পণ্য নয় বিক্রি হয় শ্রমও

সারাবাংলা

ইমরুল হাসান বাবু, টাঙ্গাইল থেকে:
যেকোনো হাটেরই সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো টাকার বিনিময়ে পণ্য বেচাকেনা। তবে এই সাধারণ নিয়মের বাইরে এমন হাটও আছে। যেখানে টাকার বিনিময়ে শুধু পণ্য নয় মানুষও বিক্রি হয়। কারণ সে হাটে মানুষ নিজেরাই পণ্য। টাঙ্গাইল সদর উপজেলার বানিজ্যিক এলাকা করটিয়া বাজারে লালপুর সংলগ্ন। তেমনি একটি হাট বসে কাক ডাকা ভোর থেকে সন্ধা পর্যন্ত। এই হাটে নির্ধারিত একটি সময়ের জন্য একজন শ্রমিক আরেকজনের কাছে বিক্রি হয়ে যান। আর যারা বিক্রি হন তারা সবাই ধান, মাটি কাটা ও নির্মাণ সামগ্রী টানার শ্রমিক। মৌসুমি ফসল কাটার জন্য গুল্লাহ, নাটিয়াপাড়া, করাতিপাড়া, নাটিয়ারপাড়া, বীরপুষিয়া, কলেজপাড়া, মাদারজানি, তালুকদারপাড়া, চৌধুরীপাড়া, তালুকদার পাড়া, কুমুল্লি, ছয়শ, বাজিতপুর এলাকায় শ্রমিকদের ব্যাপক চাহিদা। আর এখানেই আশেপাশের জেলা ও উত্তরবঙ্গ থেকে নিয়মিত শ্রমিকরা এসে থাকে। আর এসব শ্রমিকরাই অন্যের কাছে বিক্রি হয়ে থাকেন সাময়িক সময়ের জন্য।
এ হাট প্রতিদিন সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত বেশ জমে ওঠে। এ হাটে শ্রমিকদের দামও থাকে বেশ কম। গতকাল মঙ্গলবার সকালে করটিয়া মানুষ বেচাকেনার হাটে দেখা যায়, কারো হাতে বাঁশের তৈরি বাইং, কারো হাতে ব্যাগ। ব্যাগে শীতের কাপড় আর কাঁচি। কেউ বসে আছে, কেউ দাঁড়িয়ে। হাটের ভেতরে ঢুকতেই এক শ্রমিক বলেন, মামা কামলা লাগবো? কত দিবেন? সাংবাদিক পরিচয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। তার নাম আব্দুর রশিদ (৪৮)। বাড়ি বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার বিজরীল গ্রামে। তিনিসহ সাতজনের একটি দল ওইদিনই করটিয়া আসেন। অন্য ছয়জন ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়েছেন। তিনি আরও বেশি দামে বিক্রি হওয়ার আশায় দাঁড়িয়ে আছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের এলাকায় এখন কোনো কাজ নেই। বইসা থাইকা কি করব? তাই এখানে ধান রোপন ও মাটি কাটার জন্য আইছি। কিছু টাকা জমিয়ে চলা (চলে) যামু। রংপুর থেকে এসেছেন দুদু মিয়া (৪৬)। এ দলেও সদস্য ৯ জন। দুদু মিয়া বলেন, আমাদের এলাকায় এখন কোনো কাজ নাই। বইসা থাকার চেয়ে বেগার খাটা ভালো। ১০/১৫ দিন ধান রোপন ও মাটি কাইটে চইল্লা যামু। প্রতি বছরই তিনি এই এলাকায় ধান রোপন ও কাটতে আসেন বলে জানান। আক্ষেপ করে দুদু জানান, তার ৮ বিঘা জমি ছিল। ১৬ বছর আগে রাক্ষুষে নদী তা কেড়ে নিয়েছে। পরিবারের লোকজন নিয়ে এখন অন্যের জায়গায় থাকেন। এজন্য তাকে ভাড়া দিতে হয়। তার দলে রাশেদ নামে নবম শ্রেনির একজন ছাত্রও আছে। রাশেদ বলেন, এখন ইসকুল (স্কুল) বন্ধ আছে। তাই আব্বার সঙ্গে এখানে কাজ করতে এসেছি।
বগুড়ার ধুটের বাঁশপাতা গ্রাম থেকে আসা একটি দলের প্রধান হলেন ফললুল হক (৪৫)। এ দলের সদস্য ৮ জন। ফজলুল হক বলেন, আমাদের এলাকায় এখন কোনো কাজ নেই। উত্তরবঙ্গের রংপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, লালমনিরহাট, দিনাজপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলা থেকে শ্রমিক আসে এ হাটে। মাদারজানি গ্রাম থেকে শ্রমিক কিনতে আসা খসরু, শফিকুল ইসলাম শফি, মোস্তফা মুরাদ বলেন, এ হাটে অতি সহজেই কম মূল্যে শ্রমিক পাওয়া যায়। বীরপুশিয়া ও আলসা থেকে শ্রমিক কিনতে আসা মো. উজ্জল মিয়া জানান, আমরা কম দামেই শ্রমিক পেয়েছি। শ্রমিকদের বাড়ি অন্য জেলায় হওয়ায় তারা মনযোগ সহকারে কাজ করে। করটিয়া গেস্ট হাউজের মালিক আব্দুস সামাদ বলেন, আমি দীর্ঘদিন যাবৎ গেস্ট হাউজের ব্যবসা করি। শ্রমিকদের কথা চিন্তা করে কম দামে শ্রমিকদের থাকার সুব্যবস্থা করেছি।এ বিষয়ে করটিয়া ইউপি চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী মজনু বলেন, উত্তরবঙ্গ থেকে আসা শ্রমিকরা এখানে নিয়মিত কাজ করে। তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা গুরুত্ব সহকারে দেখি। টাঙ্গাইল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আহসানুল বাশার বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর রোপা আমনের ফলন ভালো হয়েছে। প্রতিবছর এ মৌসুমে জেলার বাইরে থেকে কিছু অভাবী মানুষ করটিয়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় আসেন শ্রম বিক্রি করতে। অন্য বছরে তুলনায় শ্রমিকের বাজার কিছুটা মন্দা বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *