পোশাকে আধুনিক, মনোজগতে গোঁড়ামি

মতামত

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর শাহজালাল বাদলের বেশ সুন্দর একটা ছবি আছে ফেসবুকে– স্ত্রীসহ তিনি হাফ প্যান্ট পরে বিদেশের কোন লোকেশনে ঘুরছেন। তিনি সিনেমা করতে যাননি, তবে ছবিটি বেশ সিনেম্যাটিক। এখানে কেউ কোনো ইসলামি জোশ খুঁজে পাবেন না। কিন্তু তাকে তো পেতেই হয়। সেই জোশেই তিনি সিদ্ধিরগঞ্জে গান-বাজনা ‘সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ’ করেছেন।

কাউন্সিলর হয়েছেন যে কোনোভাবেই। এবং হয়েই নিজেকে এলাকার মালিক ভাবতে শুরু করেছেন। তিনি যে খুব ইসলামিক চালচলন করেন না সেটা তার বিদেশের লোকেশনের ছবি দেখলেই বোঝা যায়। কিন্তু তার মনোজগতে আছে সেই মৌলবাদী বিষ। তার পারিবারিক পরিচয়ও বিবেচনার দাবি রাখে। তিনি আলোচিত সাত খুন মামলার ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি নূর হোসেনের ভাতিজা।

এই মুসলমান সমাজে যাতে আর কোনো গান-বাজনা না হয়, এ জন্য কাউন্সিলর অফিস থেকে প্রত্যেক মসজিদ কমিটি ও পঞ্চায়েত কমিটি বরাবর চিঠি ইস্যু করা হবে। আগামী শুক্রবার জুমার নামাজের বয়ানে বলে দেয়া হবে। আগামী শনিবার থেকে গান-বাজনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সেই চিঠির রেফারেন্স নিয়ে প্রতিটি বাড়িওয়ালাকে আপনারা বলে দেবেন।’

যে রাজনীতিই করুক, তার মনের মধ্যে এক ত্রাস সৃষ্টি করে আছে মৌলবাদী রাজনীতির। ধর্মীয় মেরুকরণের মাধ্যমে যেন রাজনীতিতে এক অভ্যুত্থান চলমান এখন। সবাইকে, সব রাজনীতির ধারক বাহককে যেন বেশি বেশি করে ইসলামি রাজনীতির ধারক হতে হবে।

বলা হয়, সন্ত্রাসীদের কোনো ধর্ম হয় না, দাঙ্গাবাজদের কোনো ধর্ম হয় না, বরং ধর্মের নামে যারা এমন রাজনীতি করে, তারা সেই ধর্মকেই কলঙ্কিত করে। এই কাউন্সিল বাদল কোন রাজনীতি করছেন, সেটা হয়তো তিনি নিজেও জানেন না। এদের এই মেকি ধর্মীয় রাজনীতির কারণেই সত্যিকারের মৌলবাদী রাজনীতির কাছে বারবার পরাজিত হয় উদারনৈতিক দলগুলো।

গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ভেতরে থেকে এরা মনোনয়ন পায়, নির্বাচিত হয় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল থেকে। কিন্তু এদের ভুল রাজনৈতিক এই প্রক্রিয়ায় এরা মৌলবাদী তথা গোঁড়া মুসলিমদের ক্ষমতাসীন করে। এই রাজনৈতিক ইসলাম গণতন্ত্রের হাত ধরে, এই বাদল ধরনের লোকজন দ্বারাই কট্টরপন্থীরা ক্ষমতাসীন করে। সেই সঙ্গে যদি থাকে দুর্বল প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ তাহলে তো কথাই নেই।

একজন ছাত্রলীগ করা নেতা, এই আমলে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বের সরকারের সময় যদি এই আচরণ করতে পারেন, তখন সহজেই অনুমেয় যে বাংলাদেশে যেসব জেহাদি জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো আছে তাদের জন্য কী পথ সৃষ্টি হচ্ছে। এদের কারণেই বাংলাদেশ হতে পারে সন্ত্রাসের উর্বর সূতিকাগার।

উদারপন্থী দলসমূহের ভেতরকার গোষ্ঠী-দ্বন্দ্ব, অরাজকতা কতটা ভয়ানক পরিস্থিতি ডেকে আনতে পারে, সেটা আমরা লিবিয়া আর মিসরে দেখেছি।

কাউন্সিলর বাদলদের চিনে রাখা দরকার, এদের কর্মকাণ্ড নজরদারিতে আনা প্রয়োজন। অন্যথায় আগামীর বাংলাদেশ কোন দিকে যাবে তার অশনিসংকেত কিছু কিছু দৃশ্যমান হচ্ছে।

বাংলাদেশ সরকার গান-বাজনা নিষিদ্ধ করেনি। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিছুদিন আগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে বলেছেন, তার সরকার চলচ্চিত্র ও সঙ্গীত জগতের বিকাশে আরও সক্রিয় হতে চায়। কাউন্সিলর বাদল তাহলে কোন সাহসে এমন নির্দেশনা দিতে পারেন? স্থানীয় সরকার আইনেও পরিষ্কার করা আছে, একজন স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি কোন বিষয়ে কতটুকু নির্দেশনা জারি করতে পারেন।

নিকট অতীতে আমরা দেখেছি নির্বাচিত মেয়রকেও পদচ্যুৎ করা হয়েছে স্থানীয় সরকার আইন প্রয়োগ করে। এই কাউন্সিলারের বেলায় এ আইনের প্রয়োগ হতে পারে কি না সেটা প্রশাসন ভাবতে পারে।

বাংলাদেশে ধর্মের বহুত্ববাদকে বাঁচিয়ে রাখতেই হবে। গোটা দেশটাই যেন আজ ধর্মের গোঁড়ামির বড় শিকারে পরিণত হচ্ছে। সেটা হতে দেয়া যায় না। পারস্পরিক সহিষ্ণুতা আমাদের বড় চাওয়া। সংকীর্ণ গোঁড়ামির রাজনীতির হাত থেকে আমাদের ধর্মীয় উদারতাকে বাঁচাতে বাদলদের কাছ থেকে রাজনীতিকে সরিয়ে নিতে হবে।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *