পুরুষের তুলনায় ৩ গুণ বেশি বেকার শিক্ষিত নারীরা

জাতীয়

এসএম দেলোয়ার হোসেন:
আজ ৮ মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস। নানা কারণে বাংলাদেশে আজও নারীরা নিপীড়িত-নির্যাতিত। সময়ের ব্যবধানে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ তেমন একটা সাড়া ফেলেনি। তবে শিক্ষিত নারীদের বেকারত্বের হার পুরুষের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি। সরকারের পৃথক দুটি সংস্থার গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমাজ ও রাষ্ট্র কাঠামো যথেষ্ট নারীবান্ধব না হওয়ায় অনেক উচ্চশিক্ষিত নারীরা কর্মক্ষেত্রে আসছেন না। এতে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে অর্থনীতিতে নারীর অবদান। এমন বাস্তবতায় সারা বিশ্বের মতো এবারও বাংলাদেশে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপিত হচ্ছে আজ। এবার নারী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘করোনাকালে নারী নেতৃত্ব, গড়বে নতুন সমতার বিশ্ব’। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। এতে তারা বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব নারীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। আজ সোমবার (৮ মার্চ,২০২১) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ। মজুরি বৈষম্য, কর্মঘণ্টা নির্ধারণ এবং কর্মক্ষেত্রে বৈরী পরিবেশের প্রতিবাদ করেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের সুতা কারখানার একদল শ্রমজীবী নারী। তাদের ওপরে দমন-পীড়ন চালায় মালিকপক্ষ। নানা ঘটনার পরে ১৯০৮ সালে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ও রাজনীতিবিদ ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে প্রথম নারী সম্মেলন করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সাল থেকে জাতিসংঘ এ দিনটি নারী দিবস হিসেবে পালন করছে। তখন থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নারীর সংগ্রামের ইতিহাসকে স্মরণ করে দিবসটি পালন শুরু হয়। সারাবিশ্বের মতো এবারও বাংলাদেশে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপিত হচ্ছে আজ। এবার নারী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘করোনাকালে নারী নেতৃত্ব, গড়বে নতুন সমতার বিশ্ব’।
দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ তার বাণীতে বলেন, এ বছর নারী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘করোনাকালে নারী নেতৃত্ব, গড়বে নতুন সমতার বিশ্ব’ অত্যন্ত সময়োপযোগী ও তৎপর্যপূর্ণ। জাতীয় উন্নয়নের মূলধারায় নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে একটি দারিদ্র্যমুক্ত ও সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে নারী-পুরুষ সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, সভ্যতার উষালগ্ন থেকে সৃজনশীল ও উন্নয়নমূলক সকল কর্মকান্ডে পুরুষের পাশাপাশি নারীর ভূমিকা অগ্রগণ্য। সংবিধানের ১৯(৩) অনুচ্ছেদে জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। নারীদের যথার্থ মর্যাদা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি অর্থনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে সরকার নারী শিক্ষার বিস্তার, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, নারীর ক্ষমতায়নসহ নারীর প্রতি সকল ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে ব্যাপক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে।
রাষ্ট্রপতি আশা প্রকাশ করে বলেন, দেশের টেকসহ উন্নয়নে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই সহযাত্রী হিসেবে কাজ করবেন। মুজিববর্ষে নারী উন্নয়নে বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নের ফলে নারী উন্নয়ন আজ সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি, বিচারবিভাগ, প্রশাসন, কূটনীতি, সশস্ত্রবাহিনী, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, শান্তিরক্ষা মিশনসহ সর্বক্ষেত্রে নারীর সফল অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশ ক্রমান্বয়ে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। নারীর ক্ষমতায়ন, সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় উন্নয়নের মূলধারায় নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে একটি দারিদ্র্যমুক্ত ও সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে তিনি নারী-পুরুষ সকলকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাণীতে বলেছেন, এ দেশের নারী-পুরুষের যৌথ প্রচেষ্টায় বিনির্মাণ হবে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ। তিনি বলেন, ‘এ দেশের নারী পুরুষের যৌথ প্রচেষ্টায় রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়ন, ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনসহ ২০৪১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নত দেশে বাংলাদেশে উত্তরণ ঘটবে। বিনির্মাণ হবে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ। বাস্তবায়িত হবে ডেল্টাপ্ল্যান-২১০০। মুজিববর্ষে এই হোক আমাদের প্রত্যাশা।’
প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে আরও বলেন, আজ ৮ মার্চ, নারী আন্দোলনের ইতিহাসে এক গৌরবময় দিন। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা আর মজুরি বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে নারী আদায় করেছিল তার অধিকার। আদায় করেছিল বিশ্ব সমীহ। নারী তার মেধা ও শ্রম দিয়ে যুগে যুগে সভ্যতার সকল অগ্রগতি এবং উন্নয়নে করেছে সমঅংশীদারিত্ব। আর তাই সারা বিশ্বে বদলে গেছে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি। এখন নারীর কাজের মূল্যায়ন হচ্ছে, বৃদ্ধি পাচ্ছে স্বীকৃতি। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য- ‘করোনাকালে নারী নেতৃত্ব, গড়বে নতুন সমতার বিশ্ব’ -অত্যন্ত সময়োপযোগী হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের পুনর্বাসন ও ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে ১৯৭২ সালে ‘নারী পুনর্বাসন বোর্ড’ গঠন করেন। তিনি জাতীয় জীবনের সকলক্ষেত্রে নারীর সমানাধিকারের বিষয়টি সংবিধানে নিশ্চিত করেন। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাংলাদেশ আজ নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ লিঙ্গ সমতা ও নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ এখন রোল মডেল। আমাদের জাতীয় উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আমরা গ্রহণ করেছি নানামুখী পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে জেন্ডার রেসপন্সিভ বাজেট প্রণয়নসহ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় তৃণমূল পর্যায়ের নারীদের আত্মকর্মসংস্থানমূলক কর্মে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। হ্রাস পাচ্ছে নারীর দারিদ্র্য। জাতীয় অর্থনীতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে নারীর অংশগ্রহণ। তিনি বলেন, ‘কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য নির্বিঘ্নে কাজ করার পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। দেশে নারী ও শিশুদের সুরক্ষায় রয়েছে কঠোর আইন এবং আইনের প্রয়োগ। আমরা রাষ্ট্র পরিচালনা, রাজনীতি, কূটনীতি, আইন প্রণয়ন, নীতি নির্ধারণ, প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্চ পর্যায়, অর্থনীতি, সাংবাদিকতা, তথ্যপ্রযুক্তি, শিল্প-সাহিত্য, খেলাধুলা প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছি।’ তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও রয়েছে এদেশের নারীদের ব্যাপক পরিচিতি। চিকিৎসা, রাজনীতি, মানবাধিকার রক্ষা, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন, খেলাধুলা, এভারেস্ট বিজয়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এদেশের মেয়েরা অর্জন করেছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সম্মাননা। স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণসহ চলমান প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে জোরালো পদক্ষেপ এবং নতুন প্রকল্প ও কর্মসূচি গ্রহণ করে বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯ মোকাবিলায় আমরা সফল হয়েছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশের নারী উন্নয়নের ভূয়সী প্রশংসা করছে। আমরা জাতিসংঘের এমডিজি অ্যাওয়ার্ড, সাউথ-সাউথ অ্যাওয়ার্ড, প¬্যানেট ৫০-৫০ চ্যাম্পিয়ন, এজেন্ট অভ্ চেঞ্জ, শিক্ষায় লিঙ্গসমতা আনার স্বীকৃতিস্বরূপ ইউনেস্কোর ‘শান্তিবৃক্ষ’ এবং গে¬াবাল উইমেন লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড-২০১৮ সহ অসংখ্য আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেছি।
এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষায় বাড়ছে নারীর অংশগ্রহণ। তবে শিক্ষিত নারীদের বেকারত্বের হার পুরুষের তুলনায় তিন গুণের চেয়ে অনেক বেশি। সরকারের পৃথক দুটি সংস্থার গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর গবেষণা বলছে, উচ্চ মাধমিক পর্যায়ে নারীর উপস্থিতির হার ৪৮.৪৩ শতাংশ। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে এ হার ৩৬.২৩ শতাংশ। প্রতিবছরই বাড়ছে এ হার। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইজ) ২০১৯ সালের গবেষণা অনুযায়ী- প্রাথমিক শিক্ষায় নারীর উপস্থিতি ৫১.০৮ শতাংশ, মাধ্যমিকে ৫৩.৮৩ শতাংশ, উচ্চমাধ্যমিকে ৪৮.৪৩ শতাংশ, বিশবিদ্যালয় পর্যায়ে ৩৬.২৩ শতাংশ। এদিকে পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৬-১৭ এর শ্রমজরিপ অনুসারে দেশে নারীর বেকারত্বের হার পুরুষের তুলনায় প্রায় ৩ গুণ। উচ্চশিক্ষিত নারীদের ২১.৪ ভাগ বেকার হলেও পুরুষের মধ্যে বেকার ৮.৩ ভাগ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান সানজিদা আক্তার গণমাধ্যমকে জানান, উচ্চশিক্ষিত নারী-পুরুষ দেশের সম্পদ। নারীদের অধিক সংখ্যায় কর্মক্ষেত্রে আনতে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রয়োজন নারীবান্ধব কর্মক্ষেত্র গড়ে তুলতে হবে। এর বিকল্প কিছুই ভাবা যাবে না। এ জন্য সামাজিক-পারিবারিকভাবে কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণসহ সরকারিভাবেই নানামুখী উদ্যোগ নিতে হবে। তবেই দেশের অর্থনীতিতে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও সমানতালে এগিয়ে যেতে পারবে।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, অতীতের তুলনায় উচ্চশিক্ষায় নারীর উপস্থিতি বাড়লেও এখনও কমেনি নিপীড়ন-নির্যাতন। তাই নারীর আর্থিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। তাতে করে নারীর অবস্থানের আমূল পরিবর্তন হবে বলেও মনে করছেন সমাজ বিজ্ঞানীরা।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন জানান, কর্মক্ষেত্রে চাকরি পেতে নানা সমস্যার পাশাপাশি অনেক উচ্চশিক্ষিত নারীরাই বিভিন্ন কারণে কাজে যোগ দিতে অনাগ্রহী। এর ফলে কর্মক্ষেত্রে এখনও উচ্চশিক্ষিত নারীদের অংশগ্রহণ তেমন একটা সাড়া ফেলছে না। দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে কর্মজীবী নারীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তনসহ সম্মিলিত প্রচেষ্টা চালিয়ে গেলে কর্মক্ষেত্রে শিক্ষিত-উচ্চশিক্ষিত নারীদের অংশগ্রহণ বাড়বে বলে মনে করছেন ঢাবি’র নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের এই অধ্যাপক।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *