়া- সর্বত্রই তোলপাড়।

বোঝা যাচ্ছে, মাথাপিছু জিডিপির মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সূচকে বাংলাদেশের পেছনে পরে যাওয়াটা ভারতীয়দের অনেকের ইগোতে লেগেছে, এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না কেউ কেউ। বোমাটা ফেটেছে আসলে ভারতীয়দের মনোজগতে। বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতীয়দের অনেকের ধারণা, বাংলাদেশ একটি পুঁচকে প্রতিবেশী। ভারত হাতে ধরে বাংলাদেশকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। তাই তাদের কাছে বাংলাদেশ সমসময়ই ছোট।

বাংলাদেশ যে একটা স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র, কখনো কখনো সে কথাটাই তারা ভুলে যান। তারা প্রভু হতে চান, বন্ধু নয়। তারা এলডার ব্রাদার হতে চান না, বিগব্রাদার হতে চান। কিছু লোকের এই দাদাগিরিই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের উন্নতির পথে সবচেয়ে বড় বাধা। এই ‘দাদা’দের বুকেই আগুন জ্বেলেছে আইএমএফ- শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের কাছে পরাজয়! তবে সুখের কথা হলো, ভারতে এই ‘দাদা’দের সংখ্যাও কমছে। ভারতে বাংলাদেশের বন্ধুর সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশের অর্জনে অনেকেই অভিনন্দনও জানাচ্ছেন।

মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়া অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য বড় অর্জন। তবে ভারতের সাথে তুলনামূলক আলোচনাটা আসলে অতটা প্রাসঙ্গিক নয়। কিন্তু আলোচনায় মনে হচ্ছে, আইএমএফ বাংলাদেশ-ভারতের অর্থনীতির তুলনামূলক চিত্র নিয়েই রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। আইএমএফ রিপোর্টে বাংলাদেশের আরও অর্জনের কথাও আছে। করোনার থাবায় বিশ্ব অর্থনীতিই এখন এক মহামন্দার শঙ্কায় কাঁপছে। বড় বড় অর্থনৈতিক শক্তিগুলোও ঠিকমত ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইটা করতে পারছে না। সেখানে বাংলাদেশের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা আমাদের আশান্বিত করে।

আইএমএফের রিপোর্ট অনুযায়ী, এ বছর মাত্র ২২টি দেশে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হবে, যার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। আইএমএফের রিপোর্টের এই প্রজেকশন বাংলাদেশের জন্য যতটা অর্জনের কথা বলছে, বাংলাদেশে আলোচনা ততটা নয়। এটার দুইটা কারণ হতে পারে। অনেকে আওয়ামী লীগকে অপছন্দ করেন বলে, দেশের অর্জনটাও বলতে চান না। বরং অনেকে চেষ্টা করেন অর্জনটাকে ছোট করে দেখাতে।

মাথাপিছু জিডিপি বড় কিছু নয়, আইএমএফের এটা ধারণা মাত্র। ইত্যাদি ইত্যাদি বলে অর্জনকে খাটো করে দেখানো হয়। আওয়ামী লীগকে খাটো করতে গিয়ে আমরা কখনো কখনো বাংলাদেশকেই খাটো করে ফেলি। আরেকটা কারণ হতে পারে অর্জনক্লান্তি। গত ১২ বছরে বাংলাদেশ উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি বিবেচনায় অনেক সাফল্য, অনেক প্রশংসা পেয়েছে। তাই এখন আর কোনো অর্জনকেই আমাদের কাছে বড় মনে হয় না। অনেকটা বাংলাদেশ ক্রিকেটের মতো। একসময় জিম্বাবুয়েকে হারালেও মধ্যরাতে আনন্দ মিছিল বের হতো। এখন অস্ট্রেলিয়াকে হারালেও বড় জোর ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়ে ঘুমিয়ে যাই। আমাদের মধ্যে যতই ক্লান্তি থাকুক, মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়া অবশ্যই অনেক বড় অর্জন। রীতিমতো সেলিব্রেট করার মতো।

তবে মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়ার অর্জন ধরে রাখা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে ছাড়িয়ে গেলেও করোনার সময় কিন্তু দারিদ্র্য বেড়েছে। সকল দুর্যোগ-মহামারিতে সব মানুষকে খাওয়ানো এবং সব মানুষের মানসম্পন্ন জীবনযাপন নিশ্চিত করাটাও বড় চ্যালেঞ্জ। দুর্নীতিও আমাদের অনেক অর্জন খেয়ে ফেলে। তাই অর্জনটা টেকসই হওয়াটা খুব জরুরি।

তবে আইএমএফের রিপোর্টেই বলা হয়েছে, আগামী বছরই ভারত আবার বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে যাবে। আবার ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ভারতকে টপকে যাবে। তার মানে এখন আমরা সমানে সমানে এগিয়ে যাব। অথচ কয়েক বছর আগেও এটা প্রায় অসম্ভব মনে হতো। ভারত আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল। গত এক যুগে বাংলাদেশ অনেক দ্রুত এগিয়েছে, আর ভারতের অগ্রগতি গত কয়েক বছরে কিছুটা মন্থর ছিল। সব মিলিয়ে আমরা এখন সমানে সমান।

তবে মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে টপকে যাওয়া মানেই কিন্তু ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়া নয়। ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় অর্থনীতির দেশ। ভারতের অর্থনীতি বাংলাদেশের চেয়ে ১০ গুণ বড়। মোট জিডিপির দিক থেকে বিশ্বের প্রথম পাঁচটি দেশের একটি ভারত। মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতের পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ তাদের বিপুল জনসংখ্যা, যা বৃদ্ধির হার বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। আরেকটা বিষয় বাংলাদেশকে মাথায় রাখতে হবে, যেকোনো উন্নত দেশের প্রবৃদ্ধি এগিয়ে নেয়া কঠিন। কারণ তারা তাদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চ প্রয়োগ করেই উন্নত হয়েছে। এখন এগুনোটা একটু কঠিনই হবে। বরং সঠিক পরিকল্পনা ও স্থিতিশীলতা থাকলে উদীয়মান দেশের পক্ষে দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন সহজ।

যেমন আইএমএফের রিপোর্ট অনুযায়ী এবার বাংলাদেশসহ মাত্র ২২টি দেশে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হবে। চীন ছাড়া বাকি সব উন্নত দেশেই নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির আশঙ্কা করা হচ্ছে। ভারত তো বটেই; যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, জার্মানির মতো বড় অর্থনীতির দেশও নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির ধারায় চলে যাবে। তাই কেউ যেন ভাববেন না বাংলাদেশ চীন বা যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে। তবে আমরা আমাদের সক্ষমতার প্রমাণ রেখেছি। এখন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করে এগিয়ে যেতে হবে।

আইএমএফের এই রিপোর্ট বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেও দারুণ ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ভারত বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে গেছে- কিছু ভারতীয়র এই শক কেটে গেলে তারা বুঝবে, বাংলাদেশ এগিয়ে গেলে ভারতের কোনো ক্ষতি নেই। আমরা যে এতবছর ভারতের চেয়ে পিছিয়ে ছিলাম, তাতে কি আমাদের কোনো ক্ষতি হয়েছিল? বাংলাদেশের অগ্রগতি তো ভারতের কিছুতে ভাগ বসিয়ে বা ভারতকে বঞ্চিত করে হয়নি। যে দেশকে একসময় তলাবিহীন ঝুড়ি বলে তাচ্ছিল্য করেছে বিশ্ব, সে দেশ যখন বাঘা বাঘা অর্থনীতির দেশকে পেছনে ফেলে মাথা উঁচু করে এগিয়ে যায়; তখন কারো কারো আঁতে ঘা লাগতেই পারে।

তবে ভারতের বিষয়টি আলাদা। ভারত আমাদের বৃহত্তম প্রতিবেশী। আমাদের স্বাধীনতা অর্জনে ভারতের সহযোগিতার জন্য আমরা চিরকৃতজ্ঞ। কিন্তু ভারতকে মাথায় রাখতে হবে, যতই সাহায্য করুক, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। সম্পর্ক হতে হবে মর্যাদার ভিত্তিতে, পারস্পরিক স্বার্থে। তবে মর্যাদা পেতে হলে সক্ষমতা অর্জন করতে হয়। গরিব প্রতিবেশী বা স্বজনকে কেউ পাত্তা দেয় না। গরিব প্রতিবেশী যখন ধীরে ধীরে সক্ষম হয়ে ওঠে, তখন সুপ্রতিবেশীর খুশিই হওয়ার কথা, হওয়া উচিত। আর পারস্পরিক স্বার্থটাও কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ।

আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সুসম্পর্ক যেমন দরকার; তেমনি সেটা যেন একতরফা না হয়, সেটাও মাথায় রাখতে হবে। ভারত অনেক বড়, কিন্তু ভারতের সাথে আমাদের সম্পর্কটা অবশ্যই পারস্পরিক। স্বার্থটা যদি শুধু বাংলাদেশে হয়, তাহলে সম্পর্কটাও একতরফা হবে। ভারতের স্থিতিশীলতার জন্যও বাংলাদেশকে লাগবে। একসময় বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে। ভারত নিশ্চয়ই সেটা ভুলে যায়নি। কিন্তু সীমান্তে হত্যা, তিস্তার পানি নিয়ে দিনের পর দিন ভারতের অবহেলা বাংলাদেশের মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছে।

অর্থনৈতিক বিবেচনায়ও সম্পর্কটা কিন্তু পারস্পরিক। দুই দেশের মানুষের মধ্যে যাওয়া-আসা আছে। বাংলাদেশ থেকে যারা ভারতের যান, তাদের একটা বড় অংশ যান চিকিৎসা নিতে, কিছু মানুষ যান কেনাকাটা করতে, কিছু মানুষ যান স্রেফ ঘুরতে। তার মানে বাংলাদেশ থেকে যারা যান, তারা সবাই সেখানে অর্থ ব্যয় করেন। করোনার সময় বাংলাদেশিরা যেতে পারেননি বলে ভারতের অনেক বড় হাসপাতাল সংকটে পড়েছে, কলকাতার নিউ মার্কেটের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশি ক্রেতাদের জন্য হাহাকার করছেন।

আর ভারত থেকে যারা বাংলাদেশে আসেন, তাদের অধিকাংশই আসেন কাজ করতে। ভারতের রেমিট্যান্সের বড় অংশ যায় বাংলাদেশ থেকে। ভারতের রেমিট্যান্সের তালিকায় বাংলাদেশের স্থান চতুর্থ। বিজেপি সরকার বাংলাদেশে থেকে মানুষের অনুপ্রবেশের কথা বলে নানা রাজনীতি করছে। নাগরিকপঞ্জি করে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশিদের দেশে ফেরত পাঠানোর জিগির তুলছে।

আইএমএফের রিপোর্টের পর আশা করি বিজেপি সরকারের মাথায় ঢুকবে, বেশি মাথাপিছু জিডিপির দেশ থেকে কম মাথাপিছু জিডিপির দেশে মানুষ বেড়াতে যেতে পারে, কাজের খোঁজে যাবে না। বাংলাদেশে মানুষ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপ, নিদেনপক্ষে মধ্যপ্রাচ্যে যাবে; ভারত কেন যাবে? তাই ভারতের কারো মাথায় যদি গেঁথে থাকে, বাংলাদেশ ছোট, বাংলাদেশ গরিব, বাংলাদেশকে আমরা স্বাধীনতা এনে দিয়েছি। প্লিজ ঝেড়ে ফেলুন। আমরা এখন সমানে সমান। আসুন আমরা হাতে হাত ধরে এগিয়ে যাই। প্রতিদ্বন্দ্বিতায় না নেমে সুস্থ প্রতিযোগিতা করি।

অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দুটি বন্ধু রাষ্ট্র পাশাপাশি থাকলে দুই দেশের জন্যই ভালো। বিপদে এক দেশ আরেক দেশের পাশে দাঁড়াবে। কেউ কারো মুখাপেক্ষী থাকবে না। আর শুধু অর্থনৈতিক সূচকেই নয়, আঞ্চলিক রাজনীতিতেও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কটা এখন পারস্পরিক স্বার্থে মর্যাদার ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

আশা করি আইএমএফের রিপোর্টে প্রবৃদ্ধি এবং মাথাপিছু জিডিপির যে ইতিবাচকতার গতি পেয়েছে, সেই গতিতে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে আরও বহুদূর। আর এই ইতিবাচকতা যেন ছড়িয়ে পরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কেও।

লেখকঃ প্রভাষ আমিন, হেড অব নিউজ, এটিএননিউজ

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *