এম. এ. বাকী বিল্লাহ :
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচন ২০২৫ বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির এক নতুন বাস্তবতার দ্বার খুলে দিয়েছে। এই নির্বাচন কেবল ক্যাম্পাস রাজনীতির জন্য নয়, জাতীয় রাজনীতির জন্যও একটি গভীর বার্তা বহন করছে। ইসলামী ছাত্রশিবির–সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ জোটের অভাবনীয় উত্থান যেমন বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে, তেমনি বাংলাদেশ ছাত্রদল ও বাগছাসের অপ্রত্যাশিত ব্যর্থতা ছাত্ররাজনীতির সংকটকে স্পষ্ট করেছে।
ছাত্রদল দুটি নির্বাচনী মঞ্চেই শিক্ষার্থীদের আস্থা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। এর পেছনে প্রধান কারণ—সিনিয়র নেতাদের বিতর্কিত আচরণ, জুলাই আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হওয়া স্বত্তেও অন্যান্য অংশীজনদের ঘিরে অসংবেদনশীল মন্তব্য এবং ক্যাম্পাসে সংগঠনের দীর্ঘ অনুপস্থিতি। একইসাথে শিক্ষার্থীরা মনে করেছে, বিএনপি আগামী নির্বাচনে ক্ষমতায় এলে ছাত্রদলও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মতো আগ্রাসী হয়ে উঠতে পারে। ছাত্রলীগের দেড় দশকের দমন-নিপীড়নের চিত্র এখনও শিক্ষার্থীদের চোখে ভাসমান। ফলে ভালো প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও ছাত্রদল সমর্থন পায়নি।
অন্যদিকে, ইসলামী ছাত্রশিবির–সমর্থিত জোট ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেছে। তারা কেবল শিবিরের ব্যানারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং সাধারণ শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করেছে। জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ, ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও দেশীয় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান, আবাসিক হলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন সহাবস্থান এবং দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হওয়া—এসব কারণে তারা শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে জাকসু নির্বাচনে মাঠপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিশে কাজ করার ধারা তাদের জয়কে সুদৃঢ় করেছে।
বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস), যারা জুলাই অভ্যুত্থানের পর উদ্ভূত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছাত্রসংগঠন, তারাও ব্যর্থ হয়েছে। অভ্যন্তরীণ বিভাজন, অতিরিক্ত স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং কিছু নেতাকর্মীর অসদাচরণের কারণে সংগঠনটি বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা তাদের আস্থা ভোট দিতে দ্বিধা করেছে।
ডাকসু-জাকসুর এই নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে—আজকের শিক্ষার্থীরা আর আতঙ্ক, পেশিশক্তি কিংবা দাপটের রাজনীতি চায় না। তারা আস্থাশীল, স্বচ্ছ ও সৎ নেতৃত্ব চায়। অতীতের দম্ভ নয়, বরং বর্তমানের কর্মকাণ্ড ও ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনার ভিত্তিতেই তারা নেতৃত্বকে মূল্যায়ন করে।
জাতীয় রাজনীতির জন্যও এই বার্তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে বিএনপির জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা। শিক্ষার্থী সমাজে আস্থা অর্জন করতে হলে প্রয়োজন তরুণ ও মেধাবী নেতৃত্বকে সামনে আনা, বিভাজন দূর করা এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করা। অন্যথায় ছাত্রদলের মতো বিএনপিও আগামী দিনে আস্থা সংকটে পড়বে।
শেষ পর্যন্ত ডাকসু ও জাকসুর নির্বাচন প্রমাণ করেছে—যে সংগঠন বিনয়ী নেতৃত্ব প্রদর্শন করবে, শিক্ষার্থীদের ভাষায় কথা বলবে এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখবে, সেই সংগঠনই আস্থা পাবে। জাতীয় রাজনীতিতেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। যে নেতা যত বিনয়ী, যুক্তিসম্মত ও সংযুক্ত—তার জয় ততটাই নিশ্চিত।
লেখক ও সংগঠক
স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, রাজনীতি বিজ্ঞান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়