জেলেপাড়ায় হতাশা

Uncategorized

 

ইলিয়াছ ভূঁইয়া, সীতাকুণ্ড থেকে
এখন বর্ষাকাল আর এ বর্ষাই হচ্ছে ইলিশের ভরা মৌসুম। দীর্ঘ্য ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে বঙ্গোপসাগরসহ উপকূলীয় নদ-নদীতে দেখা মিলছে না ইলিশের। মৎস্য কর্মকর্তা প্রকৃতিগত কারণ বললেও জেলেরা তা মানতে নারাজ। বঙ্গোপসাগরের সীতাকুণ্ড-সন্দ্বীপ চ্যানেলের ইলিশকে ঘিরেই এখানকার জেলেদের জীবন ও জীবিকার চাকা ঘুরছে। ইলিশের ভরা মৌসুম চললেও দেখা নেই রূপালি ইলিশের। সাগর কিংবা নদীতে জাল ফেলে দু-একটা ইলিশের দেখা পেলেও তা হয়তো পরিবারের আহারেই চলে যায়। ইলিশ ধরা না পরায় উপকূলের জেলে পরিবার অভাব অনটনে চরম হতাশার মধ্যে দিন পার করছে। হাহাকার চলছে উপকূলের জেলে পল্লিতে।
জানা যায়, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলায় সৈয়দপুর থেকে সলিমপুর পর্যন্ত প্রায় ৩৮টি জেলে পল্লি রয়েছে যেখানে ৩০ হাজারেরও বেশি জেলের বসবাস যাদের আয়ের উৎস মাছ আহরণ। ইলিশ ধরা না পরায় অভাব-অনটনে ঋণ করে চলছে এসব জেলেদের সংসার। এনজিওর ঋণ আর মহাজনের দাদনের ভাবনাই যেন জেলেদের পরিবারে নেমে এসেছে চরম হতাশা।
উপজেলার বৃহত্তম মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র কুমিরা ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, ঘাটে নোঙর করে আছে জেলেদের শতাধিক ট্রলার-নৌকা, বাজারে নেই ইলিশ। অলস সময় পার করছেন আড়তদাররা। দু-এক ঝুড়ি মাছ ঘাটে আনা হলেও নেই হাঁকডাক। বছরের এ ভরা মৌসুমে জেলেরা মহোৎসবে রূপালি ইলিশ ধরেন, নৌকা ভর্তি মাছ আসে অবতরণ কেন্দ্রে। মাছ রাখতেই শুরু হয় হাঁকডাক। অবতরণ এলাকায় থাকে বেচাকেনায় সরগরম। কিন্তু বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত।
সরেজমিনে গিয়ে জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে সমুদ্রে ইলিশ ধরা না পড়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন জেলেরা। ছোট ছোট নৌকায় ফাঁকে ফাঁকে দিন-রাত জাল ফেলে যে কয়টি মাছ পাওয়া যাচ্ছে তা দিয়ে ইঞ্জিন চালিত নৌকায় তেল খরচও হয় না।
উপজেলার কুমিরা ঘাটের হরী জলদাশ জানান, ইলিশের ভরা মৌসুমে ৬৫ দিনের মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা ছিল। এখন মাছ ধরতে সমুদ্রে জাল ফেলেছি, কিন্তু মাছ নেই। আমরা ইলিশের আশায় এনজিও ও বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছি। ইলিশ বিক্রির টাকা দিয়ে ঋণ পরিশোধ করবো বলে। কিন্তু ইলিশ ধরা না পড়ায় দেনাও শোধ করতে পারছি না। এ বছর আর দেনা শোধ করা হবে না। কুমিরা ঘাটের ধীরেন্দ্র জলদাশ বলেন, ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞার সময়েই মূলত মাছ ধরার পূর্ণ মৌসুম ছিল। তখন ভারত ও মিয়ানমারের জেলেরা মাছ ধরেছে, কিন্তু আমরা মাছ ধরতে পারিনি। ৬৫ দিনের বন্ধের পর আমরা মাত্র ৬টি জোঁ পেয়েছি মাছ ধরার, ৬টির মধ্যে বাকি আছে আর তিনটি জোঁ এরপর আবার ২২ দিনের জন্য মাছ ধরা বন্ধ থাকবে। এভাবে চলতে থাকলে আমরা কোথায় যাবো? কিভাবে আমাদের সংসার চলবে। কিভাবে আমরা ঋণ ও দাদনের টাকা শোধ করবো। সরকারিভাবে সহযোগীতা না পেলে পরিবার নিয়ে আমাদের অনাহারে মরতে হবে।
সৈয়দপুর এলাকার বাবুল জলদাশ জানান, এবার সাগরে মাছের দেখা মেলেনি। যে মাছ পেয়েছেন তাতে খরচের টাকা ওঠেনি। এতে দৈনিক খরচের তুলনায় আয় না হওয়ায় পরিবার নিয়ে কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন তারা। তা ছাড়া বিনিয়োগ করে লোকসান গুনছেন আড়তদার ও দাদন ব্যবসায়ীসহ এর সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্টরা।
সীতাকুণ্ড পৌরসদরের মাছের আড়ৎ শাহ আমানত এন্টারপ্রাইজের মালিক শওকত হোসেন বলেন, এ বছর ভরা মৌসুমে দুমাস মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা ছিল। নিষেধাজ্ঞা শেষে সমুদ্রে ইলিশের দেখা মিলছে না। যে কয়টি মাছ বাজারে আসে সেগুলোর দাম বেশি হওয়ায় সাধারণ মানুষ এবার ইলিশ ক্রয় করতে পারছেন না। আমরাও হতাশ এবারের ইলিশ কম ধরা পড়ায়। সীতাকুণ্ড উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শামীম আহমেদ বলেন, গত বছর আগস্ট পর্যন্ত আমরা মাছ পেয়েছিলাম ৪৭১,৫ টন। আর এবছর আগস্টের পনের তারিখ পর্যন্ত মাছ পেয়েছি ১৫০ টন। আমি সরেজমিনে গিয়ে জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, আগে জোঁ এর সময় জলের যে উচ্চতা হতো ২.৫ ফুট থেকে ৪ ফুট পর্যন্ত এবার তা হচ্ছে না। এটা হয়তো চাঁদ-সূর্যের আর্কষণ বা বৈশিক ব্যপার আছে। বাংলাদেশের উত্তর মধ্যভাগে আগের মতো বৃষ্টি হয়নি। ফলে যমুনা, পদ্মা, মেঘনার জলের উচ্চতা গতবারের ছেয়ে কম। জলের উচ্চতা কম হওয়াতে এটা যখন মোহনা দিয়ে এসে সাগরে পড়ে তখন আগের চাইতে স্রোতটা কম আসতেছে। স্রোত কম হওয়ায় মাছ আর উপরে উঠতে পারছে না, তাই মাছও পাওয়া যাচ্ছে না। আরেকটা বিষয় হতে পারে প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট করার কারণে যা প্রতি বছর হয়ে থাকে। তবে আমরা এখনও আশাবাদি কারণ গত বছর শুধু সেপ্টেম্বর মাসে মাছ পাওয়া গেছে প্রায় ৪১৭ টন। আমার মনে হয় আমরা একটু অপেক্ষা করি এখনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় হয়নি। সার্বিক সিদ্ধান্ত নিতে হলে আমাদের আরও এক থেকে দেড়মাস অপেক্ষা করতে হবে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *