নাগালের বাইরে দাম নিত্যপণ্য

সারাবাংলা

জনি পারভেজ, গুরুদাসপুর থেকে
নাটোর জেলার গুরুদাসপুর পৌরসদরের কাচারীপাড়া মহল্লার বাসিন্দা সুমন। ৪ সদস্যের সংসার তার। সম্পদ বলতে কিস্তিতে কেনা একটা রিকশা। সেটা চালিয়ে প্রতিদিন গড়ে আয় ৪শ টাকা। বর্তমান নিত্যপন্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কাছে সুমন পরাজিত। রিকশার কিস্তির টাকা দিয়ে যা অবশিষ্ট থাকে তা দিয়ে খেয়ে না খেয়ে চলছে তার সংসার। পৌর সদরের আনন্দ নগর মহল্লার দর্জি আব্দুল মতিন, চাঁচকৈড় পুড়ার পাড়া মহল্লার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মিলন, স্বর্ণকার শ্রমিক চন্দনের অবস্থাও একই রকম। সবাই জানালেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় সব কিছুর দামই নাগালের বাইরে। যা আয় তা দিয়ে সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছে।
গত ৫ অক্টোবর গুরুদাসপুরের চাঁচকৈড় বাজারে সরোজমিন প্রতিবেদনে গিয়ে দেখা গেছে দু’সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় চাল, চিনি, ডাল, সয়াবিন তেল, ডিম, পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ, আলুসহ সব ধরনের সবজির দাম। সব কিছুই নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে। করোনা মহামারীতে একদিকে আয় কমেছে অন্যদিকে বেড়েছে জীবন নির্বাহের ব্যয়। কর্মজীবী মানুষ আয়-ব্যয়ের সমন্বয় করতে হিমশিম খাচ্ছেন।
নিত্যপ্রয়োজনীয় কাঁচা দোকানী বল্টু ও দুলু জানান, এক সপ্তাহের ব্যবধানে সব ধরনের সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে । মানভেদে প্রতিকেজি আলু ৪০থেকে ৪২,বেগুন ৬০,কাঁচা মরিচ ২০০,পটল ৬০,মুলা ৫০,মাঝারি মানের লাউ ৪০,করলা ১০০,পেয়াজ ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাজারের দাম বাড়ার কারন হিসাবে তারা অতিবৃষ্টি ও দুদফা বন্যাকে দুষছেন। চাহিদার তুলনায় বাজারে জোগান কম থাকায় এমন অবস্থা বলে তারা জানালেন। বেশিদামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করতে তারা বাধ্য হচ্ছেন। তবে কমেছে তাদের বিক্রির হার। যে ক্রেতা আগে ৫ কেজি কাঁচা বাজার করতেন তিনি এখন কিনছেন ২/৩ কেজি।
কাঁচা বাজারের ক্রেতা রফিকুল ইসলাম জানালেন,৫ সদস্যের সংসারে আগে প্রতিদিন ২শ টাকার বাজার করলেই চলতো। এখন লাগছে ৪ থেকে ৫শ টাকা। আয় না বাড়লেও ঝড়ো গতিতে বেড়ে চলেছে ব্যয়। বাধ্য হয়ে ধার-দেনা, ঋন করে চলতে হচ্ছে। এভাবে আর কত দিন? তিনি কর্তা ব্যাক্তিদের বাজার মনিটরিং জোরদারের আবেদন জানান।
এদিকে এক সপ্তাহের ব্যবধানে মানভেদে সব ধরনের চাল কেজিতে ৩ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫৪ টাকা, সয়াবিন তেল ৫ টাকা বেড়ে ৯০ থেকে ৯৫ টাকা, মশুর ডাল ৫ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকায়। তবে অন্যান্য পন্যের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। দাম বৃদ্ধির কারন সম্পর্কে চাঁচকৈড় বাজারের মুদি দোকানী মিল্টন জামাদার বলেন,বন্যার কারনে চালের দাম বাড়লেও অন্য দ্রব্যের দাম বৃদ্ধির কারন আমার জানা নেই। সামান্য লাভে পাইকার বা কোম্পানীর প্রতিনিধিদের বেঁধে দেয়া দামে আমরা নিত্যপন্য বিক্রি করি। সিন্ডিকেটের বিষয়টি তার জানা নেই।
হাঁসের ডিমের দাম হালিতে ৮ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৪৬ টাকা,লাল-সাদা ডিম ৫ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৩৬ থেকে ৩৮ টাকায়।
তবে কমেছে সব ধরনের মাংশের দাম। গরুর মাংশ কেজিতে ৫০ টাকা কমে বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৪২০ টাকায়,ব্রয়লার ২০ টাকা কমে ১১০ টাকায়,সোনালী ৪০ টাকা কমে ১৮০,দেশী মুরগী ৩০ টাকা কমে ৩২০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। মুরগীর মাংশের দাম কমার কারন সম্পর্কে বিক্রেতা ভুট্টো বলেন, বৃষ্টি-বন্যায় শেয়াল বন বিড়ালের উপদ্রব,বাসস্থান নষ্ট ও খামারে পানি প্রবেশের কারনে খামারীরা কম দামে মুরগী বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। এ দিকে মহিষ গরুর মাংশের দাম কমার ব্যাখ্যা হিসাবে মোবারক হোসেন বলেন, বৃষ্টি বন্যায় পশু খাদ্যের চারনভুমি ও উঠছি ধান পানিতে তলিয়ে খড় সংকট দেখা দিয়েছে। পোয়াল, আঁটি খড় (আওর) সহ পশু খাদ্যের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির কারণে খামারী কম দামে পশু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। আবার বাজারে মাছের দাম কমের কারনে, সাধারন মানুষ মাংশ না কিনে কমদামে মাছ কিনছে। সব মিলে মাংশের দাম পড়ে গেছে।
দ্রব্যমুলের উর্ধ্বগতির কারনে সাধারন খেটে খাওয়া নিম্ন আয়ের মানুষ আয়ের সাথে ব্যায়ের হিসাব মেলাতে পারছেন না। তাদের দাবী এ অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে মনিটরিংয়ের মাধ্যমে সরকার দ্রুত বাজার নিত্যপন্য সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করুক।
চালকল মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি আয়নাল হক তালুকদার বলেন,চাহিদার তুলনায় ধানের পর্যাপ্ত আমদানী নেই। চাহিদা বেশি থাকায় ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগীতায় ধানের দাম বেড়েছে। ধানের দাম বৃদ্ধির কারণে বেড়েছে চালের দাম। চালের দাম বাড়লেও ধানের অনুপাতে এখন চালের দাম বাড়েনি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তমাল হোসেন জানান,বাজার নিয়ন্ত্রনে অভিযানে নামবেন তিনি।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *