ঢাক-ঢোল বানিয়ে চলে সংসার

সারাবাংলা

গাইবান্ধা প্রতিনিধি:
আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের কারণে ঢাক-ঢোলের কদর কমলেও পূজা-পার্বন বা বিভিন্ন সঙ্গীতানুষ্ঠানে এখনও ঢাক-ঢোলের কদর রয়েছে। আর এই বাদ্যযন্ত্র বানিয়ে সংসার চালাচ্ছেন নেপেন চন্দ্র দাস নামের এক ব্যক্তি। নেপেন চন্দ্র দাসের বাড়ি রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার হাসানপুর (ঋশিপাড়া) গ্রামে। তিনি মাদারগঞ্জ হাট সংলগ্ন পীরগঞ্জ পাকা সড়কের পাশের ওই গ্রামের দেবেন্দ্র নাথ দাসের ছেলে। সরেজমিনে জানা যায়, ছিন্নমূল পরিবারে জন্ম নেপেন চন্দ্র দাসের। তার বয়স এখন প্রায় ৫০ ছুঁই ছুঁই করছে। ২৫ বছর আগে বিয়ে করেন মাধুবী রানী দাসকে। এ বিয়ের ছয় মাসের মধ্যে বাবার হাঁড়ি থেকে আলাদা করে দেওয়া হয় নেপেনকে। এরপর কর্মের অভাবে নববধূ মাধবী রানীকে নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন কাটাতে হচ্ছিল। গরীব পরিবারের দরিদ্রতার কষাঘাতে নতুন সংসার গোছাতে হিমসিম খাচ্ছিলেন তিনি। এরই মধ্যে পার্শ্ববর্তী শানেরহাট এলাকার গোপিনাথ চন্দ্র নামের এক ব্যক্তির কাছে ঢাক-ঢোল-তবলাসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বানানোর কাজ শিখে নেয়। এরপর আত্মীয়-স্বজনদের ঋণ নিয়ে নিজ বাড়িতে শুরু করে মাটির খোল আর কাঠ-চামড়া দিয়ে বাদ্যযন্ত্র বানানোর কাজ। সেই সময়ে এসব যন্ত্রের চাহিদা ছিল অনেক বেশি। এ কারণে অল্প সময়ের মধ্যে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয় নেপেন চন্দ্র দাস। তার সংসারে ফিরে আসে স্বচ্ছলতা। ইতোমধ্যে তিনি দাম্পত্য জীবনে দুই মেয়ে ও এক ছেলের জনক। ক্ষুদ্র এই ব্যবসা করে বড় মেয়ে তাপসী দাসকে বিয়েও দিয়েছেন। ছোট মেয়ে মল্লিকা সবেমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয় পড়ছে। আর ছেলে তাপস চন্দ্র দাস সপ্তম শ্রেণিতে অধ্যায়নরত। নেপেন চন্দ্রের একমাত্র পেশা বাদ্যযন্ত্র বিক্রির লাভের টাকা দিয়ে সম্ভব হয়েছে মেয়েকে পাত্রস্থ করা এবং অপর ছেলে-মেয়েরও লেখা-পড়ার খরচ যোগান। তবে এ পেশা দিয়ে পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণে সক্ষম হলেও বাড়তি কোন অর্থ-সম্পদ বা পুঁজি গঠন করতে পারেনি। বাদ্যযন্ত্র তৈরি সম্পর্কে নেপেন চন্দ্র দাস বলেন, স্থানীয় শানেরহাট কুমারপাড়া থেকে মাটির খোল আর পলাশবাড়ী-ধাপেরহাট থেকে চামড়া কিনতে হয়। এগুলো রং-কাটিং করে বানানো হচ্ছে তবলা, ডুগি, খোল, ঢাক, ঢোল, সাইটড্রাম ও দো-তারাসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র। এসব যন্ত্র প্রকার ভেদে দেড় হাজার টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা হয়। যার প্রতিটি যন্ত্রের বিক্রি মূল্যের লাভ হয় অর্ধেকে। বাড়িতে এসে বিভিন্ন এলাকার মানুষ বাদ্যযন্ত্র কিনে নিয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, বর্তমান সময়ে আধুনিক যন্ত্রপাতির কারণে ঢাক-ঢোলের বাজনা কমে যাচ্ছে। যার ফলে মাটি-চামড়ার বাদ্যযন্ত্র চাহিদা কমেছে অনেকটাই। সেই সঙ্গে লোকালভাবে বিক্রি করায় এ পেশায় টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে মোটা অংকের পুঁজি থাকলে পাইকারী বিক্রি করতে পারলে ফের লাভবান হওয়া যেতো। কিন্ত অর্থ সংকটের কারণে সেটি সম্ভব হচ্ছে না। পীরগঞ্জের মিঠিপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ফারুকুল ইসলাম ফারুক জানান, দীর্ঘদিন যাবৎ নেপেন চন্দ্র দাস বাদ্যযন্ত্র বানানোর কাজ করছে। তবে বর্তমান সময়ে আধুনিক যন্ত্রপাতির আধিক্যে মাটি-চামড়ার যন্ত্রের ব্যবহার কমে যাচ্ছে। তবও নেপেন চন্দ্র পেশাকে আঁকড়ে ধরে রয়েছে। তার পেশাটি যেন হারিয়ে না যায়, সেই বিষয়ে সহযোগিতা করা হবে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *