প্রযুক্তির অপব্যবহারে দেশ-বিদেশে চক্রান্ত

তথ্য প্রযুক্তি

ডেস্ক রিপোর্ট : যুদ্ধাপরাধী ও আগুনসন্ত্রাসের সিন্ডিকেট দেশ-বিদেশে বসে বাংলাদেশবিরোধী ভয়ংকর তৎপরতায় নেমেছে। বিশাল অর্থ ব্যয়ে ভাড়া করা হয়েছে সাইবার সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তাদের চিহ্নিত করার পরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হচ্ছে। প্রযুক্তির অপব্যবহার করে ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বঙ্গবন্ধু পরিবার, সরকার, বিচার বিভাগ ও দেশের বিরুদ্ধে তৎপরতা চালাচ্ছে ওইসব চিহ্নিত সাইবার অপরাধী চক্র। কোনো ধরনের জবাবদিহি না থাকায় বেপরোয়াভাবে প্রতিনিয়ত বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে তারা। দুই মন্ত্রণালয়ের দায়সারা অবস্থানের কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনা যাচ্ছে না। বাস্তবায়ন হচ্ছে না হাই কোর্টের নির্দেশনাও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে বাংলাদেশে অফিস খুলতে বাধ্য করতে হবে। তারা সরকারের দেওয়া শর্ত ও আইন না মানলে প্রয়োজনে ফেসবুক, ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধের হুমকি বা বন্ধ করে দিতে হবে। সম্প্রতি ভারত, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ ও কড়াকড়ি আরোপ করেছে। বাংলাদেশে কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ না থাকায় বিদেশে বসে যে যা খুশি লিখছে এবং বলছে। এ ক্ষেত্রে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কঠোর প্রয়োগের কথাও বলেছেন বিশেষজ্ঞরা। বিজ্ঞজনদের মতে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রচেষ্টায় দেশ ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করছে। কিন্তু এর সুফল নিচ্ছে জামায়াত এবং যুদ্ধাপরাধী স্বাধীনতাবিরোধী  অপশক্তি। ফেসবুক ও ইউটিউবের মাধ্যমে এখন বহু ভুঁইফোড় পন্ডিতের জন্ম হয়েছে। যুদ্ধাপরাধী অপশক্তি এখন সাইবারযুদ্ধে নেমেছে। আর এ যুদ্ধে সরকার ইতিমধ্যে আত্মসমর্পণ করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা অপপ্রচার ও গুজব রটানোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে না পারায় বিটিআরসির (বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন) কর্মকান্ডে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে হাই কোর্ট। সম্প্রতি একটি রিট আবেদনের শুনানিতে হাই কোর্ট বলেছে, ‘বিটিআরসি কী করে? একই বিষয়ে কি বিটিআরসিকে প্রতিনিয়ত নির্দেশনা দিতে হবে? মনে হচ্ছে বিটিআরসি এ ধরনের ভিডিও ও ছবি দেখে আনন্দ পায়। তাদের ভালো লাগে, তারা এগুলো উপভোগ করে। আমরা সন্তান-সন্ততি, পরিবার নিয়ে থাকি না? তারা চাইলেই ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু তারা ব্যবস্থা নিচ্ছে না।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউটিউব যদি বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর কিছু প্রকাশ করে তাহলে সরকারকে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। ভারতও সম্প্রতি টুইটারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। ফেসবুক ও ইউটিউবকে ভারত বাধ্য করে তাদের আইনের আওতায় এনেছে। উন্নত আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ফেসবুক, ইউটিউবকে হামেশাই জরিমানা করছে। বাংলাদেশ যদি ফেসবুক, ইউটিউবকে তালিকা দিয়ে বলে এসব কনটেন্ট না সরালে বাংলাদেশ ফেসবুককে নিষিদ্ধ করবে, তখন ফেসবুক কী করবে? তারা দৌড়ে আসবে। দেশে দেশে এভাবেই সোশ্যাল মিডিয়ার অত্যাচার প্রতিরোধ করা হচ্ছে। তারা আরও বলেন, ফেসবুক, ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে জবাবদিহির পাশাপাশি ভ্যাট, ট্যাক্সসহ প্রয়োজনীয় করের আওতায় আনতে হবে। তারা ব্যবসা করতে হলে এ দেশে অফিস স্থাপন করতে হবে। সম্প্রতি ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের মন্তব্যেও ক্ষুব্ধ হয়েছেন অনেকে। মোস্তাফা জব্বার বলেছিলেন, ‘ফেসবুক, ইউটিউবের কাছে সরকার অসহায়। আপত্তিকর ব্যক্তিগত ছবি কিংবা ভিডিও অপসারণের ব্যাপারে অনুরোধ করা হলেও সব ক্ষেত্রে তারা শোনে না।’ বিশ্লেষকদের মতে, মন্ত্রীর এ বক্তব্য স্বাধীনতাবিরোধী চক্রকে উৎসাহ জোগাচ্ছে।

জানা গেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে জেনারেল ডাটা প্রোটেকশন রেগুলেশন (জিডিপিআর) নামে এক নতুন আইন কার্যকর হয়েছে। বিভিন্ন কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠান কীভাবে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণ করবে সে বিষয়েই মূলত এ আইন। এ ছাড়া যদি কেউ কোনো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফরমে কপিরাইট লঙ্ঘন করে কিছু পোস্ট করে, সেজন্য ওই ব্যক্তি তো বটেই, সেই সঙ্গে অনলাইন প্ল্যাটফরমকেও দায়ী করা যাবে। আগের আইনে ইউরোপীয় ইউনিয়নে আপত্তিকর কনটেন্টের ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করার পর তা সরিয়ে নিলেই মামলা চুকে যেত। কিন্তু নতুন আইনে এজন্য দায়িত্বটা এখন সোশ্যাল মিডিয়ার প্ল্যাটফর্মের ঘাড়েই বর্তাবে। অস্ট্রেলিয়ায় গত বছরের ৫ এপ্রিল থেকে সহিংস ও জঘন্য কোনো কিছু অনলাইনে শেয়ার করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আইন লঙ্ঘন করলে সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ এনে জেল-জরিমানার বিধানও রেখেছে। কোনো সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানির গ্লোবাল টার্নওভারের ১০ শতাংশ পর্যন্ত জরিমানা করা যাবে। অথচ বাংলাদেশ এ বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে।

এসব বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমাদের পাশের দেশ ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে একটি নীতিমালার মধ্যে নিয়ে এসেছে। অথচ আমাদের দেশের কিছু লোক বিদেশে বসে শুধু নিজেদের স্বার্থে ইউটিউব, ফেসবুকে নানা ধরনের অপপ্রচার ও গুজব চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা তাদের কিছুই করতে পারছি না। শুধু তা-ই নয়, অপপ্রচারমূলক কনটেন্টগুলোও আমরা সরাতে পারছি না। আমাদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা যেন হাত-পা গুটিয়ে বসে আছেন। তাদের এ আচরণ নৈরাশ্যজনক।’

অবসরপ্রাপ্ত এই বিচারপতি আরও বলেন, ‘যারা অপপ্রচার করছে তাদের অধিকাংশই যুদ্ধাপরাধীদের সন্তান ও বংশধর। এ ছাড়া বরখাস্ত হওয়া কিছু সেনা কর্মকর্তা, পলাতক বিএনপি নেতা, কিছু পলাতক সাংবাদিক রয়েছেন যারা লন্ডন, আমেরিকা, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বসে এসব অপকর্ম চালাচ্ছেন। আমি তথ্যপ্রযুক্তির ওপর বিশেষজ্ঞ নই। তবে আমি শুধু বুঝি, জাতির স্বার্থে দেশের বিরুদ্ধে এসব অপপ্রচার বন্ধ করতে হবে। সে ক্ষেত্রে আমরা ইউটিউব, ফেসবুকসহ এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোকে নীতিমালার আওতায় নিয়ে আসতে পারি। নীতিমালা না মানলে এ দেশে তাদের ব্যবসা বন্ধ করে দিতে পারি।’ তাদের অনুরোধ নয়, আদেশ দিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন অবসরপ্রাপ্ত এই বিচারপতি।

জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে যতটুকু করার সুযোগ রয়েছে তার সবই করছি। তবে আপনাদের এটুকু মনে রাখতে হবে, ফেসবুক, ইউটিউব আমাদের দেশি কোম্পানি নয়, আমেরিকান কোম্পানি। ফলে তারা আমাদের কথা শুনতে বাধ্য নয়। এর পরও আমরা বিভিন্ন সময় কনটেন্ট ডিলিট করতে তাদের কাছে রিকোয়েস্ট পাঠাই। তারা আমাদের অনেক রিকোয়েস্টই রাখে। আগে অনুরোধ রাখার হার ছিল ১ শতাংশের কম। এখন তা অনেক বেড়েছে। আগে আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে ভ্যাট-ট্যাক্স পেতাম না। কিন্তু এখন পাওয়া শুরু করেছি। এ বিষয়গুলোও আপনাদের মাথায় রাখতে হবে।’

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে তাদের দেশে অফিস স্থাপন করতে বাধ্য করছে, আমরা কেন পারছি না- এমন প্রশ্নে মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘ওইসব দেশে এ ধরনের আইন রয়েছে। আইন করে ফেসবুক বা ইউটিউবকে অফিস স্থাপন করতে বাধ্য করেছে। কিন্তু আমাদের এ ধরনের কোনো আইন নেই। ফলে আমরা তাদের বাধ্য করতে পারছি না। আর বিশ্বে এমন কোনো ব্যবস্থা নেই যার মাধ্যমে ফেসবুক, ইউটিউবকে আমরা চাইলেই বন্ধ করে রাখতে পারব।’

তিনি বলেন, ‘আমরা পাবজি-ফ্রি ফায়ার গেম বন্ধ করেছি। আপনি কি মনে করেন এটা বন্ধই রয়েছে? কেউ খেলছে না? অনেকেই ভিপিএন ব্যবহার করে ঠিকই এসব গেম খেলছে। এখন যদি বলেন ভিপিএন বন্ধ করতে তাহলে তো বাংলাদেশ ব্যাংকের লেনদেনই বন্ধ হয়ে যাবে।’

মন্ত্রী বলেন, ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটা আইসিটি ডিভিশন করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিষয়টা যেহেতু ডিজিটাল নিরাপত্তার বিষয়, ফলে এ বিষয়টা নিয়েও তাদেরই কাজ করতে হবে। তারা চাইলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধন করে এ বিষয়গুলো যুক্ত করতে পারে বা নতুন আইন করতে পারে। আইসিটি ডিভিশন যদি আমাদের করতে বলে তাহলে আমরা উদ্যোগ নেব।’

ফেসবুক, ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে জবাবদিহির আওতায় আনার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের চেয়ারম্যান শ্যাম সুন্দর সিকদার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘মানহানিকর, ক্ষতিকর বা উসকানিমূলক পোস্টের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা ছাড়া আসলে এখন পর্যন্ত আমাদের কিছু করার নেই। আমরা অনুরোধ করলে তারা কখনো শোনে আবার কখনো শোনে না। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে একই অবস্থা। সংশ্লিষ্ট ভিডিও, ছবি বা লেখা যিনি আপলোড করেন, তিনিই ডিলিট করতে পারেন।’

বিটিআরসি প্রধান ও আইসিটি ডিভিশনের সাবেক এই সচিব বলেন, ‘আমরা ফেসবুক, ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দফায় দফায় মিটিং করেছি। তাদের বাংলাদেশে অফিস স্থাপন করার অনুরোধ করেছি। কিন্তু তারা আমাদের কথায় কর্ণপাত করছে না।’ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (সিএসই) বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ জরুরি। এজন্য একটি আইনও করা যেতে পারে। অস্ট্রেলিয়ায় এমন আইন আছে, সেখানে জনসংখ্যা মাত্র ৩ কোটির মতো। বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীই আছেন প্রায় ১০ কোটি। সরকার একটি আইন করার বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছে। এ আইন হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে এ দেশে অফিস খুলতে হবে। দেশের ভিতরেই নিজস্ব সার্ভারে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। পৃথিবীর অনেক দেশেই এমনটা আছে। তবে দুর্ভাগ্যবশত আমরা এখনো করতে পারিনি।’

তিনি বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শুধুই কোনো প্রযুক্তিগত টুলস নয়, বরং তারা বাংলাদেশের রাজনীতি, আইনশৃঙ্খলা, সামাজিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রভাব রাখতে পারে। এ দেশ থেকে তারা অর্থ উপার্জন করে। তাহলে তাদের প্ল্যাটফরম ব্যবহার করে যদি কোনো অপরাধ সংঘটিত হয় তার জন্য তারা কোনো দায়দায়িত্ব নেবে না; তা তো হয় না। তারা যদি অর্থ আয় না করত তা হলেও কিছুটা মানা যেত। আইন করে যদি এখানে তাদের অফিস-সার্ভার স্থাপন করা যায় তাহলে তাদের অনেকখানিই নিয়ন্ত্রণ ও তদারক করা সম্ভব হবে।’

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *