নৈতিকতায় বাঁচবে ধরিত্রী

মতামত

৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস। ১৯৭২ সালে জাতিসংঘ এ দিনকে বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মর্যাদা দেওয়ার পর ১৯৭৪ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী দিবসটি উদযাপন করা হয়ে থাকে।আমাদের বাসস্থান এ বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডকে বাসযোগ্য রাখার প্রয়াসে পালিত দিনটি নিঃসন্দেহে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।১৯৭৪ সালে সর্বপ্রথম “শুধু এক বিশ্ব” স্লোগানের মধ্য দিয়ে যাত্রা করেপ্রতিবছর বায়ু দূষণ, পলিথিন দূষণ, টেকসই ভোগ, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, সমুদ্রপৃষ্ঠের বৃদ্ধি,কার্বন নিঃসরণ রোধ ইত্যাদি পরিবেশবান্ধব নানান ইস্যুতে দিনটি পালিত হয়। বরাবরের মতো“বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার” এ স্লোগানকে ধারণ করে এ বছরও পালন করা হচ্ছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস-২০২১।

আরও স্পষ্ট করে বললে আমাদের প্রকৃতিই এক বৃহৎ সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র। এ বৃহৎ বাস্তুতন্ত্রের জীব ও অজীবের মধ্যকার সুস্থ মিথষ্ক্রিয়ার মাঝেই এর স্বাভাবিক ভারসাম্য নিহিত থাকে এবং পরিবেশও সুরক্ষিত থাকে। কিন্তু এর কোন উপাদানের কাজের ব্যত্যয় ঘটলে সামগ্রিক বাস্তুতে গোলযোগ দেখা দেয়, ফলে পরিবেশও হুমকির মুখে পড়ে। একারণে বাস্তুর স্বাভাবিকত্ব নিশ্চিত করাকতটা জরুরি তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

পরিতাপের বিষয় মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের জন্য বিশ্বের স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র আজ বিঘ্নিত। অনেকক্ষেত্রে আমাদের অপ্রয়োজনীয় বিলাস বা ক্ষমতার প্রকাশের জন্য আমরা পরিবেশের সাথে যথেচ্ছাচার করছি, যার জন্য প্রতিনিয়ত অনেক মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ের শিকার হচ্ছি আমরা। শুধু তাই নয় এর প্রভাবে সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগীর কাতারেও রয়েছে ভবিষ্যৎ মানবপ্রজাতি। বিশ্ব পরিবেশ দিবসে তাই এ বছর ক্ষয়িষ্ণু এ বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারকে মূলউপজীব্য রূপে গ্রহণ করা হয়েছে। মূলত জাতিসংঘ ঘোষিত “টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা” অর্জনেও পরিবেশের সার্বিক ভারসাম্য অক্ষুন্ন রাখার প্রতিজোর দেওয়া হয়েছে।

একারণে জাতিসংঘ বিষয়টির আরও গুরুত্ব দেওয়ার জন্য ২০২১-২০৩০ পর্যন্ত সময়কালকে “বাস্তু পুনরুদ্ধার দশক” বলেও ঘোষণা করেছে। মানুষ বিশাল এ বিশ্বের একমাত্র বুদ্ধিবৃত্তিক জীব। তাই প্রকৃতি সুরক্ষায় মানুষের অগ্রণী ভূমিকা নেওয়াটাই যৌক্তিক হতো। দেরীতে হলেও মানুষের মাঝে এ বোধ জাগ্রত হতে হবে। নতুবা ভবিষ্যতে প্রকৃতির অসহযোগিতায় বিশ্ব মানুষের বাসের অনুপযোগী হয়ে উঠবে, যার নজির আমরা এখনই নানা প্রকারে দেখতে পাচ্ছি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, প্রকৃতির ওপর আগ্রাসনে সিডর, আইলা, নার্গিস, ক্যাটরিনা, ইয়াশের মতো ঘূর্ণিঝড়সহ তীব্র খরা, অসহনীয় উষ্ণতা, দীর্ঘমেয়াদী বন্যা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাবৃদ্ধিসহ নানান প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথা বলা যায়।

তিনি প্রকৃতির স্বতঃমূল্যের স্বীকৃতি দিয়েছেন। তার মতে, মানুষের মতোই প্রকৃতির নিজস্ব মূল্য রয়েছে, তাই কল্পিত শ্রেষ্ঠত্বের দাবিতে মানুষ প্রকৃতিরক্ষতি করতে পারে না। যদি তা করে তবে তা হবে নৈতিকতার পরিপন্থী। যেহেতু মানুষ নৈতিক জীব তাই পরিবেশের প্রতি নৈতিক আচরণ করাও তার কর্তব্য। মূলত গভীর বাস্তুতন্ত্রে পরিবেশের তথাপ্রকৃতির প্রতি গভীর অর্ন্তদৃষ্টি নিয়ে নৈতিক আচরণের যে তাগিদ দেওয়া হয়েছে তার মাঝেই বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারের মূল বাণী নিহিত।

নব্য বনায়ন, পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ, অপ্রয়োজনীয় প্রকৃতিবিরোধী দ্রব্য বা সেবা নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব নানান কর্মসূচি গ্রহণের পাশাপাশি মানবিক নৈতিক সচেতন বোধের জাগরণের মধ্যে দিয়েই আগামীর বিশ্বে মানবতা সুরক্ষিত হবে।

লেখক : জিনান বিনতে জামান, সহকারী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, ঢাকা কলেজ, ঢাকা।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *