দুঃখ নিত্যসঙ্গী

সারাবাংলা

পুর্নিমা রানী, পূর্বধলা থেকে:
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্ত ঘেঁষে অবস্থিত ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা জেলার গারো পাহাড়। পূর্বধলা উপজেলায় আগিয়া ইউনিনিয়নের উত্তর ও দক্ষিণ কালডোয়ার, হোগলা ইউনিয়নের- জামকোনা, কালিহর, হোগলা সদর, সোহাগি ডহর, সাধুপাড়া, বিশকাকুনি ইউনিয়নের- হলুইদাটি, নারান্দিয়া ইউনিয়নের-পাইলাটি, পূর্বধলা সদর ইউনিয়ন মিলে প্রায় ৩০০টি পরিবারে ১৫০০ জন গারো আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করে। সরেজমিনে দেখা যায়, গারো আদিবাসীদের দিনকাল ভালো যাচ্ছে না। এসব গারোদের জীবনমানে প্রতিনিয়ত চলছে বাঁচার লড়াই। কেউ তাদের খোঁজ নেয় না। সরকার আসে, সরকার যায়। উন্নয়ন হয় অনেক কিছুর। কিন্তু গারোদের ভাগ্যের কোনো উন্নয়ন হয় না। কথাগুলো আক্ষেপের সুরে বলেন পূর্বধলা কারডোয়ার গ্রামের গারো আদিবাসী লাভলী দান্দালি, সুচিত্রা দান্দলী নুপুর মানকিন, বিকাশ মানকিন, ফিলিফ মাংসাং, দেবী চামুগম, দিপ্তি হাজং। তারা আরও জানান, এখানে প্রায় ২৮ কাঠা জমি রয়েছে, যে জমি তাদের নিজের নয়। জমির মালিক ছিল প্রয়াত মনীন্দ্র, রনু দান্দালী সন্তোষ রংদি। ওই জমিতে আমরা ৬৫টি পরিবারের ৩০০ আদিবাসী দীর্ঘ যুগ ধরে বসবাস করে আসছি। কোনো দিন খেয়ে, কোনো দিন না খেয়ে চরম অবহেলার মধ্য দিয়ে। নারীরা মধ্যে মধ্যে কৃষি শ্রম বিক্রি করে এবং জঙ্গল থেকে কাঠ বিক্রি করে যে আয় হয় তা দিয়েই চলতে হয় আমাদের। এ ছাড়া ছয় মাস কুচিয়া বিক্রি করার কাজে পুরুষরা বাইরে থাকে, যা আয় রোজগার হয় তা ছাড়া আর কোনো আয় নেই। কোনো রকমে এক বেলা খায় উপার্জন না হলে সে দিন খাওয়া হয় না। তাদের দিন এভাবেই চলছে তো চলছেই। নেই থাকার ঘর নেই সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের কোনো উদ্যোগ। তাদের দেখার মত কেউ নেই। এই করোনা পরিস্থিতিতে খাদ্য সংকট চরম আকার দেখা দিয়েছে। ঢাকুয়া মিশনের ফাদার রবার্ট মানখিননের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, পড়াশুনা ও ধর্মীয় সহযোগিতা ছাড়া আর কোনো সহযোগিতা করার সুযোগ নেই। আদিবাসী লেখক ও গবেষক আলী আহাম্মদ খান আইয়ূব বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বিশেষ করে গারো দরিদ্রদের অভাব। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে তাদের প্রতি অবহেলা। সরকারি ও বে-সরকারিভাবে অসহযোগিতার কারণে তাদের চরম অভাব। সরকারিভাবে উন্নয়নের চেষ্টা করলে তাদের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
তাদের অনেকেই দাবি করেন আমরা ৯৯ ভাগ নৃ-তাত্ত্বিক পরিবারের সদস্যরা দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করে আসছি। কালের আবর্তনে সবকিছু হারিয়ে আজ দিশেহারা। এখন আমাদের অধিকাংশের নেই নিজস্ব কোনো জমি। হলুইদাটির সুজয়া রেমা বলেন, উপজেলার নৃ-তাত্ত্বিক গারো এখন দিনমজুর ভূমিহীনে পরিণত হয়েছে। নারীরাই ক্ষেতে খামারে, মাঠে-ময়দানে এমনকি সংসারের সব কাজ কর্ম করে থাকে। আর পুরুষরা বাড়িতে বসে তাদের ছেলে-মেয়েদের দেখাশোনা করে থাকে। তবে অতীতের তুলনায় অনেক পুরুষ এখন আর ঘরে বসে থাকতে চাইছে না। বছরে দুই মাস আমন ও ইরি-বোরো মৌসুমে এ উপজেলার নারী-পুরুষ শ্রমিকরা কৃষির উপর শ্রম বিক্রি করে যা পায়, তাই দিয়ে কোনো রকমে পরিবারের সদস্যদের জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। বাকি ১০ মাস তাদের থাকতে হয় বেকার, নির্ভর করতে হয় গারো পাহাড়ের বনাঞ্চল অথবা কুচিয়ার উপর। নারীরা বড় বড় সড়ক বা গ্রামের জঙ্গল থেকে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করে রান্নার কাজ চলায় এবং কিছু কিছু বিক্রি করে। বলতে গেলে একেবারে মানবেতর জীবন-যাপন চলছে।
গারোরা এখন শিক্ষা গ্রহণসহ কর্মসংস্থানের জন্যে ঢাকা শহরে যাওয়ায় জীবনমান উন্নত হয়েছে। ভবিষ্যতে যারা অতিদরিদ্র তাদের সংকট অনেকাংশে লাঘব হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। আর নানা দিক থেকে অবহেলিত ও পিছিয়ে রয়েছে গারো সম্প্রদায়ের এসব লোকজন। তাদের অভিযোগ এখানে তুলনামূলকভাবে পায়নি ভিজিডি ভিজিএফ কার্ড, বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতা। উপজেলার গারো আদিবাসীরা শিক্ষায়-দীক্ষায়ও রয়েছে অনেক পিছিয়ে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *