ধর্ষণ রাজনৈতিক নয় সামাজিক রোগ

সম্পাদকীয়

বিগত কয়েকদিন ধরে ধর্ষণ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম খুব সরব। প্রথমে আসলো কোটা সংরক্ষণ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গঠিত ছাত্র অধিকার পরিষদের এক নেত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ। এরপর আসলো সিলেটের এমসি কলেজে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী স্বামীকে আটকে রেখে এক মেয়েকে ধর্ষণের ঘটনা। দুটো নিয়েই পাল্টাপাল্টি কথাবার্তা দেখছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ছাত্রী ভিপি নুরু সহ তার ছাত্র সংগঠনের নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলেন সেটি একটি রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছিল। একদল ছিল মেয়েটির কথিত প্রেমিক, নুরু ও তার সাঙ্গাতদের বিচার করার পক্ষে। আরেক দল ছিল নুরু গংকে ধোয়াতুলসী বানিয়ে তাদেরকে ফেঁসে দেওয়া হচ্ছে বলে সরকারকে অভিযোগ করার দলে।

এরপর সিলেটের ঘটনা সামনে আসায় অনেকটা ধামা চাপা পড়েছিল নুরুদের ঘটনা। কিন্তু চার অক্টোবর নোয়াখালির বেগমগঞ্জের এক গৃহবধুকে নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যাওয়ায় আগের সব কিছু নিস্তব্ধ না হলেও তলিয়ে গেছে। এই ঘটনা এমন বিস্ফোরণ ঘটছে যে লোকজন রাস্তায় নেমেছে। ফেইসবুক খুললে ধর্ষণ ছাড়া তেমন কোনো ইস্যু চোখে পড়ছে না। লোকজন বুঝে হোক আর আবেগে হোক- রাতারাতি ধর্ষকদের সাজা চাচ্ছেন। পারলে সে রাতেই অভিযুক্তদের ক্রসফায়ারে দিতে বলেছেন অনেকে। কিন্তু সবাই জানেন এই ঘটনাই শেষ নয়। এরপর ধর্ষণের আরো ঘটনা ঘটবে।

কেউ কেউ এর মধ্যে ধর্ষণকে রাজনৈতিক রঙ লাগানোর কাজে নেমে গেছেন। প্ল্যাকার্ডের ভাষা অন্তত তাই বলছে। কিন্তু ধর্ষণ মোটেও রাজনৈতিক ইস্যু না, এটি সামাজিক রোগ। ধর্ষক একা ছাত্রলীগ না। ধর্ষকের নাম হচ্ছে সামাজিক শক্তি। এই সামাজিক শক্তি যখন ধর্ষণ কাজে সরকারী মদত পায় আপনি তাকে রাজনৈতিক রূপ দিতে পারেন। কিন্তু যে ক’টি ঘটনাই ভাইরাল হচ্ছে, সরকার ও পুলিশ প্রশাসন যখন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছে- আপনি তখন “শ’তে শেখ হাসিনা, তুই ধর্ষক, তুই ধর্ষক” প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়ালে আপনি যে ধর্ষণ বন্ধ চান না বরং ঘর পোড়া আগুণে আলু সেদ্ধ করতে চান- সেটা বুঝা কঠিন না। প্রধানমন্ত্রীর ছবিতে আগুণ লাগানো এবং ‘ধর্ষণের বিচার পরে আগে শেখ হাসিনার পদত্যাগ চাই’ শ্লোগান- এসবই আপনার হীন রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টা।

বেগমগঞ্জের ঘটনা নিয়ে আমি ফেইসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। আমি লিখেছি-[ যেদিন স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় মার্কা দিয়ে শুরু হল, কুজাতের ছেলেরা টাকা দিয়ে মার্কা কিনে বিনা ভোটে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান হল, সমাজে গণ্যমান্যরা হলেন নগণ্য, ধ্বংসের পথে হাটা সমাজের চূড়ান্ত পতন সেখান থেকেই শুরু হয়েছে।

সমাজ বলতে এখন আর কিছু নেই। দলীয়ভিত্তিতে সমাজ এখন খণ্ড খণ্ড হয়ে আছে। জানাযাও এখন দলীয় ভিত্তিতে হয়। যেখানে সমাজ নেই, মানুষের মর্যাদা নেই, স্থানীয় জন প্রতিনিধিরা কেউ না, দলীয় নেতার পালা গুণ্ডারা রাজত্ব করে- সেখানে আপনার-আমার বস্ত্র থাকা আর বেগমগঞ্জের গৃহবধূর বস্ত্রখোলার মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই। সম্ভ্রম কারো অবশিষ্ট নেই।

সমাজপতিদের থেকে জনপ্রতিনিধি না হলে সমাজের অনাচার দেখবে কে? দুই টাকার চেয়ারম্যান? পকেটে গুণ্ডা পালা এমপি? নাকি টাকায় কেনা পুলিশ? সামাজিক অনাচার কেন বাড়ছে তার গভীরে প্রবেশ করে বের করেন। ক্রসফায়ার, কেতাবি আইন, দুর্নীতিগ্রস্থ পুলিশ প্রশাসন দিয়ে কোনকালেই সমাজের শৃঙ্খলা আসবে না। যতদিন ভদ্রলোকরা সমাজের নেতৃত্বে আসবে না, ততদিন এটাই চলবে।

আমি বলতে চেয়েছি এটি আসলে আমাদের সামাজিক সমস্যা আর আমার দৃষ্টিতে সমাজ এখন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে আছে, সমাজের তৃণমূলে কোনো মর্যাদাবান লোকদের নেতৃত্ব অবশিষ্ট নেই। আর এর প্রধান কারণ হচ্ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সঙ্গে দলীয় রাজনীতিকে সংযুক্ত করা। যারা ঘরপোড়া আগুণে আলু সেদ্ধ করতে চান তারা ছাড়া সবাই আমার বক্তব্যের সঙ্গে একমত হয়েছেন। বেগমগঞ্জের ঘটনা যে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ব্যর্থতা তার জন্য আমাকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি। পরদিন বাংলা ট্রিবিউনের খবরে দেখলাম ওই গৃহবধূ ঘটনার পর পর স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের এক মেম্বারের কাছে বিচার দিয়েছেন। সেই মেম্বার রিপোর্টারকে বলেছেন ওই মহিলা তাকে নির্যাতনের কথা বলেছেন কিন্তু কারও নাম উল্লেখ করেননি। এটা কি বিশ্বাসযোগ্য!

পরদিন প্রথম আলো রিপোর্টে পড়লাম ওই মহিলা তাকে অভিযোগ করেছে এবং অভিযুক্তদের কারা সেটাও তার অজানা নয়। তাহলে এখানে আসল দোষী কে? সবাই আমরা একযোগে কথিত ধর্ষকদের ক্রসফায়ার চাচ্ছি কিন্তু এই ধর্ষকদের প্রধান সহায়তাকারী তো ওই মেম্বার। সবার আগে এদেরকে সাজা দেওয়া দরকার। সে যদি যথাযথভাবে তার দায়িত্ব পালন করতো, ঘটনার বিচার করতো, পুলিশকে জানাতো- তাহলে ওই মহিলাকে কি ৩২ দিন বাড়ি ছাড়া হয়ে থাকতে হত! ঘটনাটি রাষ্ট্র করে, ভাইরাল করে তাকে সামাজিকভাবে দ্বিতীয় দফা ধর্ষণ করা হতো! সুতরাং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা যে দলীয় প্রতীক কিনে নতুন টাকা গজানো কতিপয় ওজনহীন লোকের হাতে পড়ে ধ্বংস ডেকে এনেছে তার আরও প্রমাণের দরকার আছে?

ওই মহিলাকে দ্বিতীয় দফা ধর্ষণের কথা বলছি এই জন্যই যে, আমরা যারা ধর্ষণের সাজা নিয়ে ফেইসবুক-টুইটার কাঁপিয়ে ফেলছি, নিজেরা ধর্ষক এবং ধর্ষণকে যে ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখি, মনেপ্রাণে ধর্ষিতার জন্য নায্য বিচার চাই- সেভাবে কি ধর্ষিতাকে সামাজিকভাবে গ্রহণ করি। অনেকে বলবেন করি কিন্তু এটা পুরোটাই মিথ্যাচার এবং হিপোক্রেসি। এ ধরনের হিপোক্রেসি আমাদের সমাজে টিকে আছে বলেই শত নারী প্রতি দিন ধর্ষিত হচ্ছে আর ওই ধর্ষণের খবর আপনার আমার কানে আসে না। আমাদের কানে আসে শুধু ভাইরাল হলে। আমাদের কানে আসে শুধু প্রতিপক্ষ এই ধর্ষণের ঘটনাটি কোনোভাবে জেনে গিয়ে ধর্ষকদের সাজা দেওয়ার ইচ্ছে পোষণ করলে কিংবা কেউ ওই ধর্ষিতাকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য সুযোগ নিলে। আর রাষ্ট্রও তাই বড় গলায় বলে- উন্নত দেশেও এরচেয়ে বেশি ধর্ষণ হয়। বেশিতো হবেই, কারণ সেখানে রেকর্ড আছে, মামলা আছে। এখানে তার ছটাকও রেকর্ডে নেই।

চিন্তা করে দেখুন আপনার বোন ধর্ষিত হয়েছে, আত্মীয়-স্বজন কেউ ধর্ষিত হয়েছে, আপনি কি করবেন? আপনি প্রথমে অবশ্যই আইনের আশ্রয় নেওয়ার কথা চিন্তা করবেন। কিন্তু পরে নিরবে হজম করে নেবেন। ঘটনা তেমন জানাজানি না হলে আপনি আইনের আশ্রয় নিবেন না কারণ তার প্রতিক্রিয়া ভেবে। বোনটি যদি অবিবাহিত হয় তার বিয়ের সমস্যা হবে। সমাজ তাকে দোষী ভাববে। পাত্রপক্ষ ধর্ষিতা মেয়েকে বিয়েতে রাজি হবে না। ধর্ষণের ঘটনা গোপন করে বিয়ে হলেও যদি আইনের খাতায় রেকর্ড থাকে বরং সে বিয়ে ভেঙেও যেতে পারে। এমন মানবিক পুরুষ বাংলাদেশে খুব কমই আছে যে সবকিছু জেনেও ধর্ষিতাকে বিয়ে করছে। আর ধর্ষিতা যদি বিবাহিত হন তাহলেও সামাজিক গঞ্জনা-লাঞ্ছনা কম না। আইনের দরজায় ধর্ষণ প্রমাণ করতে গিয়ে পুলিশ আর উকিলের কাছে কতবার ধর্ষিত হতে হয় নাইবা বললাম।

ধর্ষিতার জীবনকে আপনিও কিন্তু বিষাক্ত করে তুলছেন। আপনি কেন ধর্ষণকে আর দুটি এক্সিডেন্টের মত নিতে পারেন না? এতে মেয়েটির সব শেষ হয়ে যাবে কেন! কেন তারা আত্মহত্যার মতো পথও বেছে নেয়! এ প্রসঙ্গে ক’দিন আগে লেখিকা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক বেগম জাহান আরার একটা স্ট্যাটাস আমার মনে ধরেছে। তিনি বলেছেন, [কন্যা ,ভগিনি, জায়া, জননী, সবাইকে বলি, ধর্ষণ একটা দুর্ঘটনা। হঠাত কোনও এক বা দলবদ্ধ পশুর আক্রমন। রাস্তায় ট্রাকের তলায় চাপা পড়ে আহত হওয়ার মতো। এর জন্য লজ্জা, ভয়, আত্মহত্যা, সামাজিক নিন্দা, কোনোটাই কিছু না। উন্নত দেশ এটা বুঝে গেছে। আমাদেরও বুঝতে হবে। নারীবাদী কর্মিরা কথাগুলো প্রচার করেন সাহসের সাথে।]

ধর্ষিতার আদৌ কি দোষ আছে! আরও সহজভাবে যদি বলি। আপনাদের কারো হয়তো পছন্দ হবে না। ধর্ষণকে মেয়েরা ভয়াবহভাবে নিচ্ছে আমরা তাকে ভয়াবহ করে সামাজিক চাপ সৃষ্টি করছি বলে। বস্তুত যৌনতার পাশাপাশি ধর্ষণ একজন মানুষকে চরম অপমানের পন্থাও। দুর্বলের উপর জোর খাটানো এবং কাউকে চরম অপমান করতে এই সাজা দেওয়া হয়। আমি নাম উচ্চারণ করছি না, একটি বিদেশী রাষ্ট্রের প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থা একজন সাংবাদিককে অপমান করার জন্য তুলে নিয়ে বলাত্কার করেছে। চুল কেটে দিয়েছে এবং নগ্ন অবস্থায় তাকে রাস্তায় ফেলে দিয়েছে। ওই সাংবাদিক আমার ব্যক্তিগত বন্ধু এবং একজন আন্তজার্তিকভাবে স্বীকৃত অনুসন্ধানী রিপোর্টার। এখানে যৌনতা মুখ্য ছিল না। সিনেমাতেও এ ধরণের ঘটনা আপনি বহু দেখেছেন- সব ধর্ষণের পেছনে যৌনতাই একমাত্র কারণ নয়।

আবার কোনো পুরুষ যখন নারীকে প্রেম নিবেদন করছেন বা শুধু শারীরিক সম্পর্ক করতে চাচ্ছেন বাকীজন রাজি হচ্ছে। এমন ঘটনা তো সভ্য সমাজে হাজার হাজার হচ্ছে। যখন কেউ রাজি হচ্ছে না যারা ভদ্র পুরুষ তারা সেখানেই স্যরি বলে থেমে যাবে। কিন্তু অসভ্য এবং মানসিক বিকারগ্রস্থ পুরুষ হলে জোর খাটাবে, যৌন হয়রানী করবে এবং সেটা ধর্ষণ পর্যন্ত গড়াতে পারে। মি-টু অথবা ধর্ষণের অভিযোগ এসব কারণেই আসে। (প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি এ ধরনের প্রেম নিবেদন নারীর পক্ষ থেকেও আসতে পারে। কোনো ছিনালের প্রেমে যদি পুরুষ সাড়া না দেয় তাহলে তাকেও কিছুটা অপমান-গঞ্জনা সইতে হয়। বলতে পারে পুরুষটি মেয়েতে অনাসক্ত।)

পুরুষের এই যে ভালোলাগা, এই যে প্রেম নিবেদন সেখানে নারী যদি সায় দিয়ে গভীর সম্পর্কে যায় সেটি হচ্ছে দু’জনের সম্মত সিদ্ধান্ত। সেই সম্পর্ক যদি কালক্রমে দুজনের মধ্যে না টিকে, কেউ একজন প্রতিশ্রুতি না রাখেন তাহলে সেটা রূপ নিচ্ছে ঘৃণায়। ছেলেটি মেয়েটির ভিডিও ভাইরাল করছেন কিংবা মেয়েটি ধর্ষণের অভিযোগ আনছেন। আমার দৃষ্টিতে এ দুটো কাজই খারাপ। যিনি সম্মত সিদ্ধান্তে শারীরিক সম্পর্ক করেছেন সেটি ধর্ষণ ছিলনা, সেটি সমঝোতা ছিল, প্রেম ছিল, ভবিষ্যত জীবনের স্বপ্ন ছিল। সেটিকে স্বপ্নভঙ্গ বলতে পারি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে মেয়েটি নুরুদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন সেটি তেমন একটি ঘটনা মনে হচ্ছে। বাংলাদেশে এরকম ঘটনা আরো বহু ঘটছে। আমার মতে এটিকে কেউ ধর্ষণ, শ্লীলতাহানী বললে ধর্ষণ সম্পর্কে বিভ্রান্তি বাড়ে। এ ধরণের প্রতারণার জন্য ধর্ষণের সমতুল্য কঠিন একটি সাজা থাকা দরকার। মেয়েরা সেটি পাচ্ছে না বলে একে ধর্ষণ বলছে। আমি চাই প্রতারিত ছেলেও যেন মেয়ের বিরুদ্ধে এমন বিচার চাওয়ার সুযোগ পায়।

ধর্ষণের সঙ্গে বেশির ভাগ সম্পর্ক সরাসরি যৌনতার। কেন সমাজে ধর্ষণ বাড়ছে, আজ তার কারণ হিসেবে সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে যাওয়ার কথা বলেছি মাত্র। যৌনতাসহ অন্যান্য বিষয়ে সমাজ, রাষ্ট্র এবং আপনার-আমার ব্যক্তিগত দায় সম্পর্কে আগামী কোনো পর্বে লিখবো আশা করছি।

লেখক: আনিস আলমগীর, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *