ঝুলে আছে ট্রাম্পের বিদায়

মতামত

নির্বাচন মানে দিনভর ভোট আর রাতে ফলাফল জানার জন্য উদ্বিগ্ন এক রজনী। কিন্তু এবারের আমেরিকার ভাগ্য নির্ধারণী ফলাফল এক রাতেই শেষ হল না। অবিস্মরণহীন, বিভ্রান্তিকর, এবং পরিচিত অনুভূতি নিয়ে রেজারের ধারের মতো আরেকটি রাত কাটানোর পর মনে হচ্ছে মার্কিনীদের অন্তত আরেকটি রাত কাটাতে হবে। অপেক্ষা করা ছাড়া এখন আর কিছুই করার নেই, আবার কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে সঠিকভাবে সেটাও কেউ বলতে পারেন না। মঙ্গলবারের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার ডেমোক্র্যাট প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেন হোয়াইট হাউসের প্রবেশের লড়াইয়ে হাড্ডাহাড্ডি প্রতিযোগিতায় আবদ্ধ থাকায় যারা নির্বাচনের রাতেই বিজয় সম্পর্কে স্পষ্ট হতে পারবেন আশা করেছিলেন তারা কিছুটা হতাশ হয়েছেন বলতে পারি।

আবারও মার্কিন জাতির ভাগ্য নির্ভর করছে মধ্য পশ্চিম অঞ্চলের রাজ্য উইসকনসিন, মিশিগান এবং পেনসিলভেনিয়ার উপর। এসব রাজ্য “নীল প্রাচীর” হিসেবে পরিচিত, মানে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে যাওয়ার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে তাদের। কিন্তু চার বছর আগে রিপাবলিকানরা তা দখল করেছিল। তবে এবার সে তিনটি বাইডেনের প্রায় দখল অবস্থা থেকে রক্ষার জন্য লড়াই করছেন ট্রাম্প। সেখানেই ঝুলে আছে নির্বাচনের চূড়ান্ত রায়।

 ২০১৬ সালের নির্বাচনে আমেরিকাকে গ্রেট বানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ট্রাম্প যে উগ্র জাতীয়তাবাদের চর্চা শুরু করেছেন সেখানে কারও চোখে ‘বাঘের বাচ্চা’ আর কারো চোখে তিনি হয়েছেন চরম ভ্রষ্ট, মিথ্যুক, বর্ণবাদী, মুসলিম বিদ্বেষী রাষ্ট্র প্রধান হিসেবে। মিডিয়ার চোখে ছিলেন ক্লাউন। অভিবাসী নির্ভর রাষ্ট্রটিতে তিনি অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলেছেন পুরো শেতাংঙ্গ সংখ্যা গরিষ্ঠ মার্কিন সমাজকে। নির্বাচনে জয়ী হয়ে বাইডেনকে সবার আগে সেই ভঙ্গুর সমাজকে জোড়া লাড়ানোর কাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে এখন। আর ট্রাম্প যদি কোনো কেরামতিতে টিকে যায় মার্কিন সমাজের বিভক্তিটা দেশের ভাঙনের দিকে যাওয়া বিচিত্র নয় 

রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত সংসদ কর্তৃক পেনসিলভেনিয়ায় নির্বাচনি কর্মকর্তাদের নির্বাচনের দিনের আগে মেল-ইন ব্যালট প্রক্রিয়াকরণে নিষেধাজ্ঞা জারি করে নির্বাচনে কূটবুদ্ধি চালানোর পূর্বাভাস দিয়েছিল ট্রাম্প শিবির। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি রায় দিয়েছে যে রাজ্যটি নির্বাচনের দিন আগে পোস্টমার্কযুক্ত দেরিতে আসা মেল-ইন ব্যালট গ্রহণ করতে পারে। ট্রাম্প এই সপ্তাহের শুরুতে সাংবাদিকদের সাবধান করে দিয়েছিলেন, ‘নির্বাচন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা আমাদের আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলবো। আমরা নির্বাচনি রাতেই যেতে যাচ্ছি।’ ট্রাম্পের ব্যালট মামলার হুমকি নিয়ে তখন উপহাস করেছিলেন বাইডেন।

ভোট গণনার রাতেই নিজেকে জয়ী ঘোষণা করে ভোট গণনা বন্ধ করতে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প আর অভিযোগ করেছেন তার বিজয় ছিনিয়ে নিতে চাচ্ছে বিরোধী শিবির। শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প শিবির পেনসিলভানিয়া, উইসকনসিন, জর্জিয়া এবং মিশিগানে ভোট গণনা বন্ধ করার জন্য আইনের আশ্রয় নিয়েছে। ট্রাম্প, প্রতারণার অভিযোগ এনেছেন সত্য কিন্তু কোনো প্রমাণ দেননি। বাইডেন প্রচারণা শিবির বলছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্য ‘আপত্তিকর’ এবং তারা আরো বলছে ‘গণনা বন্ধ হবে না’।

এ পর্যন্ত রায়ে প্রয়োজনীয় ২৭০টি ইলেকটোরাল ভোট সংগ্রহে ট্রাম্পের চেয়ে স্পষ্ট ভোটে বাইডেন এগিয়ে রয়েছেন। বলা যায় বিজয়ের হাসি তিনিই হাসবেন। বাইডেন এ পর্যন্ত মার্কিন ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়ে রেকর্ডও সৃষ্টি করেছেন আর মার্কিনিরা ১৯০০ সালের মার্কিন নির্বাচনে ৭৩ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট দিয়ে রেকর্ড করেছিল। তা ছিল অল্প পরিমাণ ভোটারের নির্বাচন যেহেতু তখন মহিলারা ভোটার ছিল না। কিন্তু এবারের রেকর্ড অতীকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত ৬৬.১ শতাংশ ভোট পড়েছে অনুমান করা হচ্ছে। গতবার মানে ২০১৬ সালে এটা ছিল ৬০.১ শতাংশ। এর আগে ১৯৬০ সালে সর্বোচ্চ ৬৩.৮ শতাংশ ভোট প্রাপ্তির রেকর্ড ছিল। সে রেকর্ড ওবামার প্রথম নির্বাচন ২০০৮ সালে ভেঙেছিল ৬১.৬ শতাংশ দিয়ে।

গতবারের তুলনায় জনপ্রিয় ভোট সংখ্যা বেড়েছে ট্রাম্পেরও। কিন্তু এখন পর্যন্ত পাওয়া ফল বলছে, গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটলগ্রাউন্ড অ্যারিজোনা, জর্জিয়া, উইসকনসিন এবং পেনসিলভিনিয়ায় হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে। জো বাইডেন বলেছেন, এটা পরিস্কার যে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় রাজ্যগুলোতে জয় পাচ্ছেন। যদিও মূল ফলাফল এখনো আসেনি। সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বাইডেন বলেছেন ‘যখন গণনা শেষ হবে তখন আমরা বিশ্বাস করি আমরাই জয়ী হব’। শেষ ব্যালটটি গণনা পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করবো বিজয় উল্লাসের জন্য।

মার্কিন সমাজ এখন উদ্বিগ্ন যে নির্বচন পরবর্তী পরিস্থিতি কিভাবে ঠাণ্ডা করা যায়। ইতিমধ্যে রায় নিয়ে উদ্বিগ্ন জনতা রাস্তায় নেমেছে কয়েকটি রাজ্যে। এটা শুধু দুই-দল নির্ভর রাজনীতির স্পষ্ট বিভক্তি নয়, পুরো মার্কিন সমাজের কঠিন বিভক্তিটা তুলে ধরেছে। এরচেয়ে অশোভনীয় পরিবেশের নির্বাচন মার্কিনিরা আর দেখেনি। দেখেনি এতো কাছাকাছি ভোটের ব্যবধানও। বিশেষ করে দুই প্রার্থীর ভোটের ব্যবধান ৫-১০ শতাংশ থেকে যখন এক শতাংশের কাছাকাছি, কিংবা আরো কমে নেমে আসে তখন সমাজের বিভক্তিটা টের পাওয়া যায়।

গত চারটি বছর আমেরিকান ইতিহাসের সর্বাধিক বিভাজক এবং অসাধু প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প আমেরিকার বড় দুটি স্তম্ভ- সত্য এবং বিশ্বাসের উপর আক্রমণ করেছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প তার মেয়াদের একদিনও দেশের সমস্ত মানুষের প্রেসিডেন্ট হওয়ার চেষ্টা করেননি, এবং তিনি যেভাবে নিয়ম ভেঙেছেন এবং নিয়ম, রীতি-নীতি নষ্ট করেছেন তা আর কোনো প্রেসিডেন্ট কখনো সাহস করেননি। এমন কি ভোটের রাত অবধি তিনি সেটা দেখিয়েছেন, যখন তিনি মিথ্যাভাবে নির্বাচনের জালিয়াতির দাবি করেছেন এবং সুপ্রিম কোর্টকে পদক্ষেপ নেওয়ার এবং ভোটদান বন্ধ করার জন্য আহ্বান করেছেন।

ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, “সত্যই, আমরা এই নির্বাচনে জয়ী হয়েছি,”। তিনি যখন এ দাবি করছেন তখনও উইসকনসিন, মিশিগান, পেনসিলভেনিয়া, জর্জিয়া, অ্যারিজোনা এবং নেভাদায় লক্ষ লক্ষ ব্যালট গণনা করা বাকি ছিল। “আমরা মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে যাব,” ট্রাম্প কীভাবে বা কী ভিত্তিতে অভিয়োগ করছেন তার ব্যাখ্যা না দিয়ে যোগ করেন, “আমরা চাই সকল ভোটদান বন্ধ হোক।

লেখক : আনিস আলমগীর, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

মন্তব্য করুন