প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ১৯ বার হত্যার চেষ্টা

জাতীয়

এসএম দেলোয়ার হোসেন : মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ধ্বংস করতেই সেই দেশ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে ১৯ বার হত্যা করার চেষ্টা হয়েছে। দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করতে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে এখনও চলছে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র। তবে সকল বাধা-বিপত্তি মোকাবেলা করে আর হত্যা ষড়যন্ত্রের হুমকি মাথায় নিয়ে দেশ ও জাতির উন্নয়নে দৃঢ়তার সাথে দেশ পরিচালনা করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের ‘সোনার বাংলাদেশ’ গড়তে এবং নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে নিরলস কাজ করছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর দিক-নির্দেশনায় পদ্মাসেতু, কর্ণফুলী টানেলসহ বিভিন্ন প্রকল্পের নানামুখী উন্নয়ন কর্মযজ্ঞে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হতে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে। এ অবস্থায় একটা আঘাত আসার আশঙ্কা রয়েছে। সেজন্য দেশবাসীকে সবধরনের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে। দেশি-বিদেশি সকল-বাধা ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করেই দেশের উন্নয়নে তার সরকার কাজ করে যাবেন বলেও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, পঁচাত্তরে সপরিবারে জাতির পিতাকে হত্যার পর ১৯৮১ সালে সভানেত্রী হয়ে আবারো একাত্তরের চেতনা পুনরুদ্ধারের লড়াই শুরু করেন তিনি। সেই থেকেই একটি কুচক্রীমহল বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বার বার হত্যার চেষ্টা চালিয়েছে। দেশের উন্নয়ন-ঐক্যের স্বার্থে তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তায় সংশ্লিষ্টদের আরও সতর্ক হওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন তারা।
জানা গেছে, পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর, ক্ষমতা দখলকারীদের ষড়যন্ত্রে কোণঠাসা হয়ে পড়ে আওয়ামী লীগ। দেশে ফিরতে বাধা দেয়া হচ্ছিল তার দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে। এ অবস্থায় ১৯৮১ সালের কাউন্সিলে শেখ হাসিনাকে সভানেত্রী নির্বাচন করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। সেই বছরের ১৭ মে দেশে ফেরেন তিনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রাণনাশের প্রথম আঘাতটি আসে ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে। এরপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় বারের মতো তার ওপর হামলা চালানো হয় ১৯৮৯ ও ১৯৯১ সালে। চতুর্থ হামলাটি হয় ১৯৯৪ সালে ঈশ্বরদী রেল স্টেশনে। সেদিন শেখ হাসিনাকে বহনকারী ট্রেন লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি ছোড়া হয়। পঞ্চম আঘাত করা হয় ১৯৯৫ সালে। শেখ রাসেল স্কোয়ারে সমাবেশে ভাষণ দেয়ার সময় গুলিবর্ষণ করা হলেও বেঁচে যান শেখ হাসিনা। এরপর ষষ্ঠ আঘাত আসে ১৯৯৬ সালের ৭ মার্চ। ওইদিন সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে শেখ হাসিনা বক্তৃতা শেষ করার পরপরই একটি মাইক্রোবাস থেকে সভামঞ্চ লক্ষ্য করে চালানো হয় গুলি, ছোড়া হয় শক্তিশালী বোমা। সময়ের পটপরিবর্তনে ১৯৯৯ সালে যখন শক্ত হাতে দেশ পরিচালনা করছিলেন, তখন ফাঁস হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার এ পরিকল্পনার কথা। এরপর ২০০০ সালের ২০ জুলাই তাকে হত্যা করতে কোটালীপাড়ায় জনসভাস্থলের অদূরে মাটির নিচে পুঁতে রাখা হয়েছিল ৭৬ কেজি ওজনের বোমা। পরের বছর খুলনার রূপসা সেতুর কাজ উদ্বোধন করতে যাওয়ার কথা ছিল শেখ হাসিনার। সেখানেও পাতা হয়েছিল বোমা। সে বছরই নির্বাচনী প্রচারের সময় সিলেটে তার জনসভা স্থলের কাছে একটি বাড়িতে হয় বিস্ফোরণ। ২০০২ সালে বিরোধীদলীয় নেতা থাকা অবস্থায় নওগাঁয় হামলা হয় তার গাড়ি বহরে। সাতক্ষীরায় হামলা হয়েছিল সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে। হত্যার উদ্দেশ্যে ২০০৪ সালে বরিশালের গৌরনদীতে গুলি চালানো হয় শেখ হাসিনার গাড়ি বহরে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হামলাটি হয় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। সেদিন বঙ্গবন্ধু কন্যার ওপর চালানো হয় ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা। সেই গ্রেনেড হামলায় নিহত হন বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন। আহত হন প্রায় ৬০০ নেতাকর্মী। সেদিন বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে সন্ত্রাসবিরোধী ওই সমাবেশে রাষ্ট্রীয় মদদে হামলার প্রমাণও মিলেছে। ওই হামলা দেশের ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় রচনা করেছে। আহত অনেকে এখনও বিভিষীকাময় সেই ক্ষত স্মৃতি বুকে নিয়ে বয়ে বেড়াচ্ছেন। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রে দেশ ধ্বংস ও প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার পরিকল্পনা করছে কুচক্রীমহল।

এদিকে গত মঙ্গলবার শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত একনেকের এক বৈঠকে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের সাহায্যে ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষের যখন একটু ভালো সময় আসে, মানুষ একটু ভালো থাকার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে, জীবন-মান একটু উন্নত হয়, তখনই কিন্তু একটা আঘাত আসার আশংকা থাকে। সেই কারণেই সকলকে একটু সতর্ক থাকা দরকার। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ গড়ে তুলে জাতির পিতা যখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকে পা বাড়াচ্ছিলেন, দেশটা উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাবে সেই সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে এবং তার সুফলও মানুষ পেতে শুরু করেছে, মানুষ একটু খুশি এবং স্বস্তিতে, ঠিক সেই সময়ে কিন্তু ১৫ আগস্টের ঘটনাটা ঘটলো। পঁচাত্তর পরবর্তী স্বৈরশাসনের কথা স্মরণ করিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এদেশে গণতন্ত্র কখনো অব্যাহতভাবে চলেনি। জাতির পিতাকে হত্যার পর একর পর এক ‘মার্শাল ল’ এবং সামরিক শাসকরা দেশ চালিয়েছে। হত্যা, ক্যু, ষড়যন্ত্রের রাজনীতিই দেশে চলেছে। এরসাথে অগ্নিসস্ত্রাস, জঙ্গিবাদ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ সবই আমাদের মোকাবেলা করতে হচ্ছে এবং এসব মোকাবেলা করেও আমরা অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাচ্ছি এবং করোনাভাইরাস মোকাবেলাতেও আমরা সাফল্য অর্জন করেছি এবং করে যাচ্ছি। ভাষার মাসে সব ভাষা শহীদকে স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্যদিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করাতে বছরের প্রতিটি দিনই কিছু না কিছু স্মৃতি আমাদের রয়ে গেছে। কাজেই, বাংলাদেশের মানুষ ভালো থাক, সুস্থ থাক এবং স্বাধীনতার চেতনায় বাংলাদেশ গড়ে উঠুক এটাই আমাদের একমাত্র কামনা।

এসব প্রসঙ্গে দেশের ইতিহাসবিদ ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, যারা এই আঘাতটা বার বার করছে, তারা বাংলাদেশ বিরোধী, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী, পাকিস্তান মনস্ক এবং কঠোর ডানপন্থী। তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালে যে উদ্দেশ্যে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছিল, সেই নীলনকশা বাস্তবায়নেই শেখ হাসিনার ওপর বার বার হামলা চালাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশি বিরোধীচক্র। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে পঁচাত্তর পরবর্তী বিভিন্ন ঘটনাসহ অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বলেন, এসব কারণেই আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিরাপত্তার বিষয়টি আরো গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। একইসঙ্গে নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট সকলকেই আরও কঠোর সতর্কতার সাথে সন্দেহভাজনদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করারও তাগিদ দিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইতিহাসবিদরা।

এদিকে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমাদের নেত্রী সেদিন বেঁচে গিয়েছেন, বঙ্গবন্ধু নেই, তবে তার কন্যা এখনও বেঁচে আছেন। এটি আমাদের বড় প্রাপ্তি। সেই থেকেই আজও আমাদের আবেগকে অনেক আলোড়িত করে ও নাড়া দেয়।

বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অনেক বার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু এতোকিছুর পরও প্রধানমন্ত্রী মনোবল হারাননি। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, আমি জানি বুলেট আমাকে তারা করছে, কিন্তু আমি থামবো না। এবং সত্যি তিনি থামেন নাই। তিনি দেশ ও জাতির কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশি-বিদেশি সকল ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে দেশ ও জাতির ভাগ্য উন্নয়নের এ ধারা এখনও অব্যাহত রেখেছেন বলেই বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দরবারে রোল মডেল।

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *