জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি কার্ড ১৮ বছরের অধিক হলেই বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ১৮ বছরের অধিক কারো পাসপোর্ট বানাতে হলে এনআইডি কার্ড লাগবে, তা নাহলে পাসপোর্ট হচ্ছে না। প্রবাসে থাকা নাগরিকদের জন্য পাসপোর্ট বানাতে এনআইডি কার্ড না হলে জন্ম নিবন্ধন দিয়েও পাসপোর্ট আবেদন হচ্ছে।
২০০৮ সাল থেকে বাংলাদেশে বায়োমেট্রিক আইডেনটিফিকেশন কশন বিদ্যমান। তথ্য নথিভুক্তকরণ ও আইডি কার্ড সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হলো বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। নতুন এনআইডি কার্ড আবেদন বা এনআইডি কার্ড সংশোধন সবকিছুই অনলাইন আবেদনের মাধ্যমে পরিচালনা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রবাসীরা এনআইডি কার্ড বানাতে গেলে যেমন ঝামেলা পোহাতে হয়, তারচেয়ে কয়েকগুণ বেশি ভুক্তভোগী হচ্ছেন এনআইডি হাতে পেতে। স্থানীয় উপজেলা নির্বাচন অফিসে কাগজপত্র জমা দিতে না পারলেই আটকে যাচ্ছে আবেদন। এনআইডি কার্ডের মারপ্যাচে অনেক প্রবাসী ভুক্তভোগী হয়ে আশাই ছেড়ে
দিয়েছেন। প্রবাসীরা নতুন এনআইডি কার্ড বানাতে দূতাবাসের মাধ্যমে অনলাইনে সঠিকভাবে ফরম পূরণ করে এনআইডি কার্ড আবেদন করছেন। এতে পাসপোর্ট ও জন্মনিবন্ধন অনুযায়ী সবকিছু সঠিকভাবেই হচ্ছে। আবেদন থেকে ফিংগারপ্রিন্ট সবই সঠিকভাবে হলেও বিপত্তি হচ্ছে এনআইডি কার্ড হাতে পেতে। দূতাবাসের মাধ্যমে আবেদনের পর প্রবাসী নিজস্ব উপজেলা নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ করতে হয়। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী সব ডকুমেন্ট সাবমিট করার পর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা যাচাই-বাছাই সম্পূর্ণ করে ঢাকাস্থ হেডকোয়ার্টারে একটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। সেই প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে এনআইডি কার্ড সম্পূর্ণ তৈরি হয়ে যায়। এরপর অনলাইনে থেকে এনআইডি কার্ড ডাউনলোড করা যায় কিন্তু স্মার্ট এনআইডি হাতে পেতে লেগে যায় বছরের উপর।
এমন এক ভুক্তভোগী প্রবাসী নোয়াখালীর কুহিনুর মিয়া। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশ কন্স্যুলেট দুবাইয়ে নতুন এনআইডি কার্ড আবেদন করেছিলেন। কন্স্যুলেটের দেওয়া নির্ধারিত তারিখে গিয়ে হাতের ছাপসহ নিয়ম অনুযায়ী সবকিছু সম্পন্ন করেন। এরপর নিজস্ব উপজেলায় কাগজপত্র জমা দেওয়ার ৭ মাস পর অর্থাৎ ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অনলাইনে এনআইডি কার্ড পেয়ে যান। কিন্তু অরিজিনাল স্মার্ট কার্ড এখনো হাতে আসেনি। কন্স্যুলেটে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়, বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট কার্ড এলে অনলাইনে রেজিস্টারকৃত মোবাইলে মেসেজ যাবে, তারপর এসে সংগ্রহ করতে পারবেন। বছর পেরিয়ে গিয়ে স্মার্ট কার্ড হাতে না পাওয়ার আক্ষেপ জানান কুহিনুর মিয়া।
প্রবাসীদের অনেকেই দেশে যেতে না পারায় উপজেলা নির্বাচনে অফিসে ডকুমেন্ট জমা দিতে পারছেন না। তাই আটকে আছে এনআইডি কার্ডের আবেদন। এমনি একজন ভুক্তভোগী চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার বাসিন্দা আমিরাতের আজমানে সপরিবার নিয়ে বসবাসকারী অনুপ সেন। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে আমিরাতের দুবাইস্থ বাংলাদেশ কন্স্যুলেটে এনআইডি কার্যকমের উদ্বোধন হওয়ার প্রথম ধাপেই সপরিবারে গিয়ে করেছিলেন আবেদন। কিন্তু ব্যবসায়িক ব্যস্ততা থাকায় যেতে পারছেন না দেশে। আত্মীয়ের মাধ্যমে কয়েকবার সব কাগজপত্র নির্বাচন অফিসে জমা দিলেও আটকে আছে আবেদন। সর্বশেষ উনার পরিবারের কাউকে উপজেলা নির্বাচন অফিসে গিয়ে কাগজপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে। একই ভুক্তভোগী মাদারীপুরের বাসিন্দা আজমান প্রবাসী ফয়সাল আহমেদ। আবুধাবী বাংলাদেশ দূতাবাসে এনআইডি কার্ড আবেদন করেছিলেন কিন্তু এখনো উপজেলায় কাগজপত্র জমা দিতে না পারায় আটকে আছে আবেদন।
আমিরাত প্রবাসীরা বলছেন, আবেদন কোথায় আটকে থাকে আমরা জানি না। আপডেট জানতে হলে দূতাবাস বা কন্স্যুলেট অফিসে যোগাযোগ করতে হয়। এনআইডি কার্ডের সকল ধাপ যদি দূতাবাস বা কন্স্যুলেটেই সম্পূর্ণ করা যেত, তাহলে অনেক দ্রুত স্মার্ট এনআইডি কার্ড হাতে পাওয়া যেত।
উল্লেখ্য ২০২৩ সালের ১৩ জুলাই সংযুক্ত আরব আমিরাতে দুবাইস্থ বাংলাদেশ কন্স্যুলেটে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের আবেদনকৃত জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) প্রদান কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। এনআইডি কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আহসান হাবিব খান। এর আগে ১০ জুলাই আবুধাবির বাংলাদেশ দূতাবাসেও জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদান কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়েছে।
বর্তমানের বিশ্বের দশটি দেশের ১৭টি স্টেশনে দূতাবাসের মাধ্যমে ভোটার কার্যক্রম পরিচালনা করছে সংস্থাটি। দেশগুলো হলো- সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, ইতালি, কুয়েত, কাতার, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও জাপান। এছাড়া গত ২৮ আগস্ট এনআইডি অনুবিভাগের মহাপরিচালক এএসএম হুমায়ুন কবীর জানান- ফ্রান্স, স্পেন, বাহারাইন ও সিঙ্গাপুর প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটার নিবন্ধনের সম্মতি দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র, ওমান, মালদ্বীপ, জর্ডান ও দক্ষিণ আফ্রিকায় এ কার্যক্রমে সম্মতি পেয়েছে সংস্থাটি। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানীসহ তিনটি অঙ্গরাজ্যে কার্যক্রম হাতে নেওয়ার উদ্যোগ সম্পন্ন করেছে ইসি।