পাটুরিয়ায় বালু ব্যবসা : মামলা পাল্টা মামলা

সারাবাংলা

বন্দর কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবৈধ অর্থ গ্রহণের অভিযোগ
সাইফুল ইসলাম, মানিকগঞ্জ থেকে:
বিআইডব্লিউটিএ’র মানিকগঞ্জ আরিচা নদী বন্দরের আওতাধীন ফোরশোর ভূমিতে পাটুরিয়া ১নং ফেরিঘাট এলাকায় স্থানীয় প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরে চলছে বালু ব্যবসা। সম্প্রতি ফেরিঘাট এলাকায় এসব বালু ব্যবসা বন্ধে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন বন্দর কর্তৃপক্ষ। এরপর গত বৃহস্পতিবার (১৫ এপ্রিল) এসব বালু ব্যবসায়ীদের অবৈধ উল্লেখ করে ৬ জনকে আসামি করে শিবালয় থানায় মামলা দায়ের করেন বিআইডব্লিউটিএ’র আরিচা নদী বন্দরের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক মোহাম্মদ মাসুদ পারভেজ। তবে বালু ব্যবসায়ীদের দাবি, রয়্যালিটি জমা দিয়ে নদী খননের বালু ক্রয় করে নিজস্ব জমিতে বালু রেখে ব্যবসা করছেন তারা। আর যেখানে ভেকু দিয়ে মাটি কাটা হচ্ছে সেসব জায়গাও তাদের নিজস্ব মালিকানাধীন জমি।
মামলা সূত্রে জানা যায়, বিআইডব্লিউটিএ’র আরিচা নদী বন্দরের উপ-পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) এবং বন্দর ও পরিবহন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাসুদ পারভেজ বাদী হয়ে ২০১০ সালের বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইনের ১৫ (১) ধারা অনুযায়ী উপজেলার নবগ্রামের ভাষান মন্ডলের ছেলে মো. আমিনুল ইসলাম মিন্টু, দাসকান্দি গ্রামের মৃত নিয়ামতের ছেলে মো. মানিক, ধুতরাবাড়ি গ্রামের মৃত কেতাব আলীর ছেলে মো. মোনতাজ উদ্দিন, মৃত আফছার মন্ডলের ছেলে পান্নু মন্ডল, মো. কেবারত আলীর ছেলে পলাশ ও এলমেছের ছেলে আলমগীরসহ অজ্ঞাতনামা কতিপয় ব্যক্তিবর্গের নামে মামলা দায়ের করেন। বন্দর কর্মকর্তা মামলায় উল্লেখ করেন, আসামিরা বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষের বিনা অনুমতিতে গত ৯ এপ্রিল বেলা ১১টা থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত শিবালয় থানাধীন আরুয়া ইউনিয়নের পাটুরিয়া সাকিনস্থ পাটুরিয়া ০১ নং ফেরীঘাট এলাকার ফোরশোর ১নং ফেরী হাইওয়াটার ফেরী ঘাটের নিচে অবৈধ দেশীয় মাটি কাটার ড্রেজার মেশিন ও ভেকু বসিয়ে অনুমান ১৫/২০ ফুট গভীর করে অবৈধ ভাবে বালু/মাটি কেটে নিচ্ছেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শিবালয় উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রেজাউর রহমান খান জানু, শিবালয়ের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুর রহিম খানের ভাগ্নে শিবালয় ইউপি চেয়ারম্যান আলালউদ্দিন আলাল, আরুয়া ইউপি চেয়ারম্যান মাসুম, মো. আমিনুর ইসলাম মিন্টু, মোনতাজ উদ্দিন (মোনতাজ মাস্টার), মো. মানিক, পান্নু মণ্ডল, পলাশ ও আলমগীর, উপজেলা শ্রমিক লীগ নেতা মিলন কাজী, রাজবাড়ি জেলার গোয়ালন্দ পৌরসভার নব-নির্বাচিত মেয়র নজরুল ইসলাম মণ্ডল, মুক্তার ও রাসেল সহ মানিকগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতার যোগশাজসে চলছে এসব বালু ও মাটির ব্যবসা।
তবে পাটুরিয়া ১নং ফেরিঘাট এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বালু ব্যবসা ও ভেকু দিয়ে মাটি কাটা চলমান থাকলেও বিআইডব্লিউটিএ’র বন্দর কর্মকর্তা অজানা কারণে মামলায় মাত্র এক সপ্তাহের কথা উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে মিন্টু, মানিক গংদের আশপাশের অন্য বালু ব্যবসায়ীদের নাম মামলায় উল্লেখ করেননি। অপরদিকে অভিযুক্ত বালু ব্যবসায়ীরা পাল্টা অভিযোগ তুলে জানায়, বালু ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এতদিন অবৈধভাবে আর্থিক সুবিধা নিতে খোদ বন্দর কর্মকর্তা বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করেছেন। বালু ব্যবসায় কিছুটা অনিয়ম রয়েছে। আর এই সুযোগটিকেই কাজে লাগিয়ে অবৈধভাবে আর্থিক সুবিধা নিয়ে খোদ বন্দর কর্মকর্তাই অবৈধভাবে বালু ব্যবসা করার সুযোগ করে দিয়েছে। হঠাৎ করে এসব অবৈধ আর্থিক লেনদেন নিয়ে ঝামেলা হওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে নিজেকে সাধু প্রমাণ করতেই বালু ব্যবসায়ীদের একাংশের সঙ্গে সমঝোতা করে ক্ষমতার দাপটে মাত্র কয়েকজনের নামে মামলা দায়ের করেছেন। একটি চক্রের কথায় প্রলুব্ধ হয়ে আশপাশের বালু ব্যবসায়ীদের নাম উল্লেখ না করে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে শুধু কয়েকজনের নামে মামলা করা হয়েছে বলেও তারা দাবি করেন। তারা আরও জানায়, বালু ব্যবসার সঙ্গে জড়িত একটি মহল হঠাৎ করে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেন। অতিরিক্ত টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় তারা ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মীকে তাদের কাছ থেকে ও তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত সড়ক উন্নয়ন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এনডিই কোম্পানীর কাছ থেকে চাঁদা আদায়ে লেলিয়ে দেয়। পরে শিবালয় উপজেলা ছাত্রলীগের ২০/২২ জনের একটি দল পাটুরিয়া ফেরিঘাট এলাকায় সড়ক উন্নয়ন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। তাদের দাবিকৃত চাঁদার টাকা না দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানের নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত অন্তত ২৫ লাখ টাকার দুইটি ভেকু ভাঙচুর করে উপজেলা ছাত্রলীগের ওই নেতাকর্মীরা। এছাড়া ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কর্মকর্তাকে দেশিয় অস্ত্র দিয়ে ভয় দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে কোম্পানীর ২ লাখ ২২ হাজার টাকা লুট করে নেয়। এ নিয়ে উপজেলা ছাত্রলীগের ৯ জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা করা হলে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে বন্দর কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়। এ নিয়ে শিবালয় উপজেলা চেয়ারম্যানর ও তার ছোট ছেলে ফুয়াদ রহমান খানের অনুসারী শিবালয় উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রাকিব হাসনাত আওয়াল ও তার সহযোগীরা ভয়ভীতি ও হুমকি দিলে তাদের নামে থানায় জিডি করা হয়েছে বলেও জানায় তারা। বন্দর কর্মকর্তার করা মামলার আসামি মো. আমিনুল ইসলাম মিন্টু বলেন, আমরা সরকারি কোষাগারে টাকা জমা দিয়ে রয়্যালিটির মাধ্যমে নদী খননের বালু কিনে নিজেদের জায়গায় ব্যবসা করি। ওখানে ব্যবসা করি এ বাবদ বিআইডব্লিউটিএ’র পোর্ট অফিসার আমাদের কাছ থেকে এককালীন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা নিয়েছে। পরে আবার নিয়েছে ৩০ হাজার টাকা এবং প্রতি মাসে তাকে ৩৫ হাজার করে টাকা দিতে হয়েছে।
বন্দর কর্মকর্তার করা মামলার আরেক আসামি মো. মানিক বলেন, আমরা যেখানে বালু ব্যবসা করি সেটা আমাদের পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের নিজস্ব জমি। আমাদের কাছে ওই জায়গার সকল কাগজপত্র আছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে ওখানে ব্যবসা করছি। আমরা যদি বিআইডব্লিউটিএ’র জায়গায় ব্যবসা করে থাকি তাহলে তারা এতদিন মামলা দেয়নি কেন? ওই জায়গা বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজেদের দাবি করে কিভাবে? তারা তো আমাদের জায়গা একোয়ার করার কোনো কাগজপত্র বা টাকা পয়সা বুঝিয়ে দেয়নি। আমাদের পার্টনার উপজেলা চেয়ারম্যান জানু মিয়া অতিরিক্ত টাকা না পেয়ে তার ছেলে রনির বন্ধু পোর্ট অফিসারকে দিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে মামলা দিয়েছে।
এ বিষয়ে শিবালয় উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রাকিব হাসনাত আওয়াল বলেন, উল্লেখিত ঘটনাস্থলে আমি সেদিন যাইনি। আমার নামে মানিক নামের যে ব্যক্তি জিডি করেছে আমি তাকে চিনিই না। আমি কোন চাঁদাবাজিও করিনি। উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে আমার নামে এই অভিযোগ আনা হয়েছে।
বিতর্কিত ওই জায়গা এখনো একোয়ার করা হয়নি স্বীকার করে বিআইডব্লিউটিএ’র উপ-পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ মাসুদ পারভেজ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ভেকু দিয়ে মাটি কাটা হলেও অবৈধ ড্রেজার দিয়ে ৯ এপ্রিল থেকে তারা বালু উত্তোলন করছিল। এজন্য মামলায় মাত্র সাত দিনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আশপাশের যারা বালু ব্যবসা করে মামলায় তাদের নাম অজ্ঞাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আমি বালু ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কোন টাকা পয়সা নেইনি। বিপদে পড়লে অনেকেই অনেক ধরনের কথা বলে। তাদের এসব কথার কোন ভিত্তি নেই।
শিবালয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ফিরোজ কবির বলেন, সেদিন আনুমানিক রাত নয়টার দিকে একজন লোক ৯৯৯-এ ফোন দিয়ে বলেছে পাটুরিয়ায় একটা ঝামেলা হয়েছে। পরে আমি সেখানে পুলিশ পাঠিয়ে জানতে পেরেছি সেখানে কিছু ভাঙচুর হয়েছে। ড্রেজার বা ভেকু দিয়ে মাটি কাটা ও বালু উত্তোলনে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বাধা দেওয়াটা ঠিক হয়নি। সেটা বিআইডব্লিউটিএ’র জায়গা হলে তারা প্রশাসনকে জানাবে এবং প্রশাসন তাদের সহযোগিতা করবে। বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ মামলায় উল্লেখ করেছে ৯ এপ্রিল থেকে বালু ব্যবসায়ীরা মাটি কাটছে। এর আগে কেউ মাটি কেটে থাকলে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ তো সেটাকে মামলায় উল্লেখ করেনি। তারাই তো সেটার আইনগত ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে। সে ক্ষেত্রে তো আমাদের কিছু বলার থাকে না।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *