ধাক্কা লাগার জেরে খুন হয় সিফাত

ধাক্কা লাগার জেরে খুন হয় সিফাত

জাতীয়

এসএম দেলোয়ার হোসেন : জন্মের পরই কিছুদিনের ব্যবধানে এতিম হয় শিশু সিফাত। মায়ের কোলে রেখে তার বাবা জামাল ভূঁইয়া দ্বিতীয় বিয়ে করে অন্যত্র চলে যান। এর কিছুদিন না যেতেই শিশু সিফাতকে তার নানা আজগর আলীর কাছে রেখে মা রাশেদা বেগমও দ্বিতীয় বিয়ে করে চলে যায় অন্যত্র। এরপরই শিশু সিফাত তার নানার আদর-যত্নে বেড়ে উঠতে থাকে। নানার বাড়িতে থেকে বেড়ে ওঠা সেই শিশু সিফাতকে বাঁচতে দেয়নি ওরা। চলার পথে ধাক্কা লাগার জেরে একই এলাকার প্রতিবেশী শুভসহ তার সহযোগিরা তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে। নাতি সিফাতকে হারিয়ে এখন পাগলপ্রায় নানা আজগর আলী। এ ঘটনায় নিহত শিশুর নানা বাদী হয়ে শুভকে প্রধান আসামি করে অভিযুক্ত ৬ জনসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। ওই মামলায় প্রধান অভিযুক্ত শুভসহ ৬ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গত দু’দিনে গ্রেফতারকৃত ৬ জনকে বিজ্ঞ আদালতে নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তবে এ ঘটনায় আর কেউ জড়িত রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। আজ রোববার (১০ জানুয়ারি) পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

নিহতের পারিবারিক সূত্র ও স্থানীয়রা ঢাকা প্রতিদিনকে জানায়, প্রায় ১২ থেকে ১৪ বছর আগে মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার বাসিন্দা জামাল ভূঁইয়া ও রাশেদা বেগম দম্পতির কোলজুড়ে জন্মগ্রহণ করে শিশু সিফাত। এর কিছুদিন পরই পারিবারিক কলহের জেরে স্ত্রী-সন্তান ফেলে রেখে দ্বিতীয় বিয়ে করে চলে যান জামাল ভূঁইয়া। এর কিছুদিন না যেতেই কোলের শিশুপুত্র সিফাতকে তার নানা আজগর আলীর কাছে রেখে দ্বিতীয় বিয়ে করে আরেক পুরুষের সাথে সংসার শুরু করে অন্যত্র চলে যান শিশুটির মা রাশেদা বেগম। এরপরই কিছু বুঝে ওঠার আগেই মা-বাবার সান্নিধ্য হারিয়ে এতিম হয়ে যায় শিশু সিফাত। উপায়ান্তর না দেখে নাতি সিফাতকে বুকে আগলে রেখে কোলে-পিঠে করে মানুষ গড়ার চেষ্টা করেন হতদরিদ্র নানা আজগর আলী। কামরাঙ্গীরচরের কয়লাঘাট লবণের মিলের পাশে জামাল হাজীর বাড়িতে ভাড়া করা খুপড়ি ঘরে নানার বাসায় থেকেই বড় হতে থাকে শিশু সিফাত। সংসারের অভাবের তাড়নায় প্রায় ১০ বছর বয়সে শিশু সিফাতকে স্থানীয় একটি কারখানায় কাজে লাগিয়ে দেন তার নানা। সেখানে বেশিদিন আর টেকেনি। শিশু বয়সের কারণে খেলাধুলার প্রতিই বেশি উৎসাহী ছিল সিফাত। আদরের নাতি হওয়ায় নিজেই বুকে আগলে রেখে বড় করছিলেন হতদরিদ্র আজগর আলী। প্রায় বছর খানেক আগে কয়লাঘাট সরকারবাড়ির পাশে তারা মসজিদ সংলগ্ন ফজলুল হকের কাগজের কার্টন তৈরির কারখানায় কাজে লাগিয়ে দেন সিফাতকে। সেখানেই কাজ করছিল সিফাত। নাতি সিফাতকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন নানা আজগর আলী। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর বাস্তবে রূপধারণ করতে দেয়নি এলাকার প্রতিবেশী সমবয়সী শুভসহ তার সহযোগিরা।

কার্টন কারখানার মালিক ফজলুল হক ঢাকা প্রতিদিনকে জানান, ঘটনার দিন গত ৮ জানুয়ারী রাত প্রায় ৯টার দিকে কর্মস্থল থেকে স্থানীয় ছাতা মসজিদ সংলগ্ন বরিশাইল্লা গলির একটি দোকানে চটপটি-হালিম খেতে যায় শিশু সিফাত। পথিমধ্যে ওই চটপটি-হালিমের দোকানের অদুরে স্থানীয় বাসিন্দা শুভ (১২) নামের এক কিশোরের সঙ্গে ধাক্কা লাগে সিফাতের। এ নিয়ে শুভর সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয় সিফাতের। একপর্যায়ে শুভসহ কয়েকজন কিশোর মিলে সিফাতকে এলাপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে। এতে ডাক-চিৎকার দিয়ে সে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে। তখন কেউ তাকে উদ্ধারে এগিয়ে না গেলেও পথচারি এক রিকশাভ্যান চালক দ্রুত তাকে গুরুতর আহতাবস্থায় উদ্ধার করে প্রথমে পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। সেখানে অবনতি ঘটলে চিকিৎসকের পরামর্শে ওইদিন রাতেই তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। খবর পেয়ে তিনিও ঢাকা মেডিকেলে ছুটে যান। জরুরি বিভাগে চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় কিছুক্ষণ পরই কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে যান শিশুটির নানা আজগর আলী ও খালু আব্দুর রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা। একমাত্র নাতি সিফাতকে হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন আজগর আলীসহ পরিবারের সদস্যরা।

সিফাতের খালু আব্দুর রহমান ঢাকা প্রতিদিনকে জানান, তাদের বাড়ি মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলায়। সিফাতের বাবার নাম জামাল ভূঁইয়া, মায়ের নাম রাশেদা বেগম। তাদের একমাত্র সন্তান ছিল সিফাত। সিফাত ছোট থাকতেই বাবা-মা আলাদা হয়ে যায়। মা-বাবা অন্যত্র বিয়েও করে সংসার করছেন। নানা আজগর আলীর সঙ্গে কামরাঙ্গীরচর কয়লাঘাট লবণের মিলের পাশে থাকতো সিফাত। একই এলাকায় ফজলুর হকের কাগজের কার্টন তৈরির কারখানার কাজ করতো সে। কিন্তু সিফাতকে আর বাঁচতে দিল না স্থানীয় প্রতিবেশী শুভসহ তার সহযোগীরা।

স্থানীয়রা জানায়, জন্মের পরপরই সিফাতের তার মা-বাবা আলাদা হয়ে বিয়ে করে অন্যত্র চলে যায়। সে তার নানার কাছে মানুষ হচ্ছিল। সে কার্টন তৈরির কারখানায় কর্মরত ছিল। এ ঘটনার মূল অভিযুক্ত শুভ (১২) প্রায় বছর খানেক আগে চারতলার ছাদ থেকে নিচে পড়ে যায়। এতে সে মারাত্মকভাবে আহত হয়। ডাক্তার এবং পরিবারের সদস্যরা ভেবেছিল সে হয়তো আর বাঁচবে না। ওই ঘটনায় সে সুস্থ হয় কিন্তু তার শরীরের বাম পাশের নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বাম চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলে। ডাক্তার পরামর্শ দিয়েছিল তার শরীরে যেন আঘাত করা না হয়। এ জন্য এলাকায় তাকে সবাই সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখতো, কিন্তু সে সকলকে মারপিট করত। সময়ের ব্যবধানে ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠতে থাকে। যেহেতু তাকে আঘাত করলে, বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে এ কারণে কেউ তাকে আঘাত করতো না। ঘটনার দিন আসামি শুভর ভাগ্নির জন্মদিনের পার্টি ছিল। সেখানে সাউন্ড সিস্টেমে সমস্যা হলে সে মেকানিকের কাছে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়। অন্যদিকে সিফাত চটপটি-হালিম খাওয়ার জন্য স্থানীয় ছাতা মসজিদ সংলগ্ন বরিশাইল্ল্যা গলির একটি দোকানে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে ওই দোকানের অদুরে শুভর সাথে ভুক্তভোগী সিফাতের ধাক্কা লাগে এবং কথা কাটাকাটি হয়। এ সময় আসামি শুভ তার বন্ধু সুজনের কাছে রক্ষিত সুইচ গিয়ার চাকু নিয়ে আসতে বলে এবং ভিকটিম ও তার বন্ধুদের মারপিট করে। এক পর্যায়ে সিফাতকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে। শুভ, মুনসি, সুজন, আকাশ, আকাশ-২, মহিনসহ অজ্ঞাতনামা আরো কয়েকজন এ হামলায় অংশ নেয়। ভিকটিম সিফাত উরুতে আঘাতপ্রাপ্ত হয় এবং মাটিতে পড়ে থাকে। সেখানকার এক ভ্যানচালক তাকে নিয়ে প্রথমে মিটফোর্ড হাসপাতালে যায়। সেখানকার ডাক্তাররা তাকে ঢাকা মেডিকেলে রেফার্ড করে। ঢাকা মেডিকেলে নেয়ার অল্প কিছুক্ষণ পরে সে মারা যায়।

স্থানীয় ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাজী মো. সাইদুল মাদবর বিষয়টি নিশ্চিত করে ঢাকা প্রতিদিনকে জানান, নিহত শিশু সিফাত কাগজের কার্টন তৈরির কারখানার শ্রমিক ছিল। ছোটবেলায় বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর সে তার নানার বাড়িতেই বসবাস করে বেড়ে উঠছিল। ঘটনার দিন শুক্রবার রাতে চটপটি-হালিমের দোকানে যাওয়ার পথে স্থানীয় শুভর সাথে ধাক্কা লাগে সিফাতের। এ নিয়ে কথা কাটাকাটির জেরে শুভসহ কয়েকজন মিলে সিফাতকে ছুরিকাঘাত করে। এতে সে গুরুতর আহত হলে হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু ঘটে। তবে ঘটনার পরপরই প্রধান অভিযুক্ত কিশোর শুভকে আটক করে থানা পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাজী সাইদুল মাদবর। তিনি বলেন, ছেলেটার (অভিযুক্ত শুভ) পরিবার যাতে হয়রানির শিকার না হয় এ জন্য ছেলেটাকে আমি আইনের হাতে তুলে দিয়েছি। নিহত সিফাতের পরিবার যাতে ন্যায় বিচার পায় সে প্রত্যাশাও করছি।

চিকিৎসকরা জানান, ছুরিকাঘাতের পর দীর্ঘ সময় পড়ে থাকায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলেই সিফাতের মৃত্যু হয়। ঢাকা মেডিকেলের ডাক্তাররা ভিকটিমকে রক্ত দেয়ার জন্য ব্লাড গ্রুপ টেস্ট করার জন্যও শরীরে রক্ত পায়নি।

আজ রোববার (১০ জানুয়ারি) এ রিপোর্ট লেখাপর্যন্ত কামরাঙ্গীরচর থানায় যোগাযোগ করা হলে অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মোস্তাফিজুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে ঢাকা প্রতিদিনকে জানান, শুক্রবার রাতে চলার পথে ধাক্কা লাগার জেরেই স্থানীয় কিশোর শুভসহ তার সহযোগির ছুরিকাঘাতে খুন হয় শিশু সিফাত। ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলসহ আশপাশে অভিযান চালিয়ে প্রধান অভিযুক্ত শুভসহ ৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একই সঙ্গে হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত সুইচ গিয়ার চাকুটি উদ্ধারমূলে জব্দ করা হয়েছে। এ ঘটনায় নিহত সিফাতের নানা আজগর আলী বাদী হয়ে শুভকে প্রধান আসামি করে ৬ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। ওই মামলায় প্রধান অভিযুক্ত শুভসহ ৬ জনকে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এদের মধ্যে ৩ জন ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করায় গত শনিবার (৯ জানুয়ারি) বিজ্ঞ আদালতর নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয়। অপর ৩ অভিযুক্তকে আজ রোববার (১০ জানুয়ারি) দুপুরে আদালতে পাঠানো হয়। বিজ্ঞ আদালতের নির্দেশে ওই ৩ জনকেও কারাগারে প্রেরণ করা হয়। মূলত অভিযুক্ত ৬ আসামি বর্তমানে কারাগারে রয়েছে। তবে এ ঘটনায় আর কেউ জড়িত রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনাস্থল পর্যবেক্ষণ করে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে। এ ঘটনায় আর কারো সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। এছাড়া এলাকার শিশু-কিশোরদের অপরাধ দমনে পুলিশের পাশাপাশি সন্তানদের দৈনন্দিন কার্যকলাপের ওপর নজরদারিসহ তদারকি বাড়াতে অভিভাবকদের আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মোস্তাফিজুর রহমান।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *