দামি গাড়ি-এমএনপি ব্যবহার করছে দুর্ধর্ষ ডাকাতরা

জাতীয়

এসএম দেলোয়ার হোসেন:
নম্বর ঠিক রেখে অন্য অপারেটর ব্যবহারের সুবিধা দিতে চালু হয়েছিলো মোবাইল নম্বর পোর্টেবিলিটি (এমএনপি) সার্ভিস। অথচ এই সার্ভিস এখন ব্যবহার করছে সংঘবদ্ধ ডাকাতরা। তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে এবং গ্রেফতার এড়াতেই এমএনপি এবং নামিদামি গাড়ি ব্যবহার করছে। এর ফলে ডাকাতি কর্মকাণ্ড চালিয়ে নির্বিঘ্নে পার পেয়ে যাচ্ছিল ডাকাতচক্রের সক্রিয় সদস্যরা। সম্প্রতি বিভিন্ন তথ্য-প্রযুক্তির ভিত্তিতে পুলিশি অভিযানে ১৭ সদস্যের দুর্ধর্ষ একটি ডাকাত দলের ৭ সদস্য ধরা পড়ার পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে পুলিশ। প্রযুক্তি বিশেশজ্ঞরা বলছেন, মোবাইল অপারেটরদের অসতর্কতার কারণে আপরাধীরা গ্রেফতার এড়াতে মোবাইল নম্বর পোর্টেবিলিটি (এমএনপি) সার্ভিস ব্যবহার করে নির্বিঘ্নে অপরাধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। এসব প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও তৎপর হতে হবে। একই সঙ্গে মোবাইল অপারেটর কোম্পানিগুলোকে আরও সতর্ক হতে হবে। পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি লালবাগের আজিমপুর শাখার উত্তরা ব্যাংক থেকে টাকা তুলে ফিরছিলেন প্লাস্টিক ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমানের এক কর্মী। পথে টাকা বহনকারী ওই কর্মীকে র‌্যাব পরিচয়ে তুলে একটি গাড়িতে তুলে নেয় সংঘবদ্ধ দুর্বৃত্তরা। পথিমধ্যে বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা ছিনিয়ে নিয়ে ওই কর্মীকে নারায়ণগঞ্জে ফেলে রেখে পালিয়ে যায় র‌্যাব পরিচয় দানকারী দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় লালবাগ থানায় একটি মামলা হয়। ঘটনার তদন্তে নামে পুলিশ। ঘটনাস্থল পর্যবেক্ষণ শেষে ব্যাংকের ভেতর ও বাইরে থাকা সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। ওইদিন বেলা ৩টা ২ মিনিটে ব্যাংকে ঢুকছেন সন্দেহভাজন এক ব্যক্তি। ব্যাংকের অন্য ক্যামেরাতেও ব্যাংকের ভেতর তার সন্দেহভাজন চলাফেরা লক্ষ্য করা যায়।
পুলিশ জানায়, ঘটনার দিন বিকেল ৩টা ৪৮ মিনিটে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের আগের একটি রাস্তায় থাকা সিসিটিভি’র ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়। ওই ফুটেজ পর্যালোচনা করে পুলিশ দেখতে পায় একটি প্রাইভেটকার ছুটে যাচ্ছে। অপর একটি সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করে পুলিশ দেখতে পায় বিকেল ৪টা ৬ মিনিটে ওই প্রাইভেটকারটি হানিফ ফ্লাইওভার পার হয়।
মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, ঘটনার পর সম্ভাব্য বিভিন্ন সড়ক ও ব্যাংকটির ভেতর ও বাইরে থাকা সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহের পর তা নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। প্রাপ্ত সিসিটিভির ফুটেজ আর প্রযুক্তির সহায়তায় আসামিদের শনাক্ত করা হয়। এরপর অভিযান চালিয়ে লালবাগ থানা পুলিশ একে একে গ্রেফতার করে সংঘবদ্ধ ডাকাতচক্রের সক্রিয় ৭ সদস্যকে। এ সময় তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় র‌্যাবের জ্যাকেট, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীর কার্ড। তারা আরও জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাক পরে টার্গেট করা ব্যক্তিকে গাড়িতে তুলে নিয়ে নগদ টাকাসহ সর্বস্ব কেড়ে নেওয়ার পর নির্জন কোনো স্থানে ফেলে রেখে পালিয়ে যেত অপরাধীরা। শুধু তাই নয়, দুর্ধর্ষ ডাকাতরা গ্রেফতার এড়াতে বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ডে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের দামি গাড়ি ব্যবহার করে আসছিল। গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদেই এসব তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা।
এদিকে প্রযুক্তিবিদ সুমন আহমেদ সাবির জানান, মোবাইল অপারেটরদের অসতর্কতার কারণে আপরাধীরা গ্রেফতার এড়াতে মোবাইল নম্বর পোর্টেবিলিটি (এমএনপি) সার্ভিস ব্যবহার করে নির্বিঘ্নে অপরাধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। এসব প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও তৎপর হতে হবে। একই সঙ্গে এমএনপির মতো সার্ভিস যাতে অপরাধীরা সহসাই ব্যবহার করতে না পারে, সেজন্য মোবাইল অপারেটর কোম্পনিগুলোকে আরও সতর্ক হতে হবে। তবেই এমএনপির মতো সার্ভিস ব্যবহারের প্রবণতা কমে আসবে। এর ফলে অপরাধ প্রবণতাও কমে যাবে।
এদিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) লালবাগ বিভাগের উপ-কমিশনার বিপ্লব বিজয় তালুকদার জানান, তাদের অভিযানে এ পর্যন্ত যেসব অপরাধী বা ডাকাত দল গ্রেফতার হয়েছে, তাদের থেকে সম্প্রতি গ্রেফতারকৃত ডাকাত দলটির কৌশল একেবারেই ভিন্ন। তারা গ্রেফতার এড়াতে এক অপারেটরের মোবাইলের নম্বর ঠিক রেখে অন্য অপারেটরের মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে আসছিল। যা মোবাইল নম্বর পোর্টেবিলিটি (এমএনপি) সার্ভিস নামে পরিচিত। এমএনপি সার্ভিস ব্যবহারকারীরদের তালিকা থেকে অপরাধীদের বের করতে কাজ চলছে বলেও জানান ডিএমপির লালবাগ বিভাগের শীর্ষ এই পুলিশ কর্মকর্তা।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *