দিগন্তজুড়ে হলুদের সমারোহ

সারাবাংলা

ইমরুল হাসান বাবু, টাঙ্গাইল থেকে:
টাঙ্গাইলের ১২টি উপজেলার আবাদের মাঠে এখন হলুদের সমারোহ। মাঠের পর মাঠ জুড়ে সরিষার চাষ করা হয়েছে। চারিদিকে সরিষা গাছের হলুদ ফুলের সমারোহ শোভা পাচ্ছে। দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। এ যেন কুয়াশায় ঢাকা শীতের চাঁদরে দিগন্ত জোড়া সরিষার হলুদ মাঠ। মাঠজুড়ে হলুদ ফুলের সমারোহ। সরিষার ফুলে আকৃষ্ট মৌমাছি- তারা ব্যস্ত মধু আহরণে। সরিষা ফুলের হলুদ রাজ্যে মৌমাছির গুঞ্জনে মুখরিত হয়ে ওঠেছে গোটা মাঠ। হলুদ রঙের চাঁদরে আবৃত টাঙ্গাইল জেলার সরিষা চাষিরা কাঙ্খিত ফলন পাওয়ার আশা করেছেন। সরেজমিনে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, চারদিকে যেন সবুজের ফাঁকে হলুদের সমাহার। মাঠের পর মাঠ হলুদ পরিপূর্ণ। কখনো কখনো সরিষার ক্ষেতে বসছে পোকাখাদক বুলবুলি ও শালিকের ঝাঁক। শীতের কুয়াশাকে উপেক্ষা করে চাষিরা সরিষা ক্ষেতের পরিচর্যা করছেন। প্রায় সবারই ক্ষেতে সরিষা বোনা শেষ। এখন সরিষা ঘরে তোলার অপেক্ষা করছেন কৃষকরা। রাস্তার দু’পাশের জমিগুলোতে সরিষার চাষ করা হয়েছে। বাতাসে দুলছে এসব সরিষা ফুল। ফুলের এই দোল খাওয়া সবার মন কেড়ে নেয়। অসংখ্য মৌমাছির দল গুণগুনিয়ে মধু আহরণে ব্যস্ততায় সরিষা ফুলের শোভা আরও বাড়িয়ে তুলেছে। সরিষার ফুলে ফুলে হলুদ বর্ণের জমিগুলোতে আশপাশ সহ দূর-দূরান্ত থেকে সৌখিন প্রকৃতি প্রেমিকরা বেড়াতে আসছেন। আবার সরিষার ফুলের সৌন্দর্যকে ধরে রাখাতে অনেক তরুণ-তরুণী ক্যামারা ও ভিডিও’র মাধ্যমে নিজের ছবির সঙ্গে সরিষা ফুলের ছবি ধরে রাখছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, জেলায় এবার উফশী জাতের ২১ হাজার ২১৫ হেক্টর ও স্থানীয় জাতের ২৪ হাজার ৪৪৫ হেক্টর মোট ৪৫ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ করা হয়েছে। ফলনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৭ হাজার ৯৬৮ টন। এরমধ্যে সদর উপজেলায় ৫ হাজার ৩০ হেক্টর, বাসাইলে ৪ হাজার ৮২০হেক্টর, কালিহাতীতে ৩ হাজার ১৩০ হেক্টর, ঘাটাইলে ২ হাজার ৩৫২ হেক্টর, নাগরপুরে ১০ হাজার ৭৫ হেক্টর, মির্জাপুরে ৮ হাজার ৯৪৫ হেক্টর, মধুপুরে ৪৬২ হেক্টর, ভূঞাপুরে ১ হাজার ৮৩০ হেক্টর, গোপালপুরে ৩ হাজার ৬০ হেক্টর, সখীপুরে ২ হাজার ১৪০ হেক্টর, দেলদুয়ারে ২ হাজার ৫৫০ হেক্টর এবং ধনবাড়ী উপজেলায় ৪৫০ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ করা হয়েছে। জেলায় গত বছর ৪১ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ করা হয়েছিল। কৃষকরা জানায়, এবার সরিষা ক্ষেতে ভালো ফুল ফুটেছে বিধায় ভালো ফলনও আশা করা যায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে চলতি মৌসুমে সরিষার ভালো ফলন আশা করছেন কৃষকরা। আমন ধান ওঠার পর বোরো ধান লাগানোর আগ পর্যন্ত জমি ফাঁকা থাকে। তাই শাক-সবজির পাশাপাশি তারা সরিষার আবাদ করে থাকেন। প্রতি বিঘা জমিতে সব মিলিয়ে খরচ হয় প্রায় সাড়ে ৩ হাজার টাকা। ফলন ভালো হলে এক বিঘা জমিতে প্রায় ৬ মণ সরিষা উৎপাদিত হয়। সদর উপজেলার কৃষক লাল মিয়া, বাহাদুর মিয়া, কালিহাতী উপজেলার অমল চক্রবর্তী, আব্দুর রশিদ, দেলদুয়ারের ময়নাল হক, কাদের প্রামাণিক, মির্জাপুরের জাহিদ হোসেন, রকিবুল আলম, নাগরপুরের ছালামত মিয়া, নাজমুল করিম সহ অনেকেই জানান, সরিষা আবাদে সেচ, সার ও কীটনাশক অনেক কম ব্যবহৃত হওয়ায় খরচও কম হয়। প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগ না হলে এবার বাম্পার ফলন হবে। তারা আরও জানান, সরিষা চাষ করে মানুষ শুধু তেল তৈরি করে না। এই সরিষা ভাঙিয়ে খৈল ও গাছ থেকে ভূষি তৈরি হয়। যা গরুর ভালো খাদ্য এবং ভালো জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। এছাড়া সরিষা ক্ষেতের পাশে মৌচাষিরা বাক্স স্থাপন করে মধু উৎপাদন করে থাকে। মৌমাছি সরিষা ফুল থেকে মধু আহরণ করে থাকে। এতে সরিষার পরাগায়ণ বেড়ে যায়, ফলনও ভালো হয়। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আহসানুল বাশার জানান, দেশের আবহাওয়া বান্ধব সরিষা একটি লাভজনক ফসল। মাত্র ৭০ থেকে ৮৫ দিনের মধ্যে এর ফলন পাওয়া যায়। সরকারি প্রণোদনার আওতায় কৃষকদেরকে এক বিঘা জমির জন্য সার ও বীজ দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, গত বছরের চেয়ে এ বছর প্রায় ৪ হাজার হেক্টর বেশি জমিতে সরিষা আবাদ করা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবারও সরিষার ভালো ফলন হবে। তিনি আরও জানান, সরিষা চাষিদের সহায়তায় কৃষি বিভাগের মাঠকর্মীরা সব সময় ক্ষেতের খোঁজ রাখছেন। বেশ কয়েকদিন যাবৎ কুয়াশা দেখা গেলেও কোথাও সরিষা ক্ষেতে কোন সমস্যা দেখা যায়নি।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *